বাংলাদেশী কূটনৈতিক মিশনগুলোর বহুমাত্রিক উদ্যোগ, আন্তর্জাতিক দ্বিপক্ষীয় সম্মেলন এবং বিনিয়োগ আকর্ষণ সংক্রান্ত নানা অর্থনৈতিক কূটনীতির পরও দেশে কাক্সিক্ষত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই)।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সামান্য উন্নতি ঘটে বিনিয়োগ দাঁড়ায় ১৭২ কোটি ডলারে
২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে পুনরায় নিম্নমুখী হয়ে নিট এফডিআই নেমে আসে ১৪৬ কোটি ডলারে
বাংলাদেশী কূটনৈতিক মিশনগুলোর বহুমাত্রিক উদ্যোগ, আন্তর্জাতিক দ্বিপক্ষীয় সম্মেলন এবং বিনিয়োগ আকর্ষণ সংক্রান্ত নানা অর্থনৈতিক কূটনীতির পরও দেশে কাক্সিক্ষত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই)। আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নিকারী সংস্থা ও সম্ভাব্য বিদেশী বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরকারের নীতিনির্ধারকদের লাগাতার বৈঠকের পরেও বাস্তব বিনিয়োগে তা রূপান্তরিত হতে পারেনি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে দেশে নিট বৈদেশিক বিনিয়োগের হার যেমন কাক্সিক্ষত মাত্রা স্পর্শ করতে ব্যর্থ হয়েছে। নিট বৈদেশিক বিনিয়োগ এসেছে আনুমানিক ১১৫ থেকে ১২০ কোটি (১.১৫-১.২ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারের মধ্যে। বিডা ও অন্যান্য বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থার কাছে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রাথমিক নিবন্ধন বা প্রস্তাব জমা পড়লেও বাস্তবে সেই মূলধন বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দীর্ঘসূত্রতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বিডার সূত্রে এইসব তথ্য জানা যায়। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, আইনি জটিলতা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে বিদেশীরা এখনো বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদী মূলধন খাটাতে ধীরচলো নীতি অনুসরণ করছেন। বিগত সরকারের আমলের ১৭ বছরের উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশে কখনোই বৈপ্লবিক মাত্রার এফডিআই আসেনি। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর মতে, বৈদেশিক মুদ্রা ও ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলাই বিনিয়োগকারীদের প্রধান বিবেচ্য বিষয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে নিট বৈদেশিক বিনিয়োগ এসেছে আনুমানিক ১১৫ থেকে ১২০ কোটি (১.১৫-১.২ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারের মধ্যে। নতুন বিনিয়োগকারীদের আনা ইকুইটি মূলধনের চেয়ে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর অর্জিত মুনাফা পুনরায় বিনিয়োগের পরিমাণই এখানে প্রধান অংশ ছিল। নতুন বিদেশী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নতুন মূলধন আনার হার তুলনামূলকভাবে নি¤œমুখী ছিল।
অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বিডার সূত্রে জানা যায়, পলাতক ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার ১৭ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশে এফডিআই একটি নির্দিষ্ট গ-ির মধ্যেই আবর্তিত হয়েছে। ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশে রেকর্ড ৩৮৯ কোটি ডলার বিনিয়োগ আসে (যদিও এ হিসাব নিয়ে পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের-আইএমএফ আপত্তি ছিল)। তবে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর থেকেই তা কমতে শুরু করে। ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে তা হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ১১৫ কোটি ডলারে। ২০২০-২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী মহামারী ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বিনিয়োগের পরিমাণ কোনো অর্থবছরেই ১৮০ কোটি ডলারের কোটা পার হতে পারেনি। ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী শাসনামলের বিদায়ী অর্থবছরে নিট বিনিয়োগ আসে মাত্র ১৪৬ কোটি ডলার। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম অর্থবছরে সামান্য উন্নতি ঘটে বিনিয়োগ দাঁড়ায় ১৭২ কোটি ডলারে। ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে পুনরায় সাময়িক নি¤œমুখী হয়ে নিট এফডিআই নেমে আসে ১৪৬ কোটি ডলারে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ডাটা স্পষ্ট দেখাচ্ছে, সাত-আট বছর ধরে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ প্রায় একই স্থবির ধারায় আটকে আছে। বিনিয়োগের মতো তৈরি পোশাক (গার্মেন্টস) রফতানি খাতও গত কয়েক বছর ধরে বৈশ্বিক মন্দা, মূল্যস্ফীতি ও অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে। করোনা ও ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় ২০২১ সাল থেকেই এই খাতে এক ধরনের মন্দাভাব পরিলক্ষিত হয়।
সূত্রে জানা যায়, ২০২১-২০২২ অর্থবছরে গার্মেন্টস রফতানি হয়েছিল ৪২.৬১ বিলিয়ন ডলার। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৩৮.১৭ বিলিয়ন ডলারে। ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনের শেষ বছরে রফতানি তলানিতে গিয়ে ঠেকে ৩৬.১৩ বিলিয়ন ডলারে। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে ইতিবাচক ঘুরে দাঁড়িয়ে চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৯.৩৫ বিলিয়ন ডলারের গার্মেন্টস পণ্য রফতানি হয়। ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে রফতানি কিছুটা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৮.৭০ বিলিয়ন ডলারে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, উপাত্ত পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রফতানি খাত পুরোপুরি বন্ধ না হলেও বা ধ্বংস না হলেও ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলের শেষ বছরের (৩৬.১৩ বিলিয়ন) তুলনায় বর্তমানে দেশের গার্মেন্টস রফতানির অবস্থান দৃশ্যমানভাবে উন্নত।
কূটনৈতিক তৎপরতার ঘাটতি প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানান, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই অর্থনৈতিক কূটনীতিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। আমাদের দূতাবাসগুলো বিদেশের ব্যবসায়ী ফোরাম এবং বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে নিয়মিত রোডশো ও দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ সুদের হার এবং স্থানীয় মুদ্রা বাজারের উদ্বেগের কারণে বিদেশিরা চূড়ান্ত চুক্তি সই করার ক্ষেত্রে কিছুটা সময় নিচ্ছেন। আমরা বিশ্বাস করি, সরকার যেসব কাঠামোগত সংস্কার হাতে নিয়েছে, তার ইতিবাচক ফল আগামীতে দৃশ্যমান হবে।”
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, প্রশাসনিক সংস্কার না হলে কেবল অর্থনৈতিক রোডশো করে বিনিয়োগ আনা সম্ভব নয়। আমরা বিনিয়োগ প্রসেস সহজ করতে ওয়ান স্টপ সার্ভিস শতভাগ ডিজিটাল করার চেষ্টা করছি। বিনিয়োগ সংক্রান্ত প্রবিধান এবং মুনাফা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে। দেশে যেসব বিদেশি কোম্পানি ইতোমধ্যে কাজ করছে, তারা তাদের অর্জিত মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ করছে, যা আমাদের প্রতি তাদের আস্থার প্রমাণ। তবে একেবারে নতুন আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের টানতে আরও কিছু দিন সময় লাগবে।”
বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কূটনীতি বিশেষজ্ঞ ও সাবেক রাষ্ট্রদূত সাকিব আলী বলেন, ‘‘বিদেশিরা কেবল কূটনৈতিক মিষ্টি কথায় কোনো দেশে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করে না; তারা দেখে ব্যবসার সহজলভ্য সূচক, আইন-শৃঙ্খলার স্থায়িত্ব এবং বন্দর ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা। বাংলাদেশে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের অভাব এবং বন্দরগুলোতে দীর্ঘসূত্রতা বিনিয়োগকারীদের অন্যতম প্রধান বাধা। বিগত ১৭ বছর ধরে আমরা বিনিয়োগের বড় বড় অঙ্কের খবর শুনেছি, কিন্তু বাস্তবে তার একটি বড় অংশই কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ ছিল। পরিকাঠামো ও নীতির নির্ভরযোগ্যতা না থাকলে বিনিয়োগ আসবে না।”
বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম বলেন, “যে দেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা তাদের কষ্টার্জিত মুনাফা বা ডিভিডেন্ড সহজে নিজেদের দেশে ফেরত নিয়ে যেতে পারবেন কি না তা নিয়ে শঙ্কায় থাকেন, সেখানে নতুন মূলধন আসার গতি ধীর হতে বাধ্য। বাণিজ্য নীতি ও অর্থপাচার রোধে দৃশ্যমান সুশাসন না এলে বিশ্ববাজারে প্রচার চালিয়েও কাক্সিক্ষত এফডিআই আসবে না।”
তিনি আরও বলেন, কূটনৈতিক মিশনগুলোর মাধ্যমে অর্থনৈতিক সংলাপ জোরদার করা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ, তবে বিনিয়োগ টানার আসল যুদ্ধটা লড়তে হয় দেশের ভেতরের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক মাঠে। কেবল বিদেশি নীতি ও ব্র্যান্ডিং দিয়ে আন্তর্জাতিক মূলধন আকর্ষণ করা যায় না; তার জন্য প্রয়োজন বন্দরের দক্ষতা বাড়ানো, জ্বালানি স্বনির্ভরতা, ব্যাংক খাতের সুশাসন ও প্রশাসনিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য বন্ধ করা। দেশীয় ব্যবসায়িক পরিবেশ সহজ ও ঝামেলামুক্ত হলেই বৈদেশিক বিনিয়োগের চাকা গতিশীল হবেÑঅন্যথায় কাক্সিক্ষত বিনিয়োগের জন্য কূটনৈতিক অপেক্ষা দীর্ঘ হতেই থাকবে।
পোশাক খাতের রফতানি নিয়ে ব্যবসায়ীরা জানান, “বৈশ্বিক বাজারে মন্দার পরও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত তার স্থিতিস্থাপকতা প্রমাণ করেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের যে সর্বনি¤œ দরপতন ছিল, সেখান থেকে আমরা ঘুরে দাঁড়িয়েছি। তবে বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে হলে বন্দর সক্ষমতা বৃদ্ধি ও লজিস্টিক সাপোর্ট জোরদার করতেই হবে।”
