৫২ মিনিট আগে
![]()
মিন্টু দেশোয়ারা
![]()
আনিসুর রহমান
মৌলভীবাজারের এম সাইফুর রহমান স্টেডিয়ামের জীর্ণশীর্ণ গ্যালারির সামনের বেষ্টনী ছেয়ে গেছে আগাছায়। ছবি: দ্য ডেইলি স্টার
মৌলভীবাজারে ৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল এম সাইফুর রহমান স্টেডিয়াম। উদ্দেশ্য ছিল, খেলাধুলা ও বিনোদনের কেন্দ্র হয়ে উঠবে স্টেডিয়ামটি। কিন্তু দুই দশক পেরোতে না পেরোতেই সেই স্বপ্ন অনেকটা ফিকে হয়ে এসেছে। অযত্ন-অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে অবকাঠামো, খেলার মাঠের অবস্থাও বেহাল। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সন্ধ্যার পর মাদক কেনাবেচা ও সেবনের অভিযোগ। তাতে যে উদ্দেশ্যে স্টেডিয়ামটি নির্মাণ করা হয়েছিল, তা অনেকটাই ব্যাহত হচ্ছে।
সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের নামে তার নিজ শহরে নির্মিত স্টেডিয়ামটি ২০০৫ সালের এপ্রিলে উদ্বোধন করেছিলেন তিনি নিজেই। অথচ যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেই স্টেডিয়াম এখন অনেকটাই জৌলুশ হারিয়েছে।
অনুশীলনের মাঠ হারাচ্ছেন তরুণ ক্রীড়াবিদেরা
এক স্তরবিশিষ্ট গ্যালারি, জেলা ক্রীড়া সংস্থার কার্যালয়, ড্রেসিংরুম ও খেলার মাঠ নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল স্টেডিয়ামটি। প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, এর আয়তন ১ হাজার ৮০০ বর্গফুট। ঢাকার চারটি প্রতিষ্ঠান চার ধাপে নির্মাণকাজ করেছে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হয়নি, নির্মাণকাজ গড়িয়েছে বাড়তি সময় পর্যন্ত।
দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় মাঠের মাটি শক্ত হয়ে গেছে, জায়গায় জায়গায় তৈরি হয়েছে উঁচুনিচু অংশ। এমন মাঠে খেলতে গিয়ে চোট পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বছরের পর বছর স্টেডিয়ামটির বড় ধরনের কোনো সংস্কার হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বিভিন্ন স্থানে পলেস্তারা খসে পড়ছে। পশ্চিম পাশের প্যাভিলিয়ন গ্যালারির কাছে বেরিয়ে আছে মরিচা ধরা লোহার রড। উত্তর-পূর্ব পাশের গ্যালারির নিচ থেকে মাটি সরে গিয়ে তৈরি হয়েছে বড় গর্ত। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেষ্টনী ও কলাপসিবল গেট। সীমানা প্রাচীরের কিছু অংশও ধসে পড়েছে।
মাঠজুড়ে আগাছা আর ঘাসের ছড়াছড়ি। প্যাভিলিয়ন ও শৌচাগারের আশপাশে জমে আছে ময়লা-আবর্জনা। খেলার মাঠে অবাধে চরে বেড়াচ্ছে গরু-ছাগল। এমন অবস্থায় দক্ষিণ পাশের জাল দিয়ে ঘেরা ছোট্ট একটি পাকা জায়গাই এখন ক্রিকেট অনুশীলনের একমাত্র ভরসা।
বিকল্প কোনো জায়গা না থাকায় সেখানেই অনুশীলন করেন আলী হোসেন। তার চোখের সামনেই বদলে গেছে স্টেডিয়ামের চেনা পরিবেশ।
স্টেডিয়ামের চারপাশের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে পড়েছে। ছবি: দ্য ডেইলি স্টার
আলী হোসেন বলেন, ‘একসময় এখানে ক্রিকেট-ফুটবল ম্যাচ হলে পুরো স্টেডিয়াম জমে উঠত। চারদিকে উৎসবমুখর পরিবেশ থাকত। কিন্তু এখন সেই চিত্র একেবারেই পাল্টে গেছে। প্যাভিলিয়ন আর শৌচাগার ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। চারপাশ আগাছায় ছেয়ে গেছে।’
প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা না থাকায় নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়েরা উৎসাহ হারাচ্ছেন বলেও জানান তিনি।
একই হতাশার কথা শোনালেন মৌলভীবাজার সদর উপজেলার চাঁদনীঘাট এলাকার তরুণ ফুটবলার ইমরান হোসেন। তাঁর ভাষায়, মাঠের শক্ত ও অসমান মাটি, বড় হয়ে ওঠা ঘাস, গবাদিপশুর বিচরণ আর পানীয় জলের অভাবে নিয়মিত অনুশীলন করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
সন্ধ্যা নামলেই মাদকের আড্ডা, অভিযোগ স্থানীয়দের
দিনের বেলায় স্টেডিয়ামে কিছু খেলোয়াড়ের আনাগোনা থাকলেও সন্ধ্যা নামার পর সেখানকার পরিবেশ বদলে যায় বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। তাদের দাবি, সূর্য ডোবার পর স্টেডিয়ামের নির্জন জায়গাগুলোতে দল বেঁধে জড়ো হয় মাদকসেবী ও বিক্রেতারা। সেখানে গাঁজা, ইয়াবা ও ফেনসিডিল কেনাবেচা এবং সেবন চলে। চুরি-ছিনতাইয়ের অভিযোগও রয়েছে। এসব কারণে সন্ধ্যার পর স্টেডিয়ামে যেতেও ভয় পান অনেকে।
সৌদিপ্রবাসী সানাউল্লাহ বলেন, ‘কখন কী ঘটে যায়, সেই ভয়ে আমরা সন্তানদের মাঠে নিয়ে যেতে পারি না। স্টেডিয়ামটি এখন আর খেলাধুলার জায়গা নেই, মাদকের বাজারে পরিণত হয়েছে।’
তার অভিযোগ, এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করলে উল্টো হুমকির মুখে পড়তে হয়। পরিস্থিতি বদলাতে নিয়মিত পুলিশের অভিযান ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্টেডিয়ামের খেলার মাঠে চরে বেড়াচ্ছে ছাগল। ছবি: দ্য ডেইলি স্টার
স্টেডিয়ামের পাশেই থাকেন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা লিয়াকত আলী। বছরের পর বছর ধরে সন্ধ্যার পর সেখানে এমন কর্মকাণ্ড চলছে বলে অভিযোগ করে বলেন, ‘দিনের বেলায় এখানে ৫০ থেকে ১০০ জন খেলোয়াড়কে দেখা যায়। কিন্তু সন্ধ্যা হওয়ার আগেই সবাই চলে যান। স্টেডিয়াম ফাঁকা হয়ে গেলেই শুরু হয় এসব অবৈধ কর্মকাণ্ড।’
শুধু মৌলভীবাজার নয়, রক্ষণাবেক্ষণের সংকট দেশজুড়েই
১৮ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার এম সাইফুর রহমান স্টেডিয়ামের এই দুরবস্থা দেশের সরকারি ক্রীড়া অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে।
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) এ পর্যন্ত সারা দেশে ৬৩টি জেলা স্টেডিয়াম ও উপজেলা পর্যায়ে ১২৫টি মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণ করেছে। আরও ২০১টি স্টেডিয়ামের কাজ চলছে।
গত মার্চে দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার একটি ক্রীড়া স্থাপনার চিত্র। খেলাধুলার জন্য তৈরি সেই স্থাপনাও বাজারে পরিণত হয়েছে। সরকারি খেলার মাঠ ও ক্রীড়া স্থাপনার দেখভাল নিয়ে সেখানেও একই ধরনের প্রশ্ন উঠেছিল।
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা না থাকলে আমরা কেন স্টেডিয়াম বানাচ্ছি, সেটি ভেবে দেখা দরকার। শুধু বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ না করে উন্মুক্ত খেলার মাঠের দিকেও আমাদের নজর দেওয়া উচিত।’
জানা গেছে, চলতি বছর সারা দেশের ক্রীড়া স্থাপনাগুলো মেরামতের জন্য ১৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। আগের অর্থবছরের তুলনায় যা ৪ কোটি টাকা বেশি।
কিন্তু বরাদ্দের বড় অংশই চলে যায় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা আয়োজনের উপযোগী করে বিভিন্ন ভেন্যুর উন্নয়নকাজে। অন্যদিকে জেলা ক্রীড়া সংস্থাগুলো বছরে মাত্র ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা বরাদ্দ পায়। এই অর্থ থেকে কার্যালয়ের রক্ষণাবেক্ষণের খরচও চালাতে হয়। ফলে বড় ধরনের সংস্কারকাজের জন্য তেমন কিছু অবশিষ্ট থাকে না।
সংস্কার জরুরি, মানছেন সংশ্লিষ্টরাও
স্টেডিয়ামের অফিস সহকারী সৈয়দ শিপন জানান, পুরো স্টেডিয়াম দেখভালের দায়িত্বে আছেন মাত্র দুজন অস্থায়ী কর্মী। এর মধ্যে ঘাস কাটার একটি যন্ত্রও চুরি হয়ে গেছে।
মৌলভীবাজার জেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্যসচিব হানিফ মোহাম্মদ খান নিয়াজও মনে করেন, স্টেডিয়ামটি দ্রুত সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন। তিনি জানান, বিষয়টি ইতিমধ্যে স্থানীয় সংসদ সদস্যকে জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কাউন্সিলর মনোয়ার আহমেদ রহমান বলেন, স্টেডিয়ামের কিছু সংস্কারকাজ করা হয়েছে। আগে চুরির ঘটনা ঘটায় এখন গেটগুলো তালাবদ্ধ রাখা হয়।
তার মতে, মাঠ, গ্যালারি ও ড্রেসিংরুম সংস্কার করা গেলে এই স্টেডিয়ামেই জাতীয় ও বিভাগীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতা আয়োজন করা সম্ভব। তবে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চুরি এবং মাঠে গবাদিপশুর প্রবেশের বিষয়গুলো এখনো উদ্বেগের কারণ হয়ে আছে।
স্টেডিয়াম চত্বরজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ময়লা-আবর্জনা। ছবি: দ্য ডেইলি স্টার
এদিকে জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল জানিয়েছেন, বাজেটের সীমাবদ্ধতার কারণে স্টেডিয়ামের উন্নয়নকাজ এগিয়ে নেওয়া কঠিন হচ্ছে।
স্টেডিয়ামে মাদকসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের অভিযোগ নিয়ে তার কার্যালয়ে এখনো কেউ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেননি বলে জানান তিনি। তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি দল পাঠানো হবে। প্রয়োজনে মাদক প্রতিরোধে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেও যুক্ত করা হতে পারে।
স্টেডিয়াম বানালেই কি দায়িত্ব শেষ?
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের একটি প্রকল্প প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুস্বাস্থ্য, উদ্যম, শক্তি, শৃঙ্খলা ও চরিত্র গঠনে খেলাধুলার গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু মৌলভীবাজারের এম সাইফুর রহমান স্টেডিয়ামের বর্তমান চিত্র সেই উদ্দেশ্য পূরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। কোটি কোটি টাকা খরচ করে ক্রীড়া স্থাপনা নির্মাণ করা হলেও মানুষ কি আসলেই তার সুফল পাচ্ছেন?
নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, কার্যকর তদারকি এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া না হলে স্টেডিয়ামটি খেলোয়াড় ও সাধারণ মানুষের কাজে আসার বদলে অব্যবহৃতই পড়ে থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
তাই প্রশ্নটা এখন শুধু মৌলভীবাজারের একটি স্টেডিয়ামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, বাংলাদেশের কি আরও নতুন খেলার মাঠ প্রয়োজন, নাকি ইতিমধ্যে নির্মিত স্টেডিয়াম ও ক্রীড়া স্থাপনাগুলোর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করাই বেশি জরুরি?
