দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও লাতিন আমেরিকায় সাম্প্রতিক রেলপথ নির্মাণের চুক্তির পর বিশ্বজুড়ে অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ আরও জোরদার করছে চীন। এরই ধারাবাহিকতায় মধ্যপ্রাচ্যের ছোট দেশ কাতারে টানেল নির্মাণ প্রকল্পে কাজ করতে সম্মত হয়েছে চীনের একটি নির্মাণপ্রতিষ্ঠান।
চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে টানেল গ্রুপ কাতারের শিল্পগোষ্ঠী আমাল কোম্পানির একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করেছে।
মঙ্গলবার দোহাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, কাতার ও বৃহত্তর অঞ্চলে টানেল নির্মাণ প্রকল্প এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে দুই প্রতিষ্ঠান ‘কৌশলগত সহযোগিতায়’ সম্মত হয়েছে।
চীনা প্রতিষ্ঠানটি পাহাড়ের ভেতর দিয়ে, পানির নিচে এবং নগর এলাকার গণপরিবহন নেটওয়ার্কের জন্য টানেল নির্মাণে বিশেষজ্ঞ। আমাল কোম্পানির সহযোগী প্রতিষ্ঠান অ্যাডভান্সড পাইপস অ্যান্ড কাস্টস কোম্পানি কাতার ও আশপাশের দেশগুলোর অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য পাইপব্যবস্থা এবং আগে থেকে তৈরি কংক্রিটের বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করে।
কাতার ও প্রতিবেশী সৌদি আরব ৭৮৫ কিলোমিটার (৪৮৮ মাইল) দীর্ঘ একটি দ্রুতগতির রেলপথ নির্মাণ করছে। এই রেলপথ কাতারের রাজধানী দোহাকে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের সঙ্গে যুক্ত করবে। পাশাপাশি দুই শহরের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও এর আওতায় যুক্ত হবে।
ছয় বছরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। জ্বালানিসমৃদ্ধ এই দুই দেশের মধ্যে পর্যটন ও আন্তসীমান্ত ব্যবসা বাড়ানোই রেলপথটির উদ্দেশ্য।
কাতার উপসাগরীয় রেলপথ প্রকল্পেও অবদান রাখছে। মধ্যপ্রাচ্যের ছয়টি দেশকে নিয়ে ২ হাজার ১৭৭ কিলোমিটার (১ হাজার ৩৫৩ মাইল) দীর্ঘ এই প্রকল্প ২০৩০ সালের মধ্যে চালু হওয়ার কথা।
হংকং এডুকেশন ইউনিভার্সিটির সামাজিক বিজ্ঞান ও নীতিগবেষণা বিভাগের প্রধান নওবাহার শরিফ বলেন, ‘এটি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর এমন একটি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার প্রচেষ্টার অংশ, যা শুধু তেলের ওপর নির্ভরশীল নয়।’
তবে কয়েকজন বিশ্লেষক সতর্ক করে বলেছেন, চলমান আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বিঘ্ন ঘটতে পারে।
সিঙ্গাপুরের আইএসইএএস–ইউসুফ ইসহাক ইনস্টিটিউটের ভিজিটিং সিনিয়র ফেলো জয়ন্ত মেননের মতে, ইরানকে ঘিরে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ এবং ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের অক্টোবরে রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলার কারণে চীনা ঠিকাদাররা সম্ভবত মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রকল্পগুলোর কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখবে।
তিনি বলেন, রিয়াদের বিমানবন্দরকে যুক্ত করে এমন একটি প্রকল্পের কাজ অবশ্যই স্থগিত রাখা হবে।
মেনন বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের বিশৃঙ্খলা এসব অবকাঠামো প্রকল্পের অগ্রগতির গতিকে প্রভাবিত করবে।’
তবে তিনি উল্লেখ করেন, ঠিকাদাররা শুধু ২০২৬ সালের পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন না। বরং মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা আগামী কয়েক বছর বা কয়েক দশকের পরিপ্রেক্ষিতে মূল্যায়ন করবেন।
চীনের রেলওয়ে কোম্পানিগুলো চলতি বছর মঙ্গোলিয়া ও সিঙ্গাপুরে প্রকল্পের কাজ পেয়েছে। ব্রাজিলে চীনের একটি যৌথ কনসোর্টিয়াম কেবল দিয়ে ঝুলন্ত সেতু নির্মাণ করছে। অন্যদিকে কেনিয়ায় চীনের একটি নির্মাণ ও প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান দুর্গম উপত্যকার ওপর ৮৮০ মিটার দীর্ঘ একটি সেতু নির্মাণ করছে।
এসব প্রকল্পসহ আরও অনেক উদ্যোগ চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি একটি বিশাল বৈশ্বিক উন্নয়ন কর্মসূচি, যার মূল লক্ষ্য এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার মধ্যে অবকাঠামোগত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা।
শরিফের মতে, চায়না রেলওয়ে টানেল গ্রুপের সঙ্গে আমাল কোম্পানির সহযোগী প্রতিষ্ঠানের এই চুক্তি চীন ও কাতার সরকারের মধ্যে ‘সদ্ভাব তৈরি’ এবং দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা বাড়াতেও সহায়তা করবে।
তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটি যদি রাষ্ট্রায়ত্ত হয়, তাহলে বিষয়টি শুধু বাণিজ্যিক নয়।’
