ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট, নিম্নমানের অবকাঠামো এবং জনসেবায় বিনিয়োগ কমানোর প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। শনিবার রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে লাখো মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। দিনভর শান্তিপূর্ণ মিছিলের পর সন্ধ্যায় বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, সরকারি ভবনে অগ্নিসংযোগ, দোকানপাটে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, লাঠিচার্জ ও অন্যান্য দমনমূলক সরঞ্জাম ব্যবহার করে। এ ঘটনায় দেশজুড়ে এক হাজার ৮০০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আহত হয়েছেন পাঁচ শতাধিক পুলিশ সদস্য। প্যারিসের উত্তরে এক বিক্ষোভকারীর মৃত্যু হয়েছে বলেও জানিয়েছে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম।
রবিবার ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ গ্রেপ্তারের সংখ্যা এক হাজার ৮০০-তে পৌঁছানোর কথা জানান। বিক্ষোভের ব্যাপকতা ও সহিংসতা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে সমালোচনা
বাড়ছে। রাজধানী প্যারিসের মেয়র এমানুয়েল গ্রেগোয়ার বলেছেন, শহরের পুরো কয়েকটি সড়ক কার্যত বিধ্বস্ত হয়েছে।
ফ্রান্সের মধ্যাঞ্চলীয় লিমোজ শহরে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীদের দেওয়া আগুনে ১৪৩ বছরের পুরনো সিটি হলের বড় অংশ পুড়ে গেছে। স্থানীয় প্রশাসনের প্রধান মরিস বারাত বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ভবনটির পশ্চিম অংশ ছাড়া ছাদ ধসে নিচের তলাগুলোর ওপর পড়েছে এবং বাইরের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অংশ ধ্বংস হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী ভবনটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিকে তিনি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য বিপর্যয় হিসেবে বর্ণনা করেন।
দক্ষিণাঞ্চলীয় মার্সেই শহরে বিক্ষোভকারীরা নিরাপত্তাবেষ্টনী সরিয়ে তা দিয়ে সিটি হলের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। একপর্যায়ে একজন বিক্ষোভকারী দেয়ালে নৈরাজ্যবাদের প্রতীক ‘এ’ লিখে দেন। পরে পুলিশ তাদের বের করে দেয়। লিওঁ শহরে পর্যটন দপ্তরের ভবনেও আগুন দেওয়া হয়। বিভিন্ন শহরে সরকারি ভবন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও পুলিশের গাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে।
রাজধানী প্যারিসে শনিবার পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলজুড়ে কয়েক দশ হাজার মানুষ মিছিলে অংশ নেন। এ কর্মসূচিতে অনেকে ‘ম্যাক্রোঁ পদত্যাগ করো’ এবং ‘সবাই পুলিশকে ঘৃণা করে’— এমন স্লোগান দেন। তবে অধিকাংশ বিক্ষোভকারী শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করলেও সন্ধ্যার দিকে বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।
শহরের কেন্দ্রস্থল প্লাস দে লা রিপাবলিক এলাকায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কালো পোশাক ও মুখোশ পরা বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে আতশবাজি ও পাথর ছোড়েন। একটি ব্যাংকে হামলা, ক্রীড়াসামগ্রীর দোকানে লুটপাট এবং সড়কের বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙচুর করা হয়। কেউ কেউ চিৎকার করে বলেন, ‘আমরা বাস্তিল দখল করছি!’ এর পর ময়লা ফেলার পাত্রে আগুন দেওয়া হয়। কাচের পুনর্ব্যবহারযোগ্য বোতল রাখার পাত্র ভেঙে সেখান থেকে বোতল তুলে পুলিশের দিকে ছোড়া হয়। একটি পণ্যবাহী ট্রাকে আগুন দেওয়া হলে পাশের ভবনেও আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
প্লাস দে লা রিপাবলিকের উত্তরে শ্রমজীবী মানুষের বসতিপূর্ণ এলাকার মধ্য দিয়ে যাওয়া বুলভার ম্যাজেন্তা সড়কে কয়েক ডজন দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। বিক্ষোভকারীরা গ্যালারি লাফায়েত বিপণিবিতানে ঢোকার চেষ্টা করেন। ব্যাংক, লাকোস্তের একটি দোকানসহ বিভিন্ন অভিজাত বিপণিতে হামলা চালানো হয়। লুটপাটের শিকার হয় মুঠোফোনের দোকানও। আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা কাঁদানে গ্যাসের ঘন ধোঁয়া ছাদ পর্যন্ত উঠে যেতে দেখে বাড়ির জানালা ও দরজা বন্ধ করে দেন।
প্যারিস পুলিশ জানিয়েছে, শনিবার রাজধানীতে প্রায় এক লাখ ১০ হাজার মানুষ বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেন। দেশজুড়ে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা নিয়ে কর্তৃপক্ষ ও আয়োজকদের হিসাবে পার্থক্য রয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, সারা দেশে বিক্ষোভকারীর সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ ৫০ হাজার। তবে শ্রমিক সংগঠন সিজিটি বলেছে, এ সংখ্যা আট লাখের কাছাকাছি। প্যারিসে মিছিল চলাকালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ছাড়া শনিবারের সংঘর্ষে ১৩ পুলিশ ও জঁদার্মের সদস্য এবং দুই দমকলকর্মী আহত হন বলে পুলিশের বিবৃতির বরাতে জানিয়েছে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস।
খুচরা ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিটেইল অ্যান্ড ট্রেড ফেডারেশনের সভাপতি আলেকজান্দ্র বোমপার্ড জানিয়েছেন, বিক্ষোভে প্রায় এক হাজার ৫০০ দোকান ও খুচরা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এলসিআই টেলিভিশনকে তিনি বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষতির পরিমাণ কয়েক শ মিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছাতে পারে। প্যারিসের প্লাস দে লা রিপাবলিক এলাকায় রবিবার সকালে সড়ক থেকে উপড়ে ফেলা পাথর, ভাঙা দোকানের সামনের কাচ ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কাচের টুকরো শনিবার রাতের সহিংসতার চিহ্ন হয়ে ছিল। শহরের কেন্দ্রস্থলের কয়েকটি পর্যটন ও বাণিজ্যিক এলাকাতেও ক্ষয়ক্ষতি ও লুটপাটের খবর পাওয়া গেছে।
বিক্ষোভের সূত্রপাত গত মাসে প্যারিসের উত্তরাঞ্চলের দরিদ্র উপশহরগুলোর কয়েকটি স্কুলে। সেখানে শিক্ষকদের অনুপস্থিতি, শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জরাজীর্ণ অবকাঠামো এবং শিক্ষার মান নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়। পরে সেই ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে। শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে যুক্ত হয় জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, সামাজিক বৈষম্য, জনকল্যাণমূলক ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং সরকারি ব্যয় কমানোর প্রতিবাদ।
শনিবারের কর্মসূচির আয়োজকরা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের পাশাপাশি শ্রমিক, পেনশনভোগী ও কৃষকদের আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। সামাজিক মাধ্যমে ২০১৮ সালে সামাজিক অবিচার ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে গড়ে ওঠা ‘ইয়েলো ভেস্ট’ বা হলুদ জ্যাকেট আন্দোলন নতুন করে সক্রিয় করার ডাকও দেওয়া হয়। শনিবার বিভিন্ন স্থানে উজ্জ্বল রঙের নিরাপত্তা-জ্যাকেট পরা বিক্ষোভকারীদের সড়ক অবরোধ করতে দেখা যায়।
ফ্রান্সের অন্যতম বৃহৎ শ্রমিক সংগঠন সিজিটি আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। সংগঠনটি উচ্চ মজুরি ও পেনশন, নিত্যপণ্যের দাম কমানো এবং মানুষের প্রয়োজন পূরণে সক্ষম জনসেবা সুরক্ষার দাবি তুলেছে। অক্টোবরে দুই হাজার মানুষের ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ফ্রান্সের প্রায় ৪৫ শতাংশ মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বিগ্ন।
বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ বিভিন্ন স্থানে কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ করে। এদিকে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পুলিশের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের অভিযোগ বাড়ছে। পুলিশের আচরণ তদারককারী সংস্থা অন্তত দুই ডজন অভিযোগ তদন্ত করছে। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কয়েকজন কিশোরের গুরুতর আঘাতের জন্য পুলিশের দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত অস্ত্রকে দায়ী করেছেন তাদের সমর্থকরা।
ফ্রান্সে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে বাম ও ডানপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অবস্থানগত বিভাজনও স্পষ্ট হয়েছে। কট্টর বামপন্থি ফ্রান্স আনবোও দলের নেতা জঁ-লুক মেলঁশোঁ মঙ্গলবারের একটি বিক্ষোভে অংশ নেন এবং শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানান। তবে তিনি বিক্ষোভকারীদের লুটপাট থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড তাদের আন্দোলনের পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অন্যদিকে, কট্টর ডানপন্থি নেতা মারিন ল্য পেন দাঙ্গাকারীদের নিন্দা করেছেন। তার অভিযোগ, মেলঁশোঁর দল সহিংসতাকে বৈধতা দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকেও কট্টর বামপন্থি গোষ্ঠীগুলোকে সহিংসতার জন্য দায়ী করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, হাজার হাজার কট্টর বামপন্থি বিক্ষোভকারীর সঙ্গে অপরাধীরা যোগ দিয়ে বিভিন্ন ভবনে লুটপাট ও ভাঙচুর চালিয়েছে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এসে এ আন্দোলন শুরু হলো। আগামী নির্বাচনে তার উত্তরসূরি নির্ধারণের প্রায় ছয় মাস আগে দেশটিতে রাজনৈতিক মেরুকরণ ও বিভক্তির মধ্যে বিক্ষোভ নতুন চাপ তৈরি করেছে। শুক্রবার ম্যাক্রোঁ শান্ত থাকার এবং মানুষ ও সম্পদের প্রতি সম্মান দেখানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন।
রবিবার ম্যাক্রোঁ মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঙ্গে সংকট নিয়ে বৈঠক করার কথা জানান এলিজে প্রাসাদ। এর পর সন্ধ্যায় টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে তার। ফরাসি সময় রাত ৮টায় নির্ধারিত ওই ভাষণে শনিবারের সহিংসতা ও পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে তার বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী লেকর্নুরও আগামী কয়েক দিনের মধ্যে প্যারিস, মার্সেই ও লিওঁর মেয়রদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে।
ফ্রান্সের সহিংসতা নিয়ে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘ফ্রান্স জ্বলছে!’ এর পর দেশটিতে অভিবাসনের কারণে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে বলে দাবি করে সীমান্ত বন্ধ করা এবং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ কঠোর করার আহ্বান জানান তিনি। তার ভাষ্য, ভিন্ন এক জগতের মানুষের অভিবাসন ও তাদের মধ্যে থাকা বিদ্বেষ এক সময়কার মহান দেশটিকে ভেঙে দিয়েছে। তবে এ বক্তব্যের পক্ষে তিনি কোনো তথ্য দেননি।
এদিকে প্যারিসে শনিবারের বিক্ষোভের ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে ৫১৭ জনকে পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়েছিল বলে জানিয়েছে সরকারি কৌঁসুলির দপ্তর। তাদের মধ্যে ৩৪৬ জন প্রাপ্তবয়স্ক এবং ১৭১ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক। সংখ্যাটি প্রাথমিক এবং পরিবর্তিত হতে পারে বলে জানানো হয়। চুরি করা মালামাল গ্রহণ, সহিংসতার উদ্দেশ্যে সংঘবদ্ধ হওয়া এবং ভাঙচুরের অভিযোগে অধিকাংশকে আটক করা হয়েছে।
ফ্রান্সে শনিবারের বিক্ষোভের পর পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা নিয়ে কর্তৃপক্ষ সতর্ক রয়েছে। শিক্ষার্থীদের শিক্ষাসংক্রান্ত দাবি থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন জীবনযাত্রার ব্যয়, সামাজিক বৈষম্য ও জনসেবার সংকটের প্রতিবাদে বিস্তৃত হয়েছে। এর সঙ্গে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট যুক্ত হওয়ায় দেশজুড়ে সরকারি স্থাপনা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও পুলিশের নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
