ইউরোপের ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন ও পর্তুগালে গত দুই দশকে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। খাদ্যপণ্য, জ্বালানি, বিভিন্ন পরিষেবা ও আবাসনের মূল্যবৃদ্ধিতে চাপে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। আয় বাড়লেও অনেক ক্ষেত্রে তা ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। ফলে এসব দেশে পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা ও আবাসনসংকট নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার ১৯ অক্টোবর প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের মূল্যসূচকের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, ২০০০ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে স্পেনে পণ্য ও পরিষেবার দাম প্রায় ৭৮ শতাংশ, পর্তুগালে ৭১ শতাংশ, ইতালিতে ৬৮ শতাংশ এবং ফ্রান্সে ৫৯ শতাংশ বেড়েছে।
এর অর্থ, ২০০০ সালে যে পণ্য কিনতে ১০০ ইউরো ব্যয় হতো, ২০২৬ সালে একই ধরনের পণ্য ও পরিষেবার জন্য স্পেনে গড়ে প্রায় ১৭৮ ইউরো প্রয়োজন হচ্ছে। অন্যান্য দেশেও দীর্ঘমেয়াদি মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় বেড়েছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রকৃত মজুরির পরিবর্তনও সাধারণ মানুষের আর্থিক অবস্থাকে প্রভাবিত করছে। প্রকৃত মজুরি বলতে মূল্যস্ফীতির প্রভাব সমন্বয়ের পর আয়ের ক্রয়ক্ষমতাকে বোঝায়।
ওইসিডির মজুরি-তথ্য ও ইউরোস্ট্যাটের মূল্যসূচকভিত্তিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইতালিতে গড় পূর্ণকালীন মজুরির প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা প্রায় ৫ শতাংশ কমেছে। বিপরীতে, একই সময়ে ফ্রান্সে তা ১১ শতাংশ, স্পেনে ৭ শতাংশ এবং পর্তুগালে ২০ শতাংশ বেড়েছে।
তবে প্রকৃত মজুরি বাড়লেই যে পরিবারের আর্থিক চাপ কমবে, তা নয়। বাড়িভাড়া, ঋণের কিস্তি, জ্বালানি ও অন্যান্য অপরিহার্য ব্যয় দ্রুত বাড়লে আয় বৃদ্ধির সুফল অনেকটাই কমে যেতে পারে।
চার দেশের মানুষের জন্য আবাসন এখন অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। ওইসিডির মূল্য-আয় অনুপাত অনুযায়ী, ২০০০ সালের তুলনায় স্পেনে বাড়ির দাম ও আয়ের অনুপাত ৫৬ শতাংশ এবং ফ্রান্সে ৩৯ শতাংশ বেড়েছে। ইতালিতে এই বৃদ্ধি প্রায় ৫ শতাংশ। পর্তুগালে ২০১৫ সালের পর থেকে অনুপাতটি বেড়েছে ৬৭ শতাংশ।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে পর্তুগালে বাড়ির দাম আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাড়ির দাম বৃদ্ধির গড় হার ছিল ৫ দশমিক ১ শতাংশ।
লিসবন, পোর্তো, মাদ্রিদ ও বার্সেলোনার মতো বড় শহরে বাড়ির দাম ও ভাড়ার ঊর্ধ্বগতি স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে তরুণ, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবার এবং প্রথমবার বাড়ি কিনতে আগ্রহীদের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে।
মূল্যস্ফীতির হার কমে যাওয়া মানেই বাজারে পণ্য ও পরিষেবার দাম কমে যাওয়া নয়। মূল্যস্ফীতি ইতিবাচক থাকলে সাধারণত দাম বাড়তেই থাকে, তবে বৃদ্ধির গতি কমতে পারে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ইউরো অঞ্চলের বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। ফ্রান্সে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে তুলনাযোগ্য মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং স্পেনে ৫ শতাংশ।
দীর্ঘ সময় ধরে দাম বাড়তে থাকায় আগের বছরগুলোর মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবও এখন পরিবারের বাজেটে রয়ে গেছে। খাদ্য, পরিবহন, বিদ্যুৎ ও আবাসনের মতো অপরিহার্য খাতে ব্যয় বেশি হওয়ায় অন্যান্য প্রয়োজন মেটানোর সুযোগ সংকুচিত হতে পারে।
চারটি দেশের পরিস্থিতিতে কিছু পার্থক্য রয়েছে। স্পেনে দীর্ঘমেয়াদি মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি আবাসনব্যয় বড় উদ্বেগের বিষয়। ইতালিতে প্রকৃত মজুরির ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পর্তুগালে দ্রুত বাড়তে থাকা বাড়ির দাম আবাসনকে আরও ব্যয়বহুল করে তুলছে। আর ফ্রান্সে বড় শহরগুলোর উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয় সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
সামগ্রিকভাবে, ইউরোপের এসব দেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, জীবনযাত্রার ব্যয় শুধু বাজারদরের ওপর নির্ভর করে না। মজুরি, বাড়িভাড়া, করব্যবস্থা, সামাজিক সুরক্ষা এবং সাশ্রয়ী আবাসনের সুযোগও মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
দীর্ঘমেয়াদি মূল্যবৃদ্ধির চাপ কমাতে আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা, সাশ্রয়ী আবাসনের ব্যবস্থা এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর জন্য কার্যকর সামাজিক সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
The post ইউরোপের চার দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় আকাশছোঁয়া, চাপে সাধারণ মানুষ appeared first on ভোরের চেতনা.
