স্থানীয় সরকার ইউপি নির্বাচনের বিভিন্ন ধাপের তারিখ ঘোষণার পর ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার শিল্পসমৃদ্ধ হবিরবাড়ী ইউনিয়নে বইতে শুরু করেছে নির্বাচনী হাওয়া। চায়ের দোকান, হাটবাজার থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লা—সবখানেই এখন আলোচনার কেন্দ্রে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীদের নিয়ে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। কেউ সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়ে নিজের অবস্থান জানান দিচ্ছেন, আবার কেউ ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন।
আসন্ন হবিরবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে বিএনপির পাঁচজন এবং জামায়াতে ইসলামীর একজন সম্ভাব্য প্রার্থীকে ঘিরে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে।
বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা হলেন—হবিরবাড়ী ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক প্রচার সম্পাদক ও ইউপি নির্বাচনে দলটির সাবেক মনোনীত প্রার্থী মো. খলিলুর রহমান (বিএসএস), উপজেলা বিএনপির সাবেক তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক এবং ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. আমিনুল ইসলাম খান বাশান, ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা যুবদলের সদস্য ও হবিরবাড়ী ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ জিয়াউর রহমান, জামিরদিয়া আবদুল গণি মাস্টার স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রভাষক ও ইউনিয়ন যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম লিটন এবং ভালুকা উপজেলা কৃষকদলের যুগ্ম আহ্বায়ক নূর মোহাম্মদ সিদ্দিকী টিপু।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন দলটির ১০ নম্বর হবিরবাড়ী ইউনিয়ন শাখার আমির অধ্যক্ষ শাহাব উদ্দিন শেখ।
সম্ভাব্য প্রার্থীদের মাঝে
হবিরবাড়ী ইউনিয়নের উন্নয়ন ও মানুষের প্রত্যাশা পূরণকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়ে খলিলুর রহমান বলেন, “আমি দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত আছি। অতীতেও মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। দল আমাকে আবার মনোনয়ন দিলে এবং জনগণ ভোট দিয়ে নির্বাচিত করলে হবিরবাড়ী ইউনিয়নের রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, নাগরিক সেবার মান বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের সমস্যা সমাধানে কাজ করতে চাই। আমি চাই, ইউনিয়ন পরিষদ হবে মানুষের আস্থার জায়গা, যেখানে দল-মত নির্বিশেষে সবাই সমানভাবে সেবা পাবেন।”
এলাকার উন্নয়ন ও জনসম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আমিনুল ইসলাম খান বাশান বলেন, “হবিরবাড়ী ইউনিয়নের মানুষের সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্ক রয়েছে। আমি চাই, ইউনিয়নের উন্নয়ন পরিকল্পনা হবে মানুষের প্রয়োজনকে সামনে রেখে। দলীয় মনোনয়ন পেলে নির্বাচনে অংশ নিতে চাই। জনগণের সমর্থন পেলে রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, নাগরিক সুবিধা সম্প্রসারণ, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে অগ্রাধিকার দেব।”
তরুণ সমাজের উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের বিষয়ে জিয়াউর রহমান বলেন, “হবিরবাড়ী একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল। এখানে তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, খেলাধুলার পরিবেশ তৈরি এবং মাদক থেকে যুবসমাজকে দূরে রাখতে সামাজিক উদ্যোগ বাড়ানো প্রয়োজন। দল আমাকে মনোনয়ন দিলে এবং জনগণ নির্বাচিত করলে সবার মতামত নিয়ে ইউনিয়নের উন্নয়নে কাজ করতে চাই। আমার লক্ষ্য হবে সাধারণ মানুষের সমস্যা শোনা এবং সাধ্যমতো তার সমাধান করা।”
শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে রফিকুল ইসলাম লিটন বলেন, “আমি মনে করি, একটি ইউনিয়নের উন্নয়ন শুধু রাস্তাঘাট নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা ও তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দলীয় মনোনয়ন পেলে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ইচ্ছা রয়েছে। জনগণের সমর্থন পেলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ উন্নয়ন, তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা এবং নাগরিক সেবা সহজ করার বিষয়ে কাজ করতে চাই।”
কৃষক ও সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষার বিষয়ে নূর মোহাম্মদ সিদ্দিকী টিপুর বলেন, “কৃষক ও সাধারণ মানুষের সমস্যা সমাধানে স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। আমি দলীয় মনোনয়ন পেলে নির্বাচনে অংশ নিতে চাই। জনগণের সমর্থন পেলে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা, গ্রামীণ সড়কের উন্নয়ন, দরিদ্র মানুষের সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা এবং এলাকার উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা বজায় রাখার চেষ্টা করব।”
সুশাসন ও জনসেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়ে অধ্যক্ষ শাহাব উদ্দিন শেখ বলেন, “আমি হবিরবাড়ী ইউনিয়নকে একটি উন্নত, পরিচ্ছন্ন ও জনবান্ধব ইউনিয়ন হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেলে জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করব। ইউনিয়ন পরিষদের সেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং এলাকার রাস্তাঘাটসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে চাই।”
ভোটারদের প্রত্যাশা উন্নয়ন ও নাগরিক সেবা
ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের প্রত্যাশার কেন্দ্রে রয়েছে সড়ক যোগাযোগ, পরিবেশ রক্ষা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, কর্মসংস্থান ও নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন। তাঁদের মতে, চেয়ারম্যান নির্বাচনের ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি প্রার্থীর যোগ্যতা, সততা ও মানুষের পাশে থাকার মানসিকতাও গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় ভোটাররা জানান, “নির্বাচনের সময় অনেক প্রার্থী উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু নির্বাচনের পর অনেককে আর কাছে পাওয়া যায় না। আমরা এমন একজন চেয়ারম্যান চাই, যিনি নিয়মিত মানুষের খোঁজ নেবেন এবং এলাকার সমস্যাগুলো সমাধানে আন্তরিক থাকবেন।”
স্থানীয় তরুণদের প্রত্যাশা, ইউনিয়নে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থান এবং মাদক প্রতিরোধে উদ্যোগ নিতে হবে। তাঁদের মতে, নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পাশাপাশি সারা বছর মানুষের পাশে থাকাটাই একজন জনপ্রতিনিধির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে বিএনপির একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী থাকায় দলীয় মনোনয়ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য প্রার্থীকে ঘিরেও আলোচনা চলছে। তবে শেষ পর্যন্ত কারা নির্বাচনে অংশ নেবেন, দলীয় মনোনয়ন কে পাবেন এবং ভোটারদের সমর্থন কোন দিকে যাবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
সব মিলিয়ে হবিরবাড়ী ইউনিয়নে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীদের ঘিরে নির্বাচনী আলোচনা শুরু হয়েছে। আনুষ্ঠানিক তফসিল ঘোষণা, দলীয় মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়া এবং প্রার্থীদের নির্বাচনী পরিকল্পনা প্রকাশের পর নির্বাচনী মাঠের পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
