শারদীয় দুর্গাপূজার উৎসব চলছে। দুর্গোৎসব উদযাপনের জন্য মোট পাঁচ দিনের ছুটিতে ঢাকা ছেড়েছেন অসংখ্য মানুষ। গ্রামে ফেরায় শহরে ভোগ্যপণ্যের চাহিদা কমেছে। এতে ঢাকার বাজারে সবজি ও কাঁচামালের চাহিদাও কমেছে।
পাইকারি ব্যবসায়ীদের হিসাবে, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বর্তমানে বাজারে এসব পণ্যের চাহিদা কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ। অন্যদিকে, ছুটির সময়ে চাহিদা ঠিকভাবে অনুমান করতে না পারায় ঢাকায় পণ্য পরিবহনের পরিমাণও কমেছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, সবজির সরবরাহ কমেছে প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। তবে সরবরাহের তুলনায় চাহিদা বেশি কমে যাওয়ায় বাজারে অবিক্রীত সবজির পরিমাণ বেড়েছে। ফলে পাইকারি বাজারে কমেছে দাম। এতে লোকসানে পণ্য বিক্রি করতে হচ্ছে অনেক ব্যবসায়ীকে। রাজধানীর কারওয়ান বাজারসহ প্রধান পাইকারি বাজার ঘুরে গতকাল বুধবার এমন চিত্র দেখা গেছে।
গতকাল বেলা ১১টার দিকে কারওয়ান বাজারে অনেক ব্যবসায়ীকে বেচাকেনা শেষে হিসাব মেলাতে দেখা যায়। ব্যবসায়ী, আড়তদার ও পাইকারি বিক্রেতারা জানান, অন্য দিনের তুলনায় ক্রেতা কম থাকায় প্রায় সব ধরনের সবজি কম দামে বিক্রি করতে হয়েছে। ফলের বাজারেও পড়েছে ছুটির প্রভাব।
দীর্ঘ ছুটিতে চীন থেকে আমদানি করা গাজরের দাম ও বিক্রিÑ দুটিই কমেছে। গত সপ্তাহে ১০ কেজির এক প্যাকেট গাজর ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ টাকায় বিক্রি হলেও বুধবার সকালে তা নেমে আসে ১ হাজার ৫০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকায়।
পাইকারি গাজর বিক্রেতা শফিকুল ইসলাম বলেন, আমদানি একই থাকলেও বিক্রি কমেছে। ক্রেতা কম থাকায় দামও কমেছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার খুচরা বিক্রেতারা চাহিদা কমে যাওয়ায় আগের তুলনায় কম গাজর কিনছেন। গত মঙ্গলবার থেকে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। রাতে ঢাকার বাইরে থেকে আসা সবজি কারওয়ান বাজারের আড়তে পৌঁছায়।
সেখান থেকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার খুচরা বিক্রেতাদের কাছে সবজি বিক্রি করেন আড়তদার মেহেদি হাসান জুয়েল। তিনি জানান, বর্তমানে প্রতি কেজি করল্লা বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকায়। স্বাভাবিক কর্মদিবসে একই করল্লার দাম থাকে ৫৫ টাকা। দাম কমার পাশাপাশি বিক্রির পরিমাণও কমেছে। সাধারণ কর্মদিবসে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ মণ করল্লা ও উচ্ছে বিক্রি হলেও ছুটির কারণে তা কমে সাত থেকে আট মণে নেমেছে।
আড়তদার সোহেল রানাও একই ধরনের পরিস্থিতির কথা জানান। তার আড়তে করল্লার পাশাপাশি উচ্ছে, পটোল ও বেগুন বিক্রি হয়। তিনি বলেন, প্রতি কেজি ৫৫ টাকার উচ্ছে এখন বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকায়। ২০ থেকে ২৫ টাকার পটোল নেমে এসেছে ১৮ থেকে ২০ টাকায়। আর ৩০ থেকে ৩৫ টাকার বেগুন বিক্রি হচ্ছে ২৫ টাকায়।
সোহেল রানা জানান, ছুটির কারণে রাজধানীর বাইরে থেকে সবজির সরবরাহ ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কমেছে। তবে চাহিদা কমেছে আরও বেশি। ফলে বাজারে পণ্য অবিক্রীত থেকে যাচ্ছে।
ছুটির প্রভাব পড়েছে কাঁচামরিচের বাজারেও। কারওয়ান বাজারে পাইকারি পর্যায়ে ভালো মানের কাঁচামরিচ প্রতি কেজি ৯০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তুলনামূলক কম মানের মরিচের দাম ৭০ থেকে ৮০ টাকা। গত সপ্তাহে একই মানের মরিচ কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হয়েছিল।
পাইকার মো. বিপুল বলেন, ছুটির কারণে কাঁচামরিচের দাম কিছুটা কমেছে। একই সঙ্গে সরবরাহও কিছুটা কমেছে। রাজধানীর অন্যতম বড় পাইকারি বাজার কারওয়ান বাজারে আলুর দামও কমেছে। বর্তমানে আড়ত থেকে খুচরা বিক্রেতারা প্রতি কেজি আলু কিনছেন ১৬ টাকায়। গত সপ্তাহে একই আলু কেজিতে ১-২ টাকা বেশি দামে বিক্রি হয়েছে।
পাইকারি বিক্রেতা আছির আলী জানান, সাধারণ কর্মদিবসে যেখানে প্রতিদিন ১০ বস্তা আলু বিক্রি হতো, ছুটির কারণে তা কমে পাঁচ বস্তায় নেমেছে। ছুটির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে লাউয়ের বাজারে। গতকাল বুধবার সকালে প্রতিটি লাউ ১০ টাকায় বিক্রি হলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাম কমে ৫ টাকায় নেমে আসে। ক্রেতা টানতে ৫ টাকায় লাউ বিক্রির জন্য হাঁকডাক করতে দেখা যায় পাইকার মো. মাকসুদকে। তার পরও কারওয়ান বাজারের মেঝেতে অনেক লাউ পড়ে থাকতে দেখা যায়।
মাকসুদ জানান, সাধারণ কর্মদিবসে প্রতিটি লাউ আকারভেদে ২০ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি হতো। কিন্তু ছুটির কারণে ক্রেতা কমে যাওয়ায় এখন অনেক কম দামে লাউ বিক্রি করতে হচ্ছে। কারওয়ান বাজার ক্ষুদ্র কাঁচামাল আড়ত ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. ওমর ফারুক বলেন, দীর্ঘ ছুটিতে বিপুলসংখ্যক মানুষ ঢাকা ছেড়ে যাওয়ায় বাজারে চাহিদা কমেছে। তবে সেই অনুপাতে ঢাকার বাইরে থেকে সবজির সরবরাহ কমেনি। ফলে ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে।
তিনি বলেন, কারওয়ান বাজারে প্রতিদিন শাক-সবজিবোঝাই চার শতাধিক ট্রাক আসে। এসব ট্রাকে প্রায় ৭ হাজার টন সবজি থাকে। এর বাইরে আরও প্রায় সাড়ে ৪ থেকে ৫ হাজার টন বিভিন্ন ধরনের মৌসুমি ও অমৌসুমি ফল আসে।
ওমর ফারুকের হিসাবে, সবজির সরবরাহ প্রায় ২০ শতাংশ কমলেও দীর্ঘ ছুটিতে চাহিদা কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ। ফলে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ৮৬০ টন সবজি অতিরিক্ত থেকে যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা এসব সবজি কম দামে বিক্রি করে দিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে বিক্রি না হওয়ায় নষ্টও হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, ছুটির কারণে ক্রেতার সংখ্যা ও চাহিদা স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পাইকারি বাজারে সবজির দাম ও বিক্রিতে এমন অস্থিরতা অব্যাহত থাকতে পারে।