আজকাল ওয়েবডেস্ক: সোমবার যখন রাহুল গান্ধী মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে সুপ্রিম কোর্টের দিকে মিছিল করে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন এই কংগ্রেস নেতা কেবল ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধেই লড়াইয়ে নামেননি। তাঁর পাশাপাশি মিছিলে পা মিলিয়েছিলেন 'অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন' (আইসা)-এর সভানেত্রী নেহা বোরা, যিনি 'ককরোচ জনতা পার্টি'-র জুলাই মাসের প্রতিবাদ আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ।
মিছিলের সময় নেহা বোরার উপস্থিতিকে বিশেষভাবে তুলে ধরার জন্য রাহুল গান্ধী কোনও কসুর করেননি। কখনও কখনও তিনি ২৯ বছর বয়সী নেহা এবং তাঁর বোন তথা ওয়েনাডের সাংসদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভঢরার কাঁধে হাত রেখে হাঁটছিলেন। যেখানে প্রবীণ কংগ্রেস নেতারাও রাহুল গান্ধীর পেছনে হাঁটছিলেন, সেখানে এই দু'জন তাঁর পাশাপাশিই হাঁটছিলেন।
নেহা বোরাকে কেই বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হল? রাহুল গান্ধী কি এমন একটি প্রতিবাদ আন্দোলনকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বৃহত্তর বিরোধী জোট গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন যা এতদিন তাঁর আন্দোলনের সমান্তরালেই চলছিল? আন্দোলনের বিষয়বস্তু ছিল একই, আর অনেকের মতে, 'ককরোচ'-দের উত্থান ভারতীয় জনতা পার্টির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের ক্ষেত্রে তাঁর নেতৃত্বের জন্য এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
তবে সোমবার নয়াদিল্লির রাজপথ হয়ে উঠেছিল এক রাজনৈতিক মঞ্চ, আর সেই মঞ্চের পরিচালক ছিলেন রাহুল গান্ধী।
সকালে, রাহুল গান্ধী এবং অন্যান্য বিরোধী নেতারা ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় চেয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল, সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম নিয়ে একটি স্মারকলিপি জমা দেওয়া। কিন্তু সেই বৈঠক না হওয়ায়, রাহুল গান্ধী সাংবাদিক সম্মেলন করেন এবং একটি পিটিশন বা আবেদন দাখিল করতে সুপ্রিম কোর্টের দিকে মিছিল করে এগিয়ে যান।
কংগ্রেস কর্মী, যুব কংগ্রেস সদস্য এবং 'ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া'-র সদস্যরা মধ্য দিল্লির একাংশে ভিড় জমিয়ে ছিলেন। কিন্তু গান্ধী ভাই-বোনের নেতৃত্বে আয়োজিত এই পরিচিত রাজনৈতিক সমাবেশের মাঝেও একজনের উপস্থিতি ছিল বিশেষভাবে নজরকাড়া। বামপন্থী ছাত্র সংগঠন আইসা-র সভানেত্রী নেহা বোরাকে মিছিলে রাহুল গান্ধীর পাশাপাশি এক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে দেখা গিয়েছিল।
পুরো দৃশ্যটি ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং চমকপ্রদ। গত কয়েক মাস ধরে যন্তর মন্তরে ককরোচ-দের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে নেহা বোরাকে সক্রিয়ভাবে দেখা গিয়েছে। কংগ্রেস নেতৃত্বের পাশে তাঁর উপস্থিতি এমন এক সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে যে, রাহুল গান্ধী সম্ভবত তরুণ-নেতৃত্বাধীন সেই আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখকে নিজের বলয়ে নিয়ে আসছেন। এইসব আন্দোলন বিরোধী পরিসরে কংগ্রেসেরই প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে।
কংগ্রেস ও সিজেপি-র মধ্যে কি নেহা বোরাই সেতুবন্ধন?
নেহা বোরার রাজনৈতিক গুরুত্বের কারণ হল, সিজেপি-র এই প্রতিবাদী আন্দোলনে তিনি কোনও নতুন মুখ নন। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) পিএইচডি গবেষক নেহা, ‘নিট-ইউজি’ পরীক্ষায় অনিয়ম এবং সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগের জেরে জুলাই মাসে সিজেপি-র নেতৃত্বে আয়োজিত বিক্ষোভের সময় একজন বিশিষ্ট আন্দোলনকারী হিসেবে উঠে আসেন। সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক এবং ‘আইসা'-র অন্যান্য কর্মীদের পাশাপাশি অনশন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ায় তাঁর পরিচিতি আরও বৃদ্ধি পায়।
২৫ জুলাই আয়োজিত এক সাংবাদিক বৈঠকে রাহুল গান্ধীর পাশে উপস্থিত তরুণ আন্দোলনকারীদের মধ্যেও নেহা ছিলেন। সেই সম্মেলনে কংগ্রেস নেতা ২০ জুলাইয়ের সংসদ অভিযান চলাকালীন বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের বাড়াবাড়ির বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন। অর্থাৎ, সোমবারের অভিযানের অনেক আগে থেকেই কংগ্রেস নেতৃত্বের সঙ্গে নেহা বোরার যোগাযোগ রয়েছে।
ককরোচ জনতা পার্টির নেতৃত্বের সঙ্গেও নেহা বোরা-র যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। জুনের শুরুর দিকের বিক্ষোভ থেকে শুরু করে ১০ অক্টোবরের পরিকল্পিত প্রতিবাদ কর্মসূচি- সবক্ষেত্রেই সিজেপি নেতা অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রাঙ্কার সঙ্গে একই রাজনৈতিক পরিসরে নেহা বোরাকে দেখা গিয়েছে। ১০ অক্টোবরের কর্মসূচিকে সামনে রেখে দাস ও রাঙ্কার সঙ্গে যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনেও তিনি অংশ নিয়েছিলেন।
এটিও উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ককরোচ-দের জুলাই মাসের আন্দোলনের সময় অনশন করা সত্ত্বেও, আন্দোলনের শেষ পর্যায় পর্যন্ত নেহা বোরাকে ককরোচ নেতারা কোনও উল্লেখযোগ্য মঞ্চে তুলে ধরেননি। তবে, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পরই তাঁর উত্থান শুরু হয়।
আইসা-র জাতীয় সভানেত্রী হিসেবে নেহা বোরা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত সফর করেন এবং বামপন্থী সংগঠনের তৃণমূল স্তরের কর্মীদের উজ্জীবিত করার চেষ্টা করেন। ককরোচ আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে এই জনসংযোগের ফলে সোশ্যাল মিডিয়ায় নেহা বোরা আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে বিজেপি-শাসিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তাঁর জ্বালাময়ী ভাষণগুলো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
এই ঘটনাপ্রবাহ বামপন্থী মতাদর্শের এই আন্দোলনকারীকে বিরোধী শিবিরের এমন এক পরিসরে এক ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে, যেখানে বর্তমানে প্রতিযোগী বিভিন্ন প্রতিবাদী গোষ্ঠী সক্রিয়। বাম-ঘনিষ্ঠ ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, তরুণ আন্দোলনকারীদের কাছে তিনি পরিচিত মুখ এবং কংগ্রেস নেতৃত্বের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ রয়েছে। এই সংযোগগুলো তাঁকে দুই শিবিরের মধ্যে সম্ভাব্য সেতুবন্ধনাকরী হিসেবে তুলে ধরছে। যদিও এর অর্থ এই নয় যে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের কৌশলগুলোর মধ্যে সমন্বয় করছেন।
রাহুল গান্ধীর জন্য এই সেতুবন্ধনটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত মূল্যবান হতে পারে। কংগ্রেস যদি ককরোচ-দের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত তরুণদের নিজেদের বিক্ষোভ কর্মসূচিতে শামিল করতে পারে, তবে তারা একদিকে যেমন নিজেদের আন্দোলনের পরিসর বাড়াতে পারবে, তেমনই যুব-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের ওপর কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিবাদী মঞ্চের একচ্ছত্র অধিকার দাবি করার বিষয়টিও কঠিন করে তুলতে পারবে।
তরুণ-নেতৃত্বাধীন এই প্রতিবাদ আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে, তা এখন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
এই লড়াইটি কেবল কারা বেশি লোক সমাগম করতে পারছে, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মূল বিষয় হল— কারা রাজনৈতিক বার্তাটি নির্ধারণ করবে, কাদের দিকে মানুষের দৃষ্টি থাকবে এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রধান মুখ হিসেবে কারা উঠে আসবে।
দীপকে, দাস ও রাঙ্কার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ককরোচ জনতা পার্টি রাজপথে ব্যাপক জনসমাগম এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় অনুসারী গোষ্ঠীর ওপর ভিত্তি করে নিজেদের পরিচিতি গড়ে তুলেছে। তাদের এই আন্দোলনে বামপন্থী ছাত্র সংগঠন ও কর্মীদের সমর্থনও রয়েছে। তবে আন্দোলনটি একটি প্রতিযোগিতামূলক রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। বিশেষ করে কংগ্রেস ও আম আদমি পার্টির (আপ) সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বেশ জটিল।
বিজেপি-নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি অভিন্ন বিরোধিতা থাকা সত্ত্বেও ককরোচ এবং রাহুল গান্ধী আলাদাভাবে প্রতিবাদ কর্মসূচি চালিয়ে গিয়েছেন। কোনও পক্ষই এই যৌথ বিরোধিতাকে ঐক্যবদ্ধ কোনও প্রতিবাদ মঞ্চের রূপ দিতে পারেনি। তাদের সমর্থকদের মধ্যে কখনও কখনও বাগযুদ্ধ বা তিক্ততা দেখা গিয়েছে। এমনকি 'আপ' নেতারা ককরোচ-দের এমন কিছু বিক্ষোভ কর্মসূচি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন, যা তাদের মতে অতিরিক্ত মাত্রায় রাহুল গান্ধী-কেন্দ্রিক হয়ে পড়েছিল।
মাত্র এক সপ্তাহ আগেই সোশ্যাল মিডিয়ায় সিজেপির শীর্ষ তিন নেতা এবং কংগ্রেস নেতাদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা হয়েছিল।
১০ অক্টোবর সিজেপি নেতাদের আটক এবং তাদের পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি ব্যাহত হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। সিজেপির পরবর্তী পদক্ষেপ যখন আরেকটি প্রতিবাদের অনুমতির অপেক্ষায় আটকে ছিল, ঠিক তখনই সোমবার কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন মিছিলটি রাহুল গান্ধীকে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী চ্যালেঞ্জের প্রধান মুখ হিসেবে তুলে ধরার এক বিশাল সুযোগ করে দেয়।
সংবাদিক বৈঠকে রাহুল গান্ধী জোর দিয়ে বলেন যে, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও মোদি সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদগুলো কোনও বিচ্ছিন্ন বা সমান্তরাল আন্দোলন নয়, বরং একটি বৃহত্তর সংগ্রামেরই অংশ। তাঁর বার্তার মূল সুর ছিল ঐক্য। তবে রাজনৈতিক দৃশ্যপটে এটি সেই সংগ্রামের নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর দাবিকেই আরও জোরালো করে তোলে।
আর এখানেই নেহা বোরার উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। ককরোচ-দের প্রতিবাদ-বলয়ের পরিচিত মুখ হয়েও কংগ্রেস নেতৃত্বের পাশে তাঁর উপস্থিতি রাহুল গান্ধীকে একটি বৃহত্তর জোটের ভাবমূর্তি তুলে ধরার সুযোগ করে দেয়। যার জন্য ককরোচ নেতৃত্বকে সরাসরি সেই কাঠামোর মধ্যে আনার প্রয়োজন পড়ে না।
কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন প্রতিবাদ কর্মসূচিগুলোতে 'আপ'-কে দেখা যায়নি। তবে তারা ককরোচ নেতৃত্বের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং প্রয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন জুগিয়েছে।
