আমার লেখার শিরোনাম দেখে হয়তো অনেকেই নাক সিটকাবেন। কেউ কেউ হয়তো প্রশ্নও তুলবেন। তবে আমি সব সময় আইনের যথাযথ প্রয়োগের পক্ষে। আইন সবার জন্য সমান সেটিও আমি শতভাগ বিশ্বাস করি। আমি এও মনে করি, ন্যায়সংগত ও দায়িত্বশীল আইন প্রয়োগের মাধ্যমে রাজধানীর সড়কে যানজট কমানো, শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা কিংবা অবৈধভাবে চলাচলকারী যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এসবের মধ্যেও একটি প্রশ্ন থেকেই যায়, আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে আমরা কি কখনও কখনও মানুষের অসহায়ত্ব, অসুস্থতা আর বেঁচে থাকার সংগ্রামটুকু বিবেচনায় নিচ্ছি? আমরা কি তাদের সঠিকভাবে মূল্যায়ন করছি?
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও দৃশ্য আমাকে এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। দৃশ্যটিতে দেখা যায়, একজন ট্রাফিক পুলিশ সদস্য অসুস্থ এক অটোরিকশাচালকের রিকশার তার কেটে দিচ্ছেন। আর সেই চালক দুই হাত জোড় করে আকুতি জানাচ্ছেন, ‘আমি অসুস্থ মানুষ। অটোরিকশাটি সরিয়ে নেওয়ার জন্য হলেও দয়া করে তার কাটবেন না।’ একপর্যায়ে অসহায় মানুষটিকে হাউমাউ করে কাঁদতেও দেখা যায়। একজন অসুস্থ মানুষ কোন অবস্থায় থাকলে প্রতিদিন রাস্তায় নামে? তার মতো মানুষের কাছে অটোরিকশাটি কেবল একটি যানবাহন নয়, এটি তার জীবিকা, তার বেঁচে থাকার অবলম্বন।
আমি ব্যক্তিগতভাবে যে অটোরিকশার পক্ষে এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। আমিও চাই সড়ক হোক পরিচ্ছন্ন। সড়কে যানজট কমুক, শৃঙ্খলা ফিরে আসুক বা অবৈধভাবে চলাচলকারী যানবাহন সড়ক থেকে উঠে যাক। আমি এই অটোরিকশার ঘোর বিরোধী একজন হয়েও দৃশ্যটি আমাকে অনেক পীড়া দিয়েছে। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই চালকটির পক্ষে কথা বলেছেন। কেউ তার অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেছেন, কেউ প্রশ্ন তুলেছেন পুলিশের দায়িত্ব পালনের ধরন নিয়ে। কিন্তু আমার প্রশ্নটি একটু ভিন্ন। একজন ট্রাফিক পুলিশ সদস্য অবশ্যই আইন মেনেই দায়িত্ব পালন করবেন। সড়কে শৃঙ্খলা রক্ষা করা তার দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের মুহূর্তে সামনে থাকা মানুষটির শারীরিক অবস্থা, অসহায়ত্ব এবং মানবিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া কি তার দায়িত্বের বাইরে? আইন প্রয়োগের অর্থ কি কেবল নিয়ম ভঙ্গকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া? নাকি সেই ব্যবস্থার মধ্যেও ন্যায়বিচার, বিবেচনাবোধ ও মানবিকতার প্রতিফলনও থাকা উচিত?
রাজধানী ঢাকাকে যানজটমুক্ত ও শৃঙ্খলাপূর্ণ করতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার প্রধান সড়কে চলাচল নিয়ন্ত্রণে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতাও চোখে পড়ার মতো। একইভাবে ফুটপাত দখলমুক্ত করা এবং পথচারীদের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনও বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। নিঃসন্দেহে এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। প্রধান সড়কে যানবাহনের শৃঙ্খলা বজায় রাখা, যানজট কমানো এবং পথচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি আধুনিক নগরীর জন্য অপরিহার্য। আইন অমান্য করে যেখানে-সেখানে যানবাহন চলাচল করলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পুরো নগরজীবনে। তাই আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব পালনের বিষয়টিকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।
তবে দায়িত্ব পালনের পদ্ধতি নিয়েও আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। কোনো যানবাহন নিয়মবহির্ভূতভাবে চলাচল করলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু সেই ব্যবস্থা নিতে গিয়ে একজন অসুস্থ, অসহায় মানুষের জীবিকার একমাত্র অবলম্বনটি মুহূর্তেই অচল করে দেওয়ার আগে কি বিকল্প কোনো ব্যবস্থা বিবেচনা করা সম্ভব ছিল না? অটোরিকশাটি প্রধান সড়ক থেকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া, চালককে নিরাপদ স্থানে যেতে বলা কিংবা প্রয়োজন হলে অন্য কোনোভাবে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া, এমন বিকল্পগুলো কি বিবেচনায় আসতে পারত না? ঘটনার পুরো প্রেক্ষাপট না জেনে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যের উদ্দেশ্য বা পরিস্থিতি সম্পর্কে চূড়ান্ত মন্তব্য করা ঠিক হবে না। তবে ভিডিওতে দৃশ্যমান অসহায়ত্ব আমাদের অন্তত এটুকু ভাবতে বাধ্য করে, দায়িত্ব পালনের সময় মানবিক বিবেচনার জায়গাটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
একজন পুলিশ সদস্য রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগ করেন। তার পোশাক, পদমর্যাদা ও দায়িত্বের সঙ্গে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব জড়িয়ে আছে। কিন্তু সেই কর্তৃত্বের সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ ঘটে তখনই, যখন তিনি ক্ষমতা প্রয়োগের পাশাপাশি সংযম, বিবেচনাবোধ ও মানবিকতার পরিচয় দেন। কঠোর হওয়া আর নিষ্ঠুর হওয়া এক বিষয় নয়। আইন মানাতে গিয়ে কাউকে অপমানিত করা কিংবা তার অসহায়ত্বকে উপেক্ষা করা কখনোই দায়িত্বশীলতার আদর্শ হতে পারে না। আমি চাই পুলিশ দায়িত্ব পালন করুক, আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিক এবং রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনুক। একই সঙ্গে আমি এটাও চাই, তাদের প্রতিটি পদক্ষেপে মানুষের প্রতি সম্মান ও সহমর্মিতা প্রতিফলিত হোক।
সবশেষে বলতে চাই, আমি আইন অমান্য করার পক্ষে নই। আমি অটোরিকশার অবাধ চলাচল কিংবা রাজধানীর সড়কে বিশৃঙ্খলাকেও সমর্থন করি না। আমি শুধু চাই, আইন প্রয়োগের সময় আমরা যেন মানুষের অসহায়ত্ব, অসুস্থতা বা সর্বোপরি মানবিকতা ভুলে না যাই।
মো. মাহমুদুল হাসান, সহকারী বার্তা সম্পাদক, এনটিভি অনলাইন
সংশ্লিষ্ট সংবাদ: অটোরিকশাচালক
২৭ আগস্ট ২০২৫
২১ এপ্রিল ২০২৫
১৯ মে ২০২৪
