রাজধানীর হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক এলাকা ও হকারমুক্ত ফুটপাতসহ ১৩টি স্থান সাড়ে চার ঘণ্টায় আকস্মিকভাবে পরিদর্শন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল ৯টা ১০ মিনিটে শুরু হওয়া এ পরিদর্শন চলে বেলা ১টা ৪১ মিনিট পর্যন্ত। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচ্ছন্নতা, সেবার মান ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণ করে একাধিক স্থানে অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। উত্তরার কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালের পরিবেশ ও পরিচ্ছন্নতা উন্নয়নে সাত দিন এবং আজিমপুর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কোয়ার্টার পরিষ্কার করে বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে দুই সপ্তাহের সময় বেঁধে দেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে এক চিকিৎসককে কক্ষে ধূমপান করতে দেখে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি। পরে ওই চিকিৎসককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর এ আকস্মিক পরিদর্শনে উঠে এসেছে রাজধানীর জনস্বাস্থ্য, হাসপাতালের কর্মপরিবেশ, আবাসিক এলাকার পরিচ্ছন্নতা, নাগরিক দায়িত্ব এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পরিদর্শনকালে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, চিকিৎসক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেন এবং বিভিন্ন সমস্যার বিষয়ে খোঁজখবর নেন।
হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শন: শনিবার সকালে প্রথমে উত্তরার কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে চিকিৎসাধীন রোগীদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের চিকিৎসাসেবার খোঁজ নেন। হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র, অস্ত্রোপচারকক্ষসহ বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখেন। হাসপাতালের পরিবেশ, পরিচ্ছন্নতা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করে সাত দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় উন্নয়ন নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন।
এরপর তিনি রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ ও মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ পরিদর্শন করেন। পরে মিরপুরের ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ, পাইকপাড়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কোয়ার্টার এবং সরকারি বাঙলা কলেজ ঘুরে দেখেন।
সেখান থেকে আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। পরে নিজের সাবেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজে যান। সেখানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং দেশ পরিচ্ছন্ন রাখা ও বেশি বেশি গাছ লাগানোর আহ্বান জানান।
এরপর ধানমন্ডি সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়, কলাবাগান স্টাফ কোয়ার্টার ও আজিমপুর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কোয়ার্টার পরিদর্শন করেন তিনি। সবশেষে মিরপুর ১০ নম্বরে হকারমুক্ত ফুটপাত ঘুরে দেখেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন উপস্থিত ছিলেন।
আজিমপুরের পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ, সময় দুই সপ্তাহ: আজিমপুর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কোয়ার্টারের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। আবাসিক এলাকাটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।
এ সময় কোয়ার্টারের বাসিন্দারা এলাকার অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরেন। আবাসিক এলাকার পরিবেশ উন্নয়ন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানান তাঁরা। প্রধানমন্ত্রী তাঁদের কথা শোনেন এবং সমস্যাগুলো সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেন।
এ সময় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম উপস্থিত ছিলেন।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে তরুণদের এগিয়ে আসার আহ্বান: ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সরকারের উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও তরুণ প্রজন্মকে নিজেদের বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিদর্শনকালে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর ও স্কাউট সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বছরের এ সময়ে, বিশেষ করে নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যায়। প্রতিবছর এ রোগে বহু মানুষ আক্রান্ত হন, অনেকের মৃত্যুও হয়। ডেঙ্গু মোকাবিলায় সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে প্রতিরোধ। আর এ জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গুর সঙ্গে লড়াই করতে হলে সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে প্রতিরোধ। আর এ জন্য আমাদের চারপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। এই কাজে আমি তোমাদের সাহায্য চাই।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ যদি নিজেদের আশপাশ পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব নেয়, তাহলে ডেঙ্গু প্রতিরোধসহ পরিবেশ রক্ষায় বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।
ঢাকার পরিচ্ছন্নতা পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, রাজধানীতে দুই থেকে আড়াই কোটির বেশি মানুষের বসবাস। সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা নিয়মিত কাজ করলেও তাঁদের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই শুধু সিটি করপোরেশন বা প্রশাসনের ওপর নির্ভর করলে চলবে না; নাগরিকদেরও দায়িত্ব নিতে হবে।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তোমরা স্কাউট, গার্ল গাইড কিংবা রেড ক্রিসেন্টের সদস্য হও বা না হও, তোমরা সবাই এ দেশের নাগরিক। তোমরাই দেশের ভবিষ্যৎ। তাই নিজের বাসা, স্কুল, পাড়া ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব তোমাদেরও নিতে হবে।’
যত্রতত্র ময়লা ফেলার প্রবণতা বন্ধে সামাজিক সচেতনতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। কেউ নির্ধারিত স্থানের বাইরে ময়লা ফেললে তাকে সচেতন করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, সবাই মিলে চেষ্টা করলে ঢাকা শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব।
ডাস্টবিন ও গাছের চারা চুরি নিয়ে উদ্বেগ: রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ময়লা ফেলার জন্য ডাস্টবিন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তবে অনেক জায়গা থেকে এসব ডাস্টবিন চুরি হয়ে যাচ্ছে বলে আক্ষেপ করেন তিনি। একইভাবে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে বিভিন্ন স্থানে লাগানো গাছের চারাও চুরি হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন। এসব কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে নাগরিকদের আরো সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
পরিবেশ রক্ষায় শিক্ষার্থীদের প্রতিবছর নিজেদের ও পরিবারের সদস্যদের জন্মদিনে অন্তত একটি করে গাছ লাগানোর পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘তোমার জন্মদিনে, ভাইবোনের জন্মদিনে কিংবা নানা-নানির জন্মদিনে একটি করে গাছ লাগানোর চেষ্টা করবে। সেটা তোমার বাসায় হতে পারে, স্কুলে হতে পারে কিংবা গ্রামের বাড়িতে হতে পারে। গাছগুলো যখন বড় হবে, তোমরাও তখন বড় হবে।’
রাজধানীতে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা ও সবুজের ঘাটতি নিয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। নিজের শৈশবের স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, একসময় ঢাকায় অনেক বেশি গাছপালা ও খোলা জায়গা ছিল। এখন সেখানে বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে। গাছপালা কমে যাওয়ায় শহরে গরমের অনুভূতিও বেড়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গাছ যত বাড়বে, আমরা তত বুক ভরে শ্বাস নিতে পারব। গাছের পাতার ঝিরঝির শব্দ আমার খুব ভালো লাগে। আমরা সবাই মিলে গাছ লাগালে শহরের তাপমাত্রাও কিছুটা কমিয়ে আনা সম্ভব।’
ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি আরো বলেন, ‘তোমরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তোমাদের কাছে আমার দুটি আবেদন-দেশকে পরিষ্কার রাখবে এবং বেশি বেশি গাছ লাগাবে। এটা তোমাদেরই দেশ, এর দায়িত্বও তোমাদের।’
হাসপাতালে ধূমপান, চিকিৎসক সাময়িক বরখাস্ত: প্রধানমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শনে আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে এক চিকিৎসকের কক্ষে ধূমপানের ঘটনা সামনে আসে। শনিবার দুপুরে হাসপাতালটির বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখার সময় সহযোগী অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের কক্ষে প্রবেশ করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে চিকিৎসককে ধূমপান করতে দেখেন তিনি। একই সঙ্গে কক্ষটির অপরিচ্ছন্ন পরিবেশও তাঁর নজরে আসে।
হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে একজন চিকিৎসকের এমন আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালের পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এ কে এম আজিজুল হককে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। পরে চিকিৎসক রফিকুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ বজায় রাখা, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী।
নাগরিক সেবায় দায়িত্বশীলতার ওপর গুরুত্ব: সাড়ে চার ঘণ্টার পরিদর্শনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে নাগরিক সেবা, পরিচ্ছন্নতা, জনস্বাস্থ্য এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনার বিষয়ে খোঁজ নেন প্রধানমন্ত্রী। হাসপাতাল ও আবাসিক এলাকার পরিবেশ উন্নয়নে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও সবুজায়নে নাগরিকদের সম্পৃক্ত করার ওপর জোর দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর এ পরিদর্শনে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে পরিচ্ছন্নতা ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি, জনস্বাস্থ্য রক্ষায় সচেতনতার প্রয়োজন এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বশীলতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সমস্যাগুলো সমাধানে কী পদক্ষেপ নেয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।
সানা/আপ্র/১৭/১০/২০২৬
