এলপি গ্যাসের চরম সংকটের মধ্যে সরকারের সাথে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ীদের টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বিইআরসি ঘোষিত দামে তারা এলপিজি পাচ্ছেনা। বেশি দাম আদায় করা হচ্ছে। দাম বেশি দিয়ে কিনে কিভাবে কমদামে বিক্রি করবে সে প্রশ্ন তোলেন তারা।
এলপি গ্যাসের চরম সংকটের মধ্যে সরকারের সাথে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ীদের টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বিইআরসি ঘোষিত দামে তারা এলপিজি পাচ্ছেনা। বেশি দাম আদায় করা হচ্ছে। দাম বেশি দিয়ে কিনে কিভাবে কমদামে বিক্রি করবে সে প্রশ্ন তোলেন তারা। কোম্পানিগুলো থেকে এলপিজির সিলিন্ডারের অর্ডার দিলে চাহিদা মতো সরবরাহ পায়না বলে অভিযোগে তাদের।
এরই মধ্যে গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার ২দিন ধর্মঘটের ডাক দেয় এলপি গ্যাস ব্যবসায়ীরা। তবে শেষ পর্যস্ত সরকারের চাপের মুখে গত বুধবার ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়। একই সাথে আগামী ২৯ অক্টোবর সবপক্ষকে নিয়ে বিইআরসির সাথে বৈঠক করে দাবি বিবেচনার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
এদিকে এলপিজি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি ধর্মঘট ডেকে পরে প্রত্যাহার করা নিয়েছে। সংগঠনটির সাংগঠনিক সম্পাদক আবু তাহের কোরেশী জানিয়েছেন, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যানের সঙ্গে বুধবার বৈঠক হয়েছে। আগামী ২৯ অক্টোবর সবপক্ষকে নিয়ে বৈঠক করে দাবি বিবেচনার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। আমাদেরকে বলা হয়েছে, নভেম্বর মাসের দাম ঘোষণার সময় দাবিগুলো সমন্বয় করা হবে।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, আগামী ২৯ অক্টোবর এলপিজির উপর গণশুনানি গ্রহণ করা হবে। সেখানে সকলপক্ষের মতামতের ভিত্তিতে পরবর্তী আদেশ দেওয়া হবে।
আবু তাহের কোরেশী বলেন, ইতোমধ্যে ভোক্তা অধিদপ্তর ও অন্যান্য মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে যেসব মামলা হয়েছে সেগুলো রিভিউ করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা বিইআরসি ঘোষিত দামে এলপিজি পাচ্ছি না। আমাদের কাছ থেকে বেশি দাম আদায় করা হচ্ছে। দাম বেশি নিলে আমরা কমদামে বিক্রি করবো কিভাবে।
অন্যদিকে গত বুধবার এলপিজি আমদানিকারকদের সঙ্গে বৈঠক শেষে ধর্মঘটের বিষয়ে হুশিয়ারি দেন বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি বলেছেন, এই মুহুর্তে কেউ যদি এলপিজি নিয়ে ধর্মঘট করার চেষ্টা করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেপ্টেম্বর মাসের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে এলপি গ্যাস সংকটের সূত্রপাত। রাষ্ট্রীয় একটি গোয়েন্দা বাহিনীর রিপোর্টে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজার ঊর্ধমূখী (টনপ্রতি ৬৪ ডলার) দেখে ৫টি কোম্পানি ২২ সেপ্টেম্বর থেকে বিক্রি প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে।
নতুন দামে বিক্রি করার জন্য হাজার হাজার টন এলপিজি ধরে রেখেছে। ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, আগস্টে আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৫৮ হাজার টন, আর সেপ্টেম্বর মাসে এসেছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টন। সে কারণে বাজারে ঘাটতি হওয়ার কোন সুযোগ নেই। অক্টোবর মাসে দাম বাড়িয়ে দিলেও সেই দামেও মিলছে না এলপিজি।
পরিবেশক, খুচরা বিক্রেতা এমনকি গোয়েন্দা তথ্যেও এলপিজি অবৈধ মজুদের বিষয়টি সামনে এলেও কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। এমনকি জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার ঘোষণা দিলেও সুফল দৃশ্যমান নয়। অভিযোগের তীর যাদের দিকে সেই আমদানিকারকদের বিষয়ে কোন পদক্ষেপ দেখা যায়নি। কিছু খুচরা বিক্রেতার বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল করা হয়।
এদিকে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম (এলপি) গ্যাসের বাজার অস্থিতিশীল করার চেষ্টা হলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। গত বুধবার সচিবালয়ে এলপিজি অপারেটরদের সঙ্গে বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, এলপিজির সরবরাহ ও বাজার স্থিতিশীল রাখতে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করছে সরকার। তবে দাবি আদায়ে ধর্মঘটের মাধ্যমে বাজারে অস্থিরতা তৈরি করা হলে তা বরদাশত করা হবে না।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এলপিজি আমদানি করে। সরকার সরাসরি এলপিজি আমদানি করে না। তবে বিইআরসি আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে। ব্যবসায়ীদের লাভ লোকসান, কমিশনসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক বিরোধ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যবসায়ীদের কথা শুনতে ও যৌক্তিক সমস্যার সমাধান করতে প্রস্তুত। তবে কেউ নিজের স্বার্থে বাজারব্যবস্থার অপব্যবহার করলে বা জনস্বার্থবিরোধী পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করলে সরকার তা মেনে নেবে না।
জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, পণ্য সরবরাহে বিঘ্ন ঘটিয়ে বারবার দাম বাড়ানোর চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। ব্যবসায়ীদের আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে হবে । তিনি বলেন, জ্বালানি খাতে বৈশ্বিক সংকটের কারণে এলপিজি আমদানি ও সরবরাহে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা ও আমদানির উৎস নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেও ভোক্তাদের জন্য সহনীয় দামে এলপিজি সরবরাহের চেষ্টা করছে সরকার।
জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি খাতে অস্থিরতা চলছে। বাংলাদেশের বেসরকারি আমদানিকারকদেরও বিকল্প উৎস খুঁজতে হচ্ছে। দীর্ঘ মেয়াদে সরবরাহে ঘাটতি এড়ানো ও আগামী বছর পর্যাপ্ত এলপিজি সরবরাহ নিশ্চিত করার কৌশল নিয়ে অপারেটরদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
সরবরাহ ও দাম স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে (বিইআরসি) প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ব্যবসায়ীদের সমস্যাগুলো সমাধানের বিষয়েও আলোচনা চলছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আবারও আলোচনা হবে।
বাজারে ডিলার পর্যায়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি ঠেকাতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনকে সক্রিয় করা হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
প্রতিবেশী দেশ ভারতের তুলনায় বাংলাদেশে এলপিজির দাম বেশি হওয়ার বিষয়ে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, ভারতে সরকার ভর্তুকি দিয়ে এলপিজির দাম কম রাখে। নির্দিষ্ট কর্মসূচির আওতায় সুবিধাভোগী ব্যক্তিরা সেখানে এলপিজি পান। বাংলাদেশে এ ধরনের ভর্তুকি নেই। বেসরকারি আমদানিকারকেরা এলপিজি আমদানি করে উন্মুক্ত বাজারে বিক্রি করেন। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের প্রভাব দেশের বাজারেও পড়ে।
সংকট তীব্র হচ্ছে :
দেশের বাজারে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সংকট তীব্র হচ্ছে। দোকানে দোকানে খুঁজেও মিলছে না সিলিন্ডার। কোথাও পাওয়া গেলেও বিক্রি হচ্ছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি দামে। ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে কক্সবাজারে ২ হাজার ২০০ টাকা, নরসিংদীতে ২ হাজার ৫০০ টাকা এবং কিশোরগঞ্জে ২ হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে ক্রেতাদের।
গত ৪ অক্টোবর বিইআরসি ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে। তবে নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার না পাওয়ার অভিযোগ করছেন ক্রেতারা। কোথাও কোথাও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৬৬৩ টাকা পর্যন্ত বেশি দিতে হচ্ছে তাঁদের।
রাজধানীর শনি আখড়া এলাকার বাসিন্দা তিতুমির বলেন, দুই মাস আগে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনেছিলেন ১ হাজার ৭০০ টাকায়। বুধবার গ্যাস শেষ হলে নতুন সিলিন্ডার কিনতে গিয়ে তাঁকে দিতে হয়েছে ২ হাজার ২০০ টাকা। অর্থাৎ দুই মাসের ব্যবধানে একই পরিমাণ গ্যাস কিনতে তাঁর খরচ বেড়েছে ৫০০ টাকা। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। এ ছাড়া ৫ দশমিক ৫ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, ২৫ কেজির সিলিন্ডার ৪ হাজার ১০০ থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকা এবং ৪৫ কেজির সিলিন্ডার ৭ হাজার থেকে ৭ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
সেগুন বাগিচা এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, আগে ১২ কেজির সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা থাকলেও তাঁকে কিনতে হতো ১ হাজার ৬৫০ টাকায়। এখন দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হলেও বিক্রেতারা চাইছেন ২ হাজার ১০০ টাকা।
এলপিজি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কোম্পানিগুলো সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে। এলপিজি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির দাবি, গত ২০ সেপ্টেম্বরের পর আমদানিকারকরা সরবরাহ প্রায় ৮০ শতাংশ কমিয়েছেন। ২৫ সেপ্টেম্বরের পর কয়েকটি ডিপো থেকেও সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
এলপি গ্যাসের সংগঠনের সভাপতি মো. সেলিম খান জানান, পরিবেশকদের কমিশন সিলিন্ডারপ্রতি ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা অথবা বিক্রয়মূল্যের ৭ শতাংশ করতে হবে। এছাড়া চালানে প্রকৃত মূল্য উল্লেখ, পরিবহন ভাড়া প্রদান ও অযৌক্তিক জরিমানা বন্ধসহ আরও ছয়টি দাবি রয়েছে তাঁদের।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, জাহাজভাড়া বৃদ্ধি, আমদানি অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা এবং পরিবহনসংক্রান্ত জটিলতা সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি করছে। একই সঙ্গে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় রান্নার কাজে এলপিজির ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান সরবরাহ সংকটের মধ্যে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারের বিক্রি বন্ধের কর্মসূচি কার্যকর হলে সাধারণ ভোক্তাদের ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আমদানি ও সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি খুচরা বাজারে নজরদারি বাড়ানো এবং নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার বিক্রি নিশ্চিত করা জরুরি।
