শয়তান মুমিনের জীবনে এমন এক শত্রু, যে প্রকাশ্যে শত্রুতা করে না; বরং বন্ধুর বেশে কাছে আসে। সে সরাসরি পাপের দিকে ডাকলে মানুষ হয়তো সতর্ক হয়ে যেত। তাই সে কখনো পাপকে আকর্ষণীয় করে তোলে, কখনো অন্যায়কে যুক্তিসংগত বলে মনে করায়, কখনো নেক আমলে অলসতা সৃষ্টি করে, আবার কখনো মানুষের অন্তরে হতাশা, অহংকার, হিংসা ও সন্দেহের বীজ বপন করে।
তার লক্ষ্য হলো ধীরে ধীরে মানুষকে আল্লাহর স্মরণ, আনুগত্য ও সরল পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া। তাইতো পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্রু; সুতরাং তোমরা তাকে শত্রু হিসেবেই গ্রহণ করো।’ -সূরা ফাতির: ৬
শয়তানের শত্রুতার সূচনা হয়েছিল হজরত আদম (আ.)-কে সিজদা করার নির্দেশ অমান্য করার মধ্য দিয়ে। আল্লাহতায়ালা হজরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করে ফেরেশতাদের সিজদা করার নির্দেশ দিলে ইবলিস অহংকারবশত তা প্রত্যাখ্যান করে। সে নিজেকে আদমের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করেছিল। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন আর তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে।’ -সূরা আরাফ: ১২
ইবলিসের এ বক্তব্য ছিল অহংকারের প্রকাশ। সে আল্লাহর নির্দেশের সামনে আত্মসমর্পণ না করে নিজের যুক্তিকে প্রাধান্য দিয়েছিল। এর পরিণতিতে সে আল্লাহর রহমত থেকে বিতাড়িত হয়। কিন্তু নিজের অপরাধ স্বীকার করে তওবা করার পরিবর্তে সে মানুষকে পথভ্রষ্ট করার সংকল্প করে। পবিত্র কোরআনে তার সেই সংকল্পের কথা এসেছে, ‘সে বলল, আপনি যেহেতু আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, তাই আমিও অবশ্যই আপনার সরল পথে তাদের জন্য ওত পেতে বসে থাকব।’ -সূরা আরাফ: ১৬
তাই শয়তানের শত্রুতা কোনো সাময়িক বিরোধ নয়; বরং মানুষের দুনিয়া ও আখেরাতের ক্ষতি সাধনের একটি অব্যাহত প্রচেষ্টা।
শয়তান সাধারণত মানুষকে একবারেই বড় পাপে নিমজ্জিত করে না। বরং ধাপে ধাপে তাকে দুর্বল করে। প্রথমে পাপের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করে, এরপর পাপকে তুচ্ছ মনে করায়, তারপর সেই পাপে অভ্যস্ত করে তোলে। একসময় মানুষ অন্যায়কে অন্যায় হিসেবে অনুভব করার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলতে পারে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘সে তাদের প্রতিশ্রুতি দেয় এবং তাদের আশার জাল বোনে। আর শয়তান তাদের যে প্রতিশ্রুতি দেয়, তা প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়।’ -সূরা নিসা: ১২০
শয়তানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হলো ‘ওয়াসওয়াসা’ অর্থাৎ অন্তরে কুমন্ত্রণা সৃষ্টি করা। কখনো তা সন্দেহের রূপ নেয়, কখনো অমূলক ভয়, কখনো ঈমান সম্পর্কে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশ্ন, আবার কখনো অন্যের প্রতি বিদ্বেষ ও কুধারণা হিসেবে প্রকাশ পায়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘কুমন্ত্রণাদাতা আত্মগোপনকারীর অনিষ্ট থেকে; যে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়।’ -সূরা নাস: ৪–৫
এ বিষয়ে সাহবি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) জানিয়েছেন, শয়তান মানুষের কাছে এসে একের পর এক প্রশ্ন উত্থাপন করে- এটি কে সৃষ্টি করেছে, সেটি কে সৃষ্টি করেছে? একপর্যায়ে সে প্রশ্ন করে, তোমার রবকে কে সৃষ্টি করেছেন? এমন কুমন্ত্রণা দেখা দিলে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে এবং সেই চিন্তা থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন। -সহিহ মুসলিম: ১৩৪
মনে রাখতে হবে, মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট করা শয়তানের অন্যতম উদ্দেশ্য। পরিবারে অশান্তি, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ, ভাইয়ে-ভাইয়ে মনোমালিন্য, বন্ধুদের মধ্যে বিদ্বেষ কিংবা সমাজে বিভেদ- এসব পরিস্থিতিতে শয়তান মানুষের রাগ, অহংকার ও ভুল বোঝাবুঝিকে কাজে লাগাতে পারে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘শয়তান তো চায় তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে।’ -সূরা মায়িদা: ৯১
অবশ্য প্রতিটি মতবিরোধই শয়তানের সরাসরি প্রভাবের প্রমাণ নয়। ভুল বোঝাবুঝি, বাস্তব সমস্যা ও মানুষের নিজস্ব সিদ্ধান্ত থেকেও বিরোধ হতে পারে। কিন্তু এসব পরিস্থিতিতে সুন্দর আচরণ বজায় রাখা শয়তানের উসকানি প্রতিহত করার গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
আল্লাহতায়ালা আমাদের শয়তানের প্রকাশ্য ও গোপন ষড়যন্ত্র থেকে হেফাজত করুন, ঈমানের ওপর অবিচল রাখুন এবং দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতা দান করুন। আমিন।
