# নিহতদের মধ্যে ৯ জনের পরিচয় শনাক্ত
# টুপটুপ রিসোর্টের ম্যানেজার সুমন গ্রেপ্তার
# পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন
# ট্যুরিজম বোর্ডকে পর্যটনমন্ত্রীর ৩ নির্দেশনা
# টুপটুপ রিসোর্ট ছিল অনুমোদনহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ: ফায়ার সার্ভিস
# জবি উপাচার্য ও জামায়াতের শোক
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানী মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাটুয়ারটেক এলাকায় অবস্থিত ‘টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্তোরাঁয়’ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। অগ্নিকাণ্ডে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) দুই শিক্ষার্থীসহ একই পরিবারের ছয়জনসহ অন্তত দশজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন নয়জন। এ ছাড়া কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে। অগ্নিকাণ্ডের পর রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের লোকজন ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে পরে টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকে গ্রেপ্তার করেছে উখিয়া পুলিশ।
এদিকে, অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান জানান, কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
শনিবার সকাল ৮টার দিকে মেরিন ড্রাইভের পাটোয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকার রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। আগুনে রিসোর্টটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন।
নিহত ১০ জনের মধ্যে ৯ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। একই পরিবারের নিহতরা হলেন—ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), জবি শিক্ষার্থী লায়লা জাহান নাবিলা (২৭), ঢাবি শিক্ষার্থী নাফিস তেহামী, ফারিহা কবির (৩৩) ও ফাইয়াজ আহম্মেদ (৫)। এ ঘটনায় আহত ছয়জন হলেন—মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তার স্ত্রী নাফিসা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দগ্ধ ছয়জন কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। হতাহতরা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আবদুল আহাদ সরকারের আত্মীয়।
নিহত নাফিস তেহামী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগের ৫ম ব্যাচের শিক্ষার্থী এবং লায়লা জাহান নাবিলা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী।
সায়ানুল মান্নানের বাবা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান বলেন, ‘আমার ছেলে এবং বৌমা সুস্থ আছে। কক্সবাজারে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে তারা দুপুরের পর বিমানে করে ঢাকার মিরপুরের পীরেরবাগ বাসায় এসেছে। ঢাকার বিমানবন্দরে নেমে অন্যের মোবাইল ফোন দিয়ে ঢাকায় পৌঁছার খবর দিয়েছে।’
আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা সবুক্তগীন মাহমুদ সোহেল বলেন, ‘আহতদের মধ্যে পাঁচজন দগ্ধ, তাদের শরীরের প্রায় ৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। দগ্ধ পাঁচজনকেই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।’
স্থানীয় লোকজন জানান, সকাল সাড়ে সাতটার দিকে মেরিন ড্রাইভ সড়কসংলগ্ন রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পরে স্থানীয় বাসিন্দারা পুলিশের সহায়তায় আগুন নিয়ন্ত্রণ ও উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার জানান, রিসোর্টটিতে আহাদের পরিবারের নয়জন সদস্য ছিলেন। তাদের মধ্যে ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি তিনজন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার শনিবার বেলা ১১টার দিকে জানান, রিসোর্টটিতে ২৭ জনের প্রবেশের তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে নয়জন রিসোর্টের বাইরে ছিলেন। উদ্ধার অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত হতাহতের বিষয়ে বিস্তারিত জানানো সম্ভব নয়।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা মোরশেদ দুপুরে সাংবাদিকদের বলেন, ঘটনাস্থল থেকে ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আহত ছয়জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, হতাহত ব্যক্তিরা সবাই পর্যটক। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, রিসোর্টের রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। তবে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ জানতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এদিকে শিক্ষার্থীদের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। এক বার্তায় ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, এ ধরনের মৃত্যু অত্যন্ত দুঃখের ও বেদনার। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার শোকাহত।
এক শোকবার্তায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন ও ট্রেজারার অধ্যাপক ড. সাবিনা শরমীন শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেন।
ট্যুরিজম বোর্ডকে পর্যটনমন্ত্রীর ৩ নির্দেশনা: ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডকে জরুরি তিন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এই নির্দেশনা দেন। একইসঙ্গে প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন তিনি। গতকাল শনিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এমনটি জানানো হয়। জরুরি ৩ নির্দেশনাগুলো হলো- অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নিরূপণ এবং পর্যটকদের সহায়তায় একটি প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থলে পাঠানো।
স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং পর্যটন খাতের অংশীজনদের সাথে সমন্বয় করে ভবিষ্যতে পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে জরুরী সভার আয়োজন করা। সভায় সুপারিশকৃত কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়ন করা। ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে পর্যটন কেন্দ্রসমূহের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহায়তায় অগ্নি নিরাপত্তা জোরদারকরণ এবং জরুরি উদ্ধারবিষয়ক বিশেষ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম গ্রহণ করার উদ্যোগ নেওয়া।
মন্ত্রী এই দুর্ঘটনায় শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান এবং অগ্নিকাণ্ডে আহত ব্যক্তিদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন। একই সাথে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।
মন্ত্রী বলেন, ‘এ ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পাশে দাঁড়ানো এবং উদ্ধার কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা জরুরি।’
রিসোর্টের ম্যানেজার সুমন গ্রেপ্তার: ইনানীতে টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকে গ্রেপ্তার করেছে উখিয়া পুলিশ। গতকাল সন্ধ্যা ৬টার দিকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, সন্ধ্যা ৬টার দিকে সুমনকে গ্রেপ্তার করে থানায় আনা হয়েছে, এ ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, অগ্নিকান্ডে প্রাণ হারানো ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং ৬ জন চিকিৎসাধীন। ফায়ারসার্ভিসের দুটি ইউনিটের তৎপরতায় উদ্ধার কার্যক্রম চালানো হয়, মরদেহ কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে নেওয়া হয়েছে।
অনুমোদনহীন টুপটুপ রিসোর্ট, অগ্নিনিরাপত্তার নোটিশ অগ্রাহ্য: কক্সবাজারের ইনানী সৈকতে অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যাওয়া টুপটুপ রিসোর্টটি সরকারি কোনো সংস্থার অনুমোদন ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছিল। কাঠ ও হার্ডবোর্ড দিয়ে তৈরি রিসোর্টটিতে ছিল না প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা। এ বিষয়ে গত জুনে ফায়ার সার্ভিসের দেওয়া নোটিশও উপেক্ষা করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
গতকাল রাজধানীর ফুলবাড়িয়ায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদর দপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান সংস্থাটির মহাপরিচালক সুলতানুল আরেফিন জুনায়েদ।
তিনি বলেন, রিসোর্টটির নিচতলায় একটি রেস্তোরাঁ ছিল। সেখানে রান্নার সময় আগুনের সূত্রপাত হয়। অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য গত জুনে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। তবে সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করেই রিসোর্টটির কার্যক্রম চালানো হচ্ছিল।
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক জানান, ফায়ার সার্ভিস স্টেশন থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে রিসোর্টটির অবস্থান হওয়ায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হয় দমকলকর্মীদের।
তিনি আরও বলেন, ইনানী এলাকার অধিকাংশ ইকো রিসোর্টেও প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা নেই। ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে পর্যটন করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পাশাপাশি ইনানী সৈকত এলাকায় একটি ফায়ার স্টেশন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অগ্নিকাণ্ডে নিহতের ঘটনায় জামায়াতের শোক: ইনানীতে টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার। একই সঙ্গে নিখোঁজ ব্যক্তিদের দ্রুত উদ্ধার এবং আহতদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
গতকাল দুপুরে দেওয়া এক বিবৃতিতে এসব কথা বলেন গোলাম পরওয়ার। রিসোর্টটিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানি, আহত এবং কয়েকজন নিখোঁজ থাকার ঘটনাকে মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বিবৃতিতে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ‘কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী সাতজনের মৃত্যু(মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১০) ও আরও বেশ কয়েকজনের নিখোঁজ থাকার ঘটনা অত্যন্ত মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক। আমি এ ঘটনায় গভীরভাবে উদ্বিগ্ন, ব্যথিত ও শোকাহত।’
পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজারে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে রিসোর্টগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি বলেন ‘পর্যটন নগরী কক্সবাজারের উখিয়ার এ ঘটনায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের দ্রুত উদ্ধার এবং আহতদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। আমি মহান আল্লাহর কাছে নিহত ব্যক্তিদের রুহের মাগফিরাত ও আহতদের সুস্থতা কামনা করছি। পাশাপাশি হতাহত ব্যক্তিদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি।’
বাংলাদেশের খবর/এইচআর