শৈবাল রহমান : বাংলাদেশের রাজনীতিতে দলীয় পরিচয় ও ক্ষমতার প্রভাবের কারণে জবাবদিহির প্রশ্নটি বহুবার আলোচনায় এসেছে। ক্ষমতাসীন দলের কোনো নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়। এমন প্রেক্ষাপটে নিজের দলের সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনাকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে একটি তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এক মাসেরও কম সময়ের ব্যবধানে বিএনপির দুই গুরুত্বপূর্ণ নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা দলীয় শৃঙ্খলার গণ্ডি ছাড়িয়ে রাজনৈতিক জবাবদিহির আলোচনাও সামনে এনেছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বহুল আলোচিত নীতি—‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ’—এর আলোকে এসব সিদ্ধান্তের তাৎপর্য মূল্যায়ন করা যেতে পারে। তবে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় তার ধারাবাহিক বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে।
বিএনপির তরুণ নেতা ইশরাক হোসেন দলের রাজনীতিতে পরিচিত মুখ। প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার সন্তান হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক পরিচিতি রয়েছে। পাশাপাশি আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যেও তাঁর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা, পারিবারিক পরিচয় কিংবা দলের প্রতি অবদান কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে পারে না। রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রেই একই নীতি প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
এর আগে সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির বিরুদ্ধে ঢাকার মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনার পর দলীয় প্রধানের নির্দেশে ১ অক্টোবর তিনি সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর সোমবার ইশরাক হোসেনকে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ঘটনা রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করে।
ইশরাক হোসেনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও দায়িত্বের কারণে। তবে এ ঘটনাকে শুধু একজন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব হারানোর বিষয় হিসেবে দেখলে এর বৃহত্তর তাৎপর্য অনুধাবন করা কঠিন। মূল প্রশ্ন হলো, জনপ্রতিনিধি ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা কীভাবে তাঁদের ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন এবং সেই প্রয়োগের সীমা কীভাবে আইন দ্বারা নির্ধারিত হবে।
মাদক বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুতর সামাজিক সমস্যা। এর বিস্তার তরুণ প্রজন্ম, পরিবার ও সমাজের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। মাদক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এ বাস্তবতায় মাদকবিরোধী তৎপরতার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু অপরাধ দমনের উদ্দেশ্য ইতিবাচক হলেই তা বাস্তবায়নের সব পদ্ধতি আইনসম্মত হয়ে যায় না।
রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে ইশরাক হোসেনের অংশ নেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। গত শনিবার বিকেলে গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ গুমটিঘর রেলগেট এলাকায় ধারণ করা ওই ভিডিওতে তাঁকে কয়েকজনকে ধরার নির্দেশ দিতে দেখা যায়। ভিডিওতে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে একজনকে গুলি করার হুমকি দেওয়ার শব্দও শোনা যায়। তাঁর সঙ্গে থাকা এক দেহরক্ষীকে এক তরুণকে লাথি মারতে দেখা যায় বলেও ভিডিওতে দাবি করা হয়েছে।
ঘটনাটির মূল্যায়নে তাই দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। প্রথমত, মাদকবিরোধী অভিযানের উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয়তা। দ্বিতীয়ত, অভিযানে অংশ নেওয়ার পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনগত এখতিয়ার। অপরাধ দমনের নামে আইনবহির্ভূত আচরণের সুযোগ তৈরি হলে তা শেষ পর্যন্ত আইনের শাসনকেই দুর্বল করে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৫ অনুচ্ছেদে নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ ও সরকারি কার্যক্রম পরিচালনার কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা সরকারের নির্বাহী বিভাগের অংশ হলেও তাঁদের পদমর্যাদা নিজে থেকে পুলিশের মতো তল্লাশি, আটক বা গ্রেপ্তারের বিশেষ ক্ষমতা প্রদান করে না। এ ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য সংশ্লিষ্ট আইনে নির্ধারিত এখতিয়ার ও শর্ত পূরণ করতে হয়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ২১ ও ২৩ ধারায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মাদকদ্রব্য জব্দ, তল্লাশি, আটক ও গ্রেপ্তারের বিধান রয়েছে। এসব ক্ষমতা আইন দ্বারা নির্ধারিত কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট শর্তের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে রাজনৈতিক পদমর্যাদা বা ব্যক্তিগত উদ্যোগকে আইন প্রয়োগের স্বতন্ত্র এখতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
আগ্নেয়াস্ত্র বহন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সতর্কতা প্রয়োজন। বৈধ অস্ত্রের লাইসেন্স থাকা এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে অস্ত্র প্রদর্শন বা ব্যবহার করার অধিকার থাকা এক বিষয় নয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা, ২০২৫’-এ অস্ত্র বহন ও ব্যবহারের শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র বহনের অনুমতি থাকলেও তা দিয়ে অন্যকে ভয় দেখানো কিংবা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিকল্প হিসেবে কাজ করার স্বয়ংক্রিয় অধিকার তৈরি হয় না।
অতএব, ইশরাক হোসেনের ঘটনাটিও আইনগত ও প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। ভিডিওতে দৃশ্যমান আচরণের প্রেক্ষাপট, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং প্রযোজ্য আইনের আলোকে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা ও দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করাও অপরিহার্য।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি অভিযোগ রয়েছে—নিজ দলের নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে অনেক সময় দলীয় ভাবমূর্তি রক্ষার যুক্তিতে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়। কখনো আত্মপক্ষ সমর্থন, কখনো অভিযোগ অস্বীকার, আবার কখনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ষড়যন্ত্রের দাবি সামনে এনে জবাবদিহির প্রশ্নটি আড়াল করা হয়।
এ ধরনের প্রবণতা শুধু একটি দলের ক্ষতি করে না; গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন এবং রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থাকেও দুর্বল করে। দুর্নীতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে দলীয় পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হলে রাজনৈতিক জবাবদিহি অর্থহীন হয়ে পড়ে।
তবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অর্থ শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া নয়। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য শোনার সুযোগ, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা যেমন ন্যায়সংগত নয়, তেমনি রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অভিযোগ উপেক্ষা করাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এই বিবেচনায় তারেক রহমানের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলোকে দলীয় জবাবদিহির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা যেতে পারে। নিজের দলের পরিচিত ও প্রভাবশালী নেতাদের ক্ষেত্রেও ব্যবস্থা নেওয়ার নজির তৈরি হলে তা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সেই প্রভাব স্থায়ী হবে কি না, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যতে একই মানদণ্ড ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে কি না, তার ওপর।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের শক্তি শুধু জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক প্রভাব কিংবা জনসভায় দেওয়া বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিজের দলের অনিয়মের বিরুদ্ধেও অবস্থান নেওয়ার সক্ষমতা নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। একই সঙ্গে সেই অবস্থান হতে হবে ন্যায়সংগত, স্বচ্ছ এবং আইনসম্মত।
তারেক রহমানের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো, দলীয় শৃঙ্খলা ও জবাবদিহির এই অবস্থানকে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে রাজনৈতিক চর্চায় পরিণত করা। দলের ছোট-বড় সব পর্যায়ের নেতা-কর্মী এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের জন্য একই মানদণ্ড কার্যকর করা গেলে তবেই পরিবর্তনের দাবি বাস্তব ভিত্তি পাবে।
এ ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পেশাগত স্বাধীনতা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা নিশ্চিত করাও জরুরি। অপরাধ দমনে জনপ্রতিনিধিরা প্রশাসনকে সহযোগিতা করতে পারেন, প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে পারেন এবং আইনসম্মত পদক্ষেপের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে পারেন। কিন্তু তাঁরা যেন নিজেরাই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিকল্প হয়ে না ওঠেন, সে সীমারেখা স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।
একটি বা দুটি সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে স্থায়ী পরিবর্তন এসেছে—এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছানো যায় না। পরিবর্তনের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে তখনই, যখন দেখা যাবে দলীয় পরিচয় নির্বিশেষে আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে যথাযথ তদন্ত হচ্ছে, ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং নাগরিকের অধিকার সুরক্ষিত থাকছে।
তারেক রহমানের সামনে তাই সুযোগ যেমন রয়েছে, তেমনি দায়িত্বও রয়েছে। তিনি যদি দলীয় জবাবদিহির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর ভূমিকা, আইনের সমান প্রয়োগ এবং ন্যায়বিচারের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে পারেন, তাহলে তাঁর ঘোষিত রাজনৈতিক বার্তা বাস্তব পরিবর্তনের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
শেষ পর্যন্ত আইনের শাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলো—ক্ষমতাবান ও সাধারণ নাগরিক, সরকারদলীয় ও বিরোধী দলীয় ব্যক্তি, পরিচিত ও অপরিচিত—সবার জন্য আইন সমানভাবে কার্যকর কি না। ব্যক্তির প্রতি আনুগত্যের চেয়ে রাষ্ট্রের আইন ও জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হলেই রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থা আরও দৃঢ় হতে পারে।
The post আইনের শাসনে তারেক রহমানের বার্তা: দলীয় নেতাদের জবাবদিহির প্রশ্ন appeared first on লোকসমাজ.
