জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি ও সরকারি সেবার দুরবস্থার প্রতিবাদে লাখো মানুষের রাজপথ অবরোধে আবারও চরম অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে ফ্রান্স। রাজধানী প্যারিস ছাড়াও লিওঁ, লিল, তুলুজ, নঁত, মার্সেই এবং বোর্দোর মতো প্রধান শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়া এই বিক্ষোভে পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যাপক কাঁদানে গ্যাস, জলকামান ও স্টান গ্রেনেড ব্যবহার করেছে। বিক্ষোভের মুখে প্যারিসের ল্যুভরসহ প্রধান জাদুঘরসমূহ, ২০টির বেশি মেট্রো স্টেশন এবং বহু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
আগের সপ্তাহের সংঘাতের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে এবার শুরু থেকেই সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থানে ছিল প্রশাসন। সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে দেশজুড়ে নামানো হয় প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ, আধা-সামরিক জেন্ডার্ম ও সেনাসদস্য। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানান, ব্যাপক ধরপাকড় চালিয়ে দেশব্যাপী প্রায় ১ হাজার বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে। অভিযানকালে তাদের কাছ থেকে ধাতব বল, সিসার ছররা, আতশবাজি, গুলতি, ধারালো অস্ত্র ও এয়ারসফট বন্দুক উদ্ধার করা হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, ‘সহিংসতা বা জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার কোনো চেষ্টা সহ্য করা হবে না।’
ভাঙচুর ও লুটপাটের আশঙ্কায় প্যারিসের ব্যবসায়ীরা দোকানপাটের কাচে কাঠের পাটাতন লাগিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন এবং অনেকেই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখেন। প্যারিসের মূল মিছিলটি তুলনামূলক শান্তভাবে পোর্ত দ্য ভিনসেনে পৌঁছালেও মিছিলের পথ নির্ধারণ নিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আয়োজকদের চরম মতবিরোধ দেখা দেয়। বিগত সপ্তাহে লুটপাট হওয়া বাণিজ্যিক এলাকা এড়াতে পুলিশ রুট পরিবর্তন করলেও বামপন্থী দলগুলোর দাবি, আন্দোলনকে বাধাগ্রস্ত করতেই এমন বিধিনিষেধ চাপানো হয়েছে।
রাজধানীর চেয়ে প্রাদেশিক শহরগুলোতে সংঘাতের মাত্রা ছিল অনেক বেশি। নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশের চেষ্টাকালে নঁত নগরীতে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে জলকামান ও স্টান গ্রেনেড ছুড়েছে দাঙ্গা পুলিশ। এছাড়া লিওঁ, লিল ও তুলুজে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করা হয় এবং বোর্দোয় নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে বস্তু নিক্ষেপ ও ব্যারিকেড তৈরির ঘটনা ঘটে।
বিক্ষোভে উপস্থিতির সংখ্যা নিয়ে সরকার ও আয়োজকদের মধ্যে বড় ধরনের গরমিল দেখা গেছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে দেশব্যাপী প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ অংশ নিলেও প্রধান ট্রেড ইউনিয়ন সিজিটির দাবি, সারা দেশে জমায়েত হওয়া মানুষের সংখ্যা ছিল আট লাখেরও বেশি। একইভাবে প্যারিসের উপস্থিতি নিয়ে পুলিশ ১ লাখ ১০ হাজার দাবি করলেও শ্রমিক সংগঠনগুলোর মতে তা ছিল আড়াই লাখের কাছাকাছি।
চলমান এই সরকারবিরোধী কর্মসূচিতে শ্রমিক সংগঠন ও শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শামিল হয়েছেন ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের কর্মীরা। শিক্ষা খাতের সংকট ও নাগরিক সেবার মানোন্নয়নের দাবিতে আন্দোলনকারীরা আগামী ৩১ অক্টোবর ফের দেশজুড়ে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন। একই সঙ্গে সরকার দাবি না মানলে আগামী ৫ নভেম্বর থেকে দেশজুড়ে সর্বাত্মক সাধারণ ধর্মঘটের আলটিমেটাম দিয়েছেন দেশটির প্রভাবশালী বামপন্থী নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ।
