বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের (আরএমজি) ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বাজারে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘদিনের অন্যতম প্রধান বাজার জার্মানিকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় একক ইইউ বাজার হয়ে উঠেছে স্পেন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) স্পেনে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৪ কোটি ৮৪ লাখ ৬০ হাজার ডলারে। একই সময়ে জার্মানিতে রপ্তানি হয়েছে ১১২ কোটি ২৯ লাখ ৮০ হাজার ডলারের পোশাক।
গত অর্থবছরের একই সময়ে চিত্র ভিন্ন ছিল। তখন জার্মানিতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছিল ১১২ কোটি ৪৭ লাখ ডলারের, আর স্পেনে রপ্তানি হয়েছিল ১০০ কোটি ৯৮ লাখ ৪৪ হাজার ডলারের। এক বছরের ব্যবধানে স্পেনের বাজারে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোর অবস্থানে পরিবর্তন এনেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে স্পেনে তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ১৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অন্যদিকে জার্মানিতে রপ্তানি কমেছে দশমিক ১৫ শতাংশ। স্পেনের বাজারে রপ্তানি বৃদ্ধির বিপরীতে জার্মানির বাজারে প্রায় স্থবির
প্রবৃদ্ধি দেশ দুটির মধ্যে ব্যবধান তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে।
ইইউতে রপ্তানি বেড়েছে ১৫৭.৯২ মিলিয়ন ডলার : চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সামগ্রিকভাবে ইইউতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি আয় ছিল ৪৭৪ কোটি ৬১ লাখ ডলার। চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৯০ কোটি ৪০ লাখ ২০ হাজার ডলারে। ফলে এক বছরে রপ্তানি আয় বেড়েছে ১৫ কোটি ৭৯ লাখ ২০ হাজার ডলার।
এই প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে স্পেন। দেশটিতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ১৩ কোটি ৮৬ লাখ ২০ হাজার ডলার। ইইউতে মোট নিট রপ্তানি বৃদ্ধির প্রায় ৮৮ শতাংশ এসেছে স্পেনের বাজার থেকে। অর্থাৎ ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে স্পেনের বাজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানেও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। সেপ্টেম্বর মাসে ইইউতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ বেড়ে ১৪১ কোটি ১ লাখ ১০ হাজার ডলারে পৌঁছেছে। প্রথম প্রান্তিকের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি সেপ্টেম্বরের এই বৃদ্ধি ইউরোপীয় বাজারে রপ্তানির ইতিবাচক গতির ইঙ্গিত দেয়।
স্পেন, নেদারল্যান্ডস ও পোল্যান্ডে প্রবৃদ্ধি : ইইউর প্রধান পাঁচটি বাজারের মধ্যে তিনটিতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে। স্পেনের পাশাপাশি নেদারল্যান্ডসে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯ দশমিক ০২ শতাংশ। পোল্যান্ডে রপ্তানি বেড়েছে ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
বিশেষ করে পোল্যান্ডের বাজারে সেপ্টেম্বরে রপ্তানি বৃদ্ধির হার ছিল ৩০ দশমিক ২৫ শতাংশ, যা আলোচ্য বাজারগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ মাসিক প্রবৃদ্ধি। দেশটিতে এই উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তুলে ধরে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অন্যতম বড় বাজার জার্মানিতে রপ্তানি কমেছে দশমিক ১৫ শতাংশ। ফ্রান্সে পতনের হার আরও বেশি, ৪ দশমিক ৯১ শতাংশ। এ ছাড়া ইইউর অন্যান্য দেশ মিলিয়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক ২৪ শতাংশ।
ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে সামগ্রিক রপ্তানি বৃদ্ধি হলেও সব দেশে একই ধরনের প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে না। কয়েকটি বাজারের ইতিবাচক ফল অন্য বাজারগুলোর স্থবিরতা ও পতনের প্রভাব সামাল দিতে সহায়তা করছে।
পরিসংখ্যান বলছে, স্পেনের বাজারে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হলেও জার্মানি ও ফ্রান্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজারে রপ্তানি ধরে রাখাও জরুরি। কারণ, কয়েকটি বাজারে প্রবৃদ্ধির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা সামগ্রিক রপ্তানি পরিস্থিতিকে নির্দিষ্ট বাজারের চাহিদা পরিবর্তনের প্রতি বেশি সংবেদনশীল করে তুলতে পারে।
বাজার বৈচিত্র্য বাড়ানোর প্রয়োজন : বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের (বিএভি) প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ইউরোপের প্রচলিত বড় বাজারগুলোয় প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি স্পেন, নেদারল্যান্ডস ও পোল্যান্ডের মতো বাজারে সম্প্রসারণের সুযোগ কাজে লাগানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাজারভিত্তিক চাহিদা, ক্রেতাদের ক্রয়প্রবণতা এবং রপ্তানির গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে কার্যকর বাজার কৌশল নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
