নিহত শামীমের ভাই তাওসিফ রহমান সাগর ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমার ভাইকে তিন বার গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলা হয়৷ তার লাশ পেতেও আমাদের অনেক সময় লেগেছে৷ গতকাল (বুধবার) রাতে তাকে দাফন করছি৷ সেখানেও আমাদের হুমকি দেয়া হইছে৷'' এসব কারণে পরিবার মামলা করার সময় পায়নি৷ এখন সবকিছু গুছিয়ে তারা থানায় যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানান সাগর৷
সাতক্ষীরা দেবহাটা থানার অফিসার ইনচার্জ এইচ এম শামীম এ কথার সত্যতা স্বীকার করেছেন৷ পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো মামলা না হলেও অভিযুক্ত কিছু ব্যক্তিকে ধরতে এরইমধ্যে পুলিশ তৎপর বলে জানান তিনি৷ পুলিশ অফিসার শামীম বলেন, ‘‘প্রথম দফার মবের খবর পেয়েই তাকে আমরা উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাই৷ কিন্তু সেখানেও মব হয়ে এই অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটে৷''
পুলিশ জানায় যখন অনেক মানুষ মব সৃষ্টি করে হামলা চালায় তখন তাদের পক্ষে সামাল দেয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়৷ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, দায়িত্বরত আনসার বা পুলিশ চেষ্টা করেও শামীমকে রক্ষা করা সম্ভব হয়নি বলে জানান দেবহাটা থানার কর্মকর্তা৷
সাম্প্রতিক সময়ে মব সন্ত্রাস দমনে পুলিশ বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্বল্পতা কথা বলেছেন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক তাহমিনা রহমান৷ তিনি বলেন, ‘‘আগে হয়ত চুরি বা ডাকাতি হত, কিন্তু ২০২৪ পর থেকে আড়াইশো তিনশো লোক দল বেধে যে মব সৃষ্টি করছে, এই প্যাটার্নটাই নতুন৷''
ধর্ম অবমাননার অভিযোগে এমন হামলার কারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘এটা আসলে বাকস্বাধীনতা না থাকার কারণ৷ ধর্ম নিয়ে কেউ কিছু বললেই, সে যে ধর্মের হোক, নৃশংসতা চালানো হচ্ছে৷''
তবে পরিসংখ্যানগতভাবে ২০২৪-২৫ এর তুলনায় এ ধরনের ঘটনা এ বছর কম হলেও তা মোটেও কাঙ্খিত নয় বলে মনে করেন তাহমিনা রহমান৷
পরিকল্পিত হত্যা?
নিহত ওয়াহিদুজ্জামান শামীমমানসিকভাবে সুস্থ ছিলেন না বলে জানিয়েছেন তার পরিবারের সদস্য ও এলাকার মানুষ৷ মাদ্রাসা থেকে কামিল পাস করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স মাস্টার্স পাস করেন৷ কয়েক বছর আগে ‘অজ্ঞান পার্টির' খপ্পরে পরে অসুস্থ হন৷ তারপর থেকেই মাঝে মাঝে শামীম মানসিকভাবে অসুস্থ থাকতেন বলে পরিবার জানিয়েছে৷
নিহতের ভাই সাগর বলেন, ‘‘আমার ভাইয়ের এই অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে তাকে উসকানিমূলক কথা বলায় তারা৷ সেই কথা রেকর্ড করে ফেসবুকে ছড়ায়ে দেয়৷ এরপর ফজলুল হক আমিনী ফেসবুকে ভাইকে মারতে সবাইকে জড়ো করে৷''
প্রথম দফায় হামলার ঘটনায় স্থানীয় জামায়াতের কর্মীরা জড়িত ছিল বলে দাবি করেন সাগর৷ এভাবে উসকানি দিয়ে দলবেধে হত্যাকে ‘পরিকল্পিত' বলে দাবি নিহতের পরিবারের৷ এই তথ্যের সত্যতা মেলে দেবহাটা প্রেস ক্লাবের সভাপতি মীর খায়রুল আলমের বক্তব্যেও৷
খায়রুল আলম ডয়চে ভেলেকে জানান, ‘‘সোমবার স্থানীয় জামায়াতের কর্মী এবং মুসল্লিরা শামীমের বাসায় গিয়ে মারধর করে বলে জেনেছি৷ এরপর শামীম আত্মহত্যার জন্যে বিষ পান করে৷ তাকে স্থানীয় এক ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে সেখানেও হামলা চালানো হয়৷''
খায়রুল আরো জানান যে, ফজলুল হক আমিনী নামে স্থানীয় মসজিদের একজন ইমাম ফেসবুক লাইভে শামীমের ওপর হামলার জন্যে আহ্বান জানান৷ সেই আমিনীর নেতৃত্বেই হাসপাতালে হামলা চালানো হয়৷ খায়রুল বলেন, ‘‘ফজলুল হক আমিনী এক সময় চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন দলের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন৷ বর্তমানে তার রাজনৈতিক অবস্থান জানা নেই৷ তবে এর আগেও ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয়ে উসকানি দেবার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে৷''
দেবহাটা উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা অলিউল ইসলাম এই ঘটনায় তার দলের দায়িত্বশীল নেতাদের সংশ্লিষ্টার বিষয়টি নাকচ করে দেন৷ পক্ষান্তরে মবের খবর পেয়ে তারা প্রশাসনকে জানানোর কথা বলেন৷
দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কতটা?
মবের বিরুদ্ধে কিছু করতে না পারলেও ফেসবুকে উসকানিদাতা ফজলুল হক আমিনীকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা পুলিশ চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন দেবহাটা থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা৷
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক মনে করেন, এ ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসন অনেক কারণেই ব্যর্থ হয়৷ কিন্তু সরকারের এক্ষেত্রে দায় এড়িয়ে যাবার কোনো সুযোগ নেই বলেই মনে করেন তিনি৷
