যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পেতে অভিবাসীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ডাইভারসিটি ভিসা লটারি কর্মসূচি ২০২৭ সালের জন্য আবার চালুর নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। গত ১৪ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের জেলা বিচারক জিনসুক ওহতা পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও পররাষ্ট্র দপ্তরকে বিলম্বিত এই কর্মসূচির নিবন্ধন শুরুর নির্দেশ দেন।
যুক্তরাষ্ট্রে যেসব দেশ থেকে ঐতিহাসিকভাবে কমসংখ্যক মানুষ অভিবাসন করেন, সেসব দেশের নাগরিকদের স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ করে দিতে এই কর্মসূচি চালু করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে পারিবারিক সম্পর্ক বা চাকরির ভিত্তিতে অভিবাসনের প্রচলিত পথের বাইরে থেকেও যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদন করার সুযোগ পান যোগ্য ব্যক্তিরা।
১৯৯০ সালের অভিবাসন আইনের মাধ্যমে কর্মসূচিটির সূচনা হয়। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ আইনটিতে স্বাক্ষর করেন। পরবর্তী সময়ে আফ্রিকার দেশগুলোর নাগরিকদের মধ্যে এই কর্মসূচির সুবিধাভোগীর সংখ্যা বেড়েছে।
প্রতি বছর এই কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৫৫ হাজার অভিবাসী ভিসা বরাদ্দের সুযোগ রয়েছে। তবে এই সংখ্যার মধ্যে নির্বাচিত আবেদনকারীদের স্বামী বা স্ত্রী এবং সন্তানদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অর্থাৎ, ৫৫ হাজার মূল আবেদনকারীর পাশাপাশি তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য অতিরিক্ত ভিসা বরাদ্দ দেওয়া হয় না।
গত বছরের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ২০২৭ সালের কর্মসূচির নিবন্ধন পিছিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেয়। তখন বলা হয়েছিল, নিবন্ধনের তারিখ চূড়ান্ত হলে তা জানানো হবে। কিন্তু দীর্ঘদিন নিবন্ধন শুরু না হওয়ায় কর্মসূচিটি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
এরপর রেড ঈগল ল নামের একটি আইন প্রতিষ্ঠান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে আইনজীবী কার্টিস মরিসন আদালতে যুক্তি দেন, নিবন্ধনের সময়সীমা ঘোষণা না করায় ২০২৭ সালের কর্মসূচি কার্যত বাতিল হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। নিবন্ধন না হলে আবেদনকারী নির্বাচন এবং ভিসা কার্যক্রম পরিচালনার কোনো সুযোগ থাকত না।
আদালত সেই যুক্তি গ্রহণ করেন। বিচারক ওহতা একটি অন্তর্বর্তী নিষেধাজ্ঞা জারি করে নিবন্ধনের ঘোষণা, ৩০ দিনের নিবন্ধন কার্যক্রম, নির্বাচিত আবেদনকারীদের অবহিত করা এবং প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী আবেদন প্রক্রিয়া পরিচালনার নির্দেশ দেন।
আদালতের আদেশ অনুযায়ী, পররাষ্ট্র দপ্তরকে ২৯ অক্টোবরের মধ্যে নিবন্ধনসংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য ঘোষণা করতে হবে। ১ নভেম্বরের মধ্যে নিবন্ধন শুরু করতে হবে এবং ৩ ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচিত আবেদনকারীদের জানাতে হবে।
তবে নিবন্ধন শুরু হলেই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে না। নির্বাচিত ব্যক্তিদের আবেদন যাচাই এবং ভিসা প্রক্রিয়াকরণে বিলম্ব হলে তাদের যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সুযোগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ২০২৭ সালের ভিসা দেওয়ার শেষ সময়সীমা ৩০ সেপ্টেম্বর। আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল অথবা আদেশ স্থগিতের আবেদন করলে এসব বাধ্যবাধকতায় পরিবর্তন আসতে পারে।
আইনজীবী কার্টিস মরিসন বলেন, আগের বছরের মতো পরিস্থিতি ২০২৭ সালের কর্মসূচিতে আবার ঘটতে দেওয়া হবে না। তার মতে, নিবন্ধন চালুর আইনি জয় তখনই অর্থবহ হবে, যখন নির্বাচিত ব্যক্তিদের ভিসার আবেদন যথাসময়ে প্রক্রিয়াকরণ করা হবে এবং তারা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সুযোগ পাবেন।
এই মামলার মূল বিষয় হলো, কংগ্রেসের প্রণীত আইন বাস্তবায়নে নির্বাহী বিভাগের দায়িত্ব। কংগ্রেস কর্মসূচিটি প্রতিষ্ঠা করেছে, আর তা পরিচালনার দায়িত্ব পররাষ্ট্র দপ্তরের। প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আইন বাস্তবায়ন বন্ধ রাখা যায় কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
কর্মসূচিটির সমর্থকদের মতে, কোনো প্রশাসন নিবন্ধনের সময় ঘোষণা না করেই একটি আইনগত সুযোগ কার্যত বন্ধ করে দিতে পারে না। আইন পরিবর্তন করতে হলে যথাযথ আইন প্রণয়নের পথ অনুসরণ করতে হবে। প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা দিয়ে কংগ্রেসের সিদ্ধান্তকে অকার্যকর করা আইনের শাসনের পরিপন্থী।
তবে লটারি কর্মসূচিতে নির্বাচিত হলেই যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না। মূল আবেদনকারীকে অবশ্যই নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা অথবা গ্রহণযোগ্য কর্ম-অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণ করতে হবে। সাধারণভাবে চাকরির প্রস্তাব থাকা বাধ্যতামূলক নয়। পাশাপাশি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বা আগের অভিবাসনসংক্রান্ত নিয়ম লঙ্ঘনের মতো বিষয়সহ প্রযোজ্য অন্যান্য শর্তও পূরণ করতে হয়।
কর্মসূচিটির সমালোচকেরা মনে করেন, এসব ভিসার সুযোগের পরিবর্তে দক্ষ কর্মী ও বিনিয়োগকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। তবে সমর্থকদের যুক্তি, দক্ষ কর্মী ও বিনিয়োগকারীদের জন্য সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে আগে থেকে পারিবারিক বা পেশাগত যোগাযোগ নেই, এমন ব্যক্তিদের জন্যও সীমিত সুযোগ রাখা সম্ভব।
১৯৯০ সালের আইন প্রণয়নের অন্যতম উদ্যোক্তা সাবেক কংগ্রেস সদস্য ব্রুস মরিসন এই কর্মসূচির পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছিলেন, বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিশ্বের প্রতিটি প্রান্ত থেকে স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসা পরিশ্রমী মানুষদের আকৃষ্ট করার চেয়ে ভালো উপায় নেই।
আদালতের নির্দেশে আপাতত ২০২৭ সালের ডাইভারসিটি ভিসা লটারির নিবন্ধন চালুর পথ তৈরি হয়েছে। তবে আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রশাসন আপিল করেছে। ফলে কর্মসূচির ভবিষ্যৎ এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।
বাংলাদেশিরা কি আবেদন করতে পারবেন?
বাংলাদেশিদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২০২৭ সালের ডিভি লটারিতে বাংলাদেশ যোগ্য দেশের তালিকায় থাকবে কি না। এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্য নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আবেদন করা যাবে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না। তাই আগ্রহীদের মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ও নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের তথ্যানুসারে, ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশ আর ডাইভারসিটি ভিসা কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার যোগ্য নয়। ২০০৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে ৫০ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি এই ভিসার আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছেন বলে বাংলাদেশ এই যোগ্যতা হারিয়েছে। কারণ ডিভি কর্মসূচি সেই দেশগুলোর জন্য যেসব দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের হার তুলনামূলকভাবে কম।
/অ
