পার্বত্য চট্টগ্রামে কৃষি খাতের পর পর্যটন খাত অর্থনীতির চাকাকে সচল রেখেছে। আর সে অর্থনীতিকে অচল করে দিতে শুরু থেকে নানা ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে ইউপিডিএফ। যার সবশেষ চিত্র ফুটে উঠেছে রাঙামাটির সাজেক ভ্যালিকে ঘিরে। আসন্ন দুর্গাপূজার ছুটিতে যেখানে শত কোটি টাকার পর্যটনকেন্দ্রিক লেনদেনের প্রস্তুতি চলছিল, সে সময় সাধারণ পাহাড়িদের জিম্মি করে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার ও অপরাধমূলক কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার অপকৌশল নিয়েছে ইউপিডিএফ। প্রতিপক্ষের সঙ্গে অপরাধ মূলক কর্মকাণ্ডে টিকে থাকতে সাধারণ গ্রামবাসীদের অস্ত্রের মুখে সড়কে নামিয়ে সাজেক ভ্যালিকেন্দ্রিক পর্যটনকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
রোববার ১১ অক্টোবর সকাল ৬টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত কথিত সড়ক অবরোধের নামে সাজেক ইউনিয়নের উজোবাজার এলাকায় শত শত পর্যটককে আটকে দিয়ে ভোগান্তি তৈরি করা হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে এ পরিস্থিতি সামাল দেয়। একপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার আশ্বাস দেওয়ার পর অবরোধ কর্মসূচি ৪৮ ঘণ্টার জন্য স্থগিত করা হয়।
সারাদিন সরেজমিনে এ পরিস্থিতি দেখে ও অবরোধ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত এক সপ্তাহ ধরে সাজেক ইউনিয়নের বিভিন্ন পাড়ায় অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিচ্ছে ইউপিডিএফের সন্ত্রাসীরা। যেদিন সড়কে নামতে বলা হবে, সেদিন যেন নামে, সে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। জনসমাগমের পুরোপুরি দায়িত্ব দেওয়া হয় স্থানীয় কারবারিদের কাঁধে। তেমনই দুইজন কারবারির সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের। নাম প্রকাশ না করার অনুরোধে জানান, আমরা নামে কারবারি। আমরা তাদের হাতে জিম্মি। গ্রাম থেকে ২০-৩০ জন মানুষ নির্ধারণ করা হয়েছে। দিতে না পারলে জবাবদিহি করতে হবে। সে ভয়ে ভোর থেকে মানুষ জোগাড় করে এখানে এসেছি। কেউ এখানে নিজের ইচ্ছায় আসেনি। এখানে ইউপিডিএফ থাকুক বা অন্য পক্ষ, কেউ জনগণের কথা চিন্তা করে না।
মূলত, পার্বত্য জেলা রাঙামাটির সাজেকে হঠাৎ করে গণ অধিকার রক্ষা কমিটির নাম দিয়ে ঐতিহ্যগত হেডম্যান-কারবারীদের জিম্মি করে ইউপিডিএফ (প্রসীত) প্রথমে অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ এবং পরবর্তীতে ১১ ঘণ্টা পর আবার তা শিথিল করে ঘোলাটে পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পর্যটকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে। এতে করে পর্যটন ব্যবসায় মারাত্মক ধস নেমেছে। শারদীয় দুর্গাপূজার টানা ছুটিতে সারাদেশ থেকে হাজার হাজার পর্যটকের হোটেল ও রিসোর্ট বুকিং বাতিল হতে শুরু করেছে। এতে এখন পুরো সাজেক এলাকা এক চরম শূন্যতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে যাচ্ছে।
ইউপিডিএফের এই কার্যক্রম সরাসরি প্রভাব পড়েছে স্থানীয় পরিবহন খাতসহ কটেজ ও খাবার হোটেল ব্যবসায়। এ পরিস্থিতির মধ্যে রাঙামাটি প্রশাসনের জারিকৃত বিজ্ঞপ্তিতে আরও ভীতিকর অবস্থা তৈরি হয়েছে।
একাধিক পরিবহন শ্রমিক জানান, টানা বন্ধের এ সময়ে সাজেক সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকলে পরিবহন মালিক ও চালকেরা ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হবেন। সাজেক সড়কে যেসব পরিবহন চলাচল করে, তা শুধু সাজেকে যাতায়াত করে। এখন যদি পর্যটকশূন্য হয়ে পড়ে, তাহলে আমরা পুরোপুরি বেকার হয়ে যাব।
পরিবহনের সঙ্গে সাজেকের পর্যটনশিল্পের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করেন হাজার হাজার স্থানীয় কর্মমুখী মানুষ। গত শনিবার থেকে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন সাজেক পর্যটন খাতসংশ্লিষ্ট হাজারো উদ্যোক্তা।
সাজেকের এক কটেজ ব্যবসায়ী জানান, আঞ্চলিক সশস্ত্র আধিপত্য বিস্তার ও নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে ইউপিডিএফ (প্রসীত) এই সড়ক অবরোধ ডেকেছে। পাহাড়ের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি সাজেক পর্যটনশিল্পকে এভাবে জিম্মি করায় ধ্বংসের মুখে পড়ছে পুরো অঞ্চলের দীর্ঘদিনের গড়ে ওঠা অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। এই অচলাবস্থার কারণে সাজেকের স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ বাসিন্দাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে।
সাজেক কটেজ মালিক সমিতির এক নেতা জানান, পূজার এ ছুটিতে খাগড়াছড়ি ও সাজেক মিলিয়ে অন্তত শত কোটি টাকার লেনদেন হতো। ইউপিডিএফের (প্রসীত) স্বার্থকেন্দ্রিক ও সহিংস রাজনীতির খেসারত দিয়ে আজ বলির পাঁঠা হচ্ছেন পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে সব সাধারণ মানুষ। একটি সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্রকে পরিকল্পিতভাবে ধসের মুখে ঠেলে দিয়ে অঞ্চলটিকে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে দেওয়ার এই চক্রান্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছে। পাহাড়ের শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং সাজেকের পর্যটন খাত রক্ষায় দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
আর
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল চট্টগ্রামনিউজ.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, মতামত, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি । আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।
