খান আরিফুজ্জামান (নয়ন), ডুমুরিয়া ।।
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলায় কৃষি উপকরণ ও বিএডিসির সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে অনিয়ম, দুর্নীতি ও জালিয়াতির মারাত্মক অভিযোগ উঠে এসেছে। নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে নদীবেষ্টিত মাগুরখালী ইউনিয়নে একটি ‘মিষ্টির দোকান’ এবং উপজেলা সদরে একটি ‘বরফ কল’কে সারের গুদাম দেখিয়ে বিতর্কিত ব্যক্তিদের ডিলারশিপ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও দলীয় প্রভাব কাজে লাগিয়ে সুযোগ-সুবিধাহীন এসব প্রতিষ্ঠানে ডিলারশিপ দেওয়ায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় ভুক্তভোগী কৃষক ও সচেতন মহল।
মিষ্টির দোকান দেখিয়ে মাগুরখালীতে ডিলারশিপ: মাগুরখালী ইউনিয়নে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসির) সারের ডিলারশিপ পেয়েছেন ‘মেসার্স এস এস এন্টারপ্রাইজ’-এর স্বত্বাধিকারী সুকৃতি কুমার মন্ডল। তবে স্থানীয় কৃষক ও বাসিন্দাদের অভিযোগ, ডিলারশিপের জন্য যে স্থাপনা দেখানো হয়েছে, সেখানে সার সংরক্ষণের কোনো গুদাম নেই; বরং একটি মিষ্টির দোকানকে সারের গুদাম হিসেবে বানিয়ে এই নিয়োগ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
মিষ্টির দোকানে সার বিক্রি ও সংরক্ষণ যেমন স্বাস্থ্যসম্মত নয়, তেমনি উপযুক্ত গুদাম না থাকায় সারের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে সুকৃতি কুমার মন্ডল দাবি করেন, তিনি নিয়ম মেনেই ব্যবসা পরিচালনা করছেন এবং সারের সঠিক সরবরাহ নিশ্চিত করতেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

বরফ কল দেখিয়ে সদরে ডিলারশিপ, পেছনে বহুরূপী রাজনৈতিক প্রভাব: অন্যদিকে, ডুমুরিয়া উপজেলা সদরে সারের ডিলারশিপ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে জি. এম. হাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে। অভিযোগে জানা যায়, হাফিজুর রহমান ডুমুরিয়া সদরের বাসিন্দা বা ভোটার নন। তিনি গুটুদিয়া ইউনিয়নের একটি ‘বরফ কল’কে সারের গুদাম হিসেবে কাগজপত্রে দেখিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে উপজেলা সদরের ডিলারশিপ বাগিয়ে নিয়েছেন।
শুধু তা-ই নয়, তিনি ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পূর্ণকালীন চাকরি করেন। ফলে সার বিতরণে তাঁর নিয়মিত উপস্থিতি ও সক্ষমতা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে।
হাফিজুর রহমানের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও রয়েছে তীব্র বিতর্ক। স্থানীয়দের অভিযোগ, তাঁর পরিবার অতীতে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। চব্বিশের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর তিনি জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা গোলাম পরওয়ারের পক্ষে প্রচারে অংশ নেন এবং পরবর্তীতে বিএনপির সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা দেখিয়ে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা চালান।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত জি. এম. হাফিজুর রহমান ঢাকায় চাকরি করার কথা স্বীকার করলেও দাবি করেন, “আমার ব্যবসা দেখার লোক আছে। ডিলারশিপে কোনো অনিয়ম হয়নি, নিয়ম মেনেই সব করা হয়েছে।”
কৃষক ও স্থানীয়দের ক্ষোভ: ডুমুরিয়ার স্থানীয় বাসিন্দা মো. ইসমাইল হোসেনসহ একাধিক কৃষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “একজন ব্যক্তি ঢাকায় চাকরি করেন, সদরের ভোটার নন, তিনি আবার বরফ কলকে সারের গুদাম বানিয়ে কীভাবে ডিলারশিপ পান? এটি স্পষ্ট জালিয়াতি। অবিলম্বে এই ডিলারশিপ বাতিল করে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।”
প্রশাসনের কঠোর হুশিয়ারি ও তদন্তের আশ্বাস: ঘটনা সামনে আসার পর নড়েচড়ে বসেছে উপজেলা প্রশাসন ও তদন্ত কমিটি। ডুমুরিয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ও তদন্ত কমিটির সদস্য ড. মো. আশরাফুল কবির বলেন, “বরফ কলকে গুদাম দেখানো এবং ইউনিয়নের সীমানার বাইরে স্থাপনা দেখানোর বিষয়ে লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কোনো অসংগতি বা জালিয়াতির প্রমাণ মিললে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মিজ সবিতা সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, “সার ডিলার নিয়োগে সরকারি নীতিমালা অনুসরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আবেদনের সময় দেওয়া তথ্য এবং সরেজমিন পরিদর্শনের তথ্যে কোনো গরমিল বা ভুয়া তথ্য দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে তা বরদাশত করা হবে না। বিধি অনুযায়ী দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
খুলনার জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত জানিয়েছেন, সারের মতো সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ কৃষি উপকরণের ক্ষেত্রে অনিয়ম, জালিয়াতি বা রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাৎক্ষণিক নিয়োগ বাতিলসহ কঠোর আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
কৃষিপ্রধান ডুমুরিয়ায় সারের ন্যায্য সরবরাহ ও গুণগত মান নিশ্চিত করতে অনতিবিলম্বে জালিয়াতির মাধ্যমে পাওয়া এসব বিতর্কিত ডিলারশিপ বাতিল করে উপযুক্ত ও প্রকৃত ব্যবসায়ীদের ডিলার নিয়োগ দেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা।
