হামাসের নেতৃত্বে ইসরাইলে পরিচালিত ‘অপারেশন আল-আকসা ফ্লাড’-এর তিন বছর পূর্ণ হয়েছে গত ৭ অক্টোবর। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ওই হামলার পর থেকেই ইসরাইলের নির্বিচার বিমান হামলা ও স্থল অভিযানে পুরো গাজা উপত্যকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। মাইলের পর মাইলজুড়ে হাজার হাজার ভবন, বাড়িঘর ও স্থাপনা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ইসরাইলের সামরিক অভিযানে ৭৮ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে নিহত হয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৫০০ জন। আহত হয়েছেন প্রায় দুই লাখ মানুষ।
বিজ্ঞাপন
অব্যাহত হামলার কারণে ২০ লাখের বেশি ফিলিস্তিনি আশ্রয়হীন হয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। গত তিন বছরে ইসরাইলি বাহিনীর এলাকা ছাড়ার নির্দেশের কারণে লাখ লাখ ফিলিস্তিনি তাদের ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাস্তুভিটায় তাঁবু টানিয়েও দীর্ঘদিন থাকতে পারেননি। একেকবার একেক এলাকায় চলে যেতে হয়েছে। বারবার এলাকা পরিবর্তনে বাধ্য হওয়ার কারণে তাদের জীবনে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। কিন্তু তারপরও বেঁচে থাকার জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ নেই। পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থাসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর প্রায় কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। গাজা উপত্যকার পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশনব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ধ্বংস করেছে ইসরাইল। ফলে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া এই ভূখণ্ডে পানি সংগ্রহ করা ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর জন্য প্রতিদিনের কঠিন লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
জাতিসংঘের জরিপের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে গাজার ৮৪ শতাংশ পরিবার গুরুতর পানি সংকটে ছিল এবং আগস্টে তা বেড়ে ৯১ শতাংশে পৌঁছায়। গাজা উপত্যকার অধিকাংশ এলাকা নিজেদের দখলে নেওয়ার জন্যই ইসরাইল পরিকল্পিতভাবে এসব করছে। সংগত কারণেই ৭ অক্টোবর হামলার তৃতীয় বার্ষিকী বিশ্ববাসীর সামনে ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব রক্ষা, তাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ বন্ধ করা এবং যেসব দেশের সরকার ইসরাইলের দখলদারত্ব টিকিয়ে রেখেছে, সেগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনার জোরালো তাগিদ তুলে ধরেছে।
নির্বিচার হামলা ও গণহত্যা সত্ত্বেও গত তিন বছরে ইসরাইল গাজায় বিজয় অর্জন করতে পারেনি। এ কারণে সেখানে গণহত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ এবং জাতিগত নির্মূল অভিযান অব্যাহত রেখেছে তারা। এই বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে ফিলিস্তিনি জনগণের জীবন রক্ষা, তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিশ্চিত করা এবং ইসরাইলি দখলদারত্বের অবসানের মতো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের বিকল্প হিসেবে কোনো কূটনৈতিক ঘোষণা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
তবে ফিলিস্তিনিদের নির্মূলের ইতিহাসের সূচনা ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরে হয়নি। ১৯৪৮ সালের ‘নাকবা’র (মহাবিপর্যয়) পর থেকেই ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ, কৃষিজমি দখল এবং অধিকৃত পশ্চিমতীরের বিভিন্ন এলাকাকে খণ্ডবিখণ্ড করার ঘটনা তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামরিক দখলদারত্ব, অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপন এবং গাজা অবরোধের মতো ঘটনা ‘অপারেশন আল-আকসা ফ্লাড’-এর অনেক আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। ‘অপারেশন আল-আকসা ফ্লাড’কে এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেই বুঝতে হবে।
আমার বিশ্লেষণে, এই অভিযান ঔপনিবেশিক প্রকল্পের মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী বশ্যতা স্বীকার করানোর অক্ষমতাকেই উন্মোচিত করেছে এবং ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর অপরাজেয় ভাবমূর্তিকে ধূলিসাৎ করেছে। এর কারণগুলো অনুধাবন করতে হলে দখলদারত্ব এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অস্বীকার করার বিষয়টিকে বিবেচনায় নিতে হবে। দখলদারিত্ব থেকেই প্রতিরোধের জন্ম হয়, আর ফিলিস্তিন ইস্যুকে শুধু দখলদার শক্তির নিরাপত্তার সমস্যা হিসেবে দেখার কোনো অবকাশ নেই।
৭ অক্টোবর হামলার তৃতীয় বার্ষিকীতে যে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে এসেছে, তা হলো—ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার পথ রুদ্ধকারী কাঠামো বা ব্যবস্থাগুলো বহাল থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তাদের কাছ থেকে প্রতিরোধ ত্যাগ করার আশা করা যেতে পারে? জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ১৯৭০ সালের ৩০ নভেম্বর গৃহীত ২৬৪৯ নম্বর প্রস্তাবে ঔপনিবেশিক ও বিদেশি শাসনের অধীনে থাকা জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং মুক্তির সংগ্রামের বিষয়টি স্বীকৃতি পেয়েছে। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর গৃহীত ২৭৮৭ নম্বর প্রস্তাবে ফিলিস্তিনি জনগণসহ সব নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মুক্তির জন্য সম্ভাব্য সব উপায়ে সংগ্রামের বৈধতা পুনর্ব্যক্ত করা হয়। ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর গৃহীত ৩০৭০ নম্বর প্রস্তাবে সশস্ত্র সংগ্রামসহ সম্ভাব্য সব উপায়ে ঔপনিবেশিক ও বিদেশি শাসন থেকে মুক্তির সংগ্রামের বৈধতা স্পষ্টভাবে পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। এরপর ১৯৭৩ সালের ১২ ডিসেম্বর গৃহীত ৩১০৩ নম্বর প্রস্তাবে ঔপনিবেশিক ও বিদেশি শাসন এবং বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রামের বৈধতা ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে যোদ্ধাদের সুরক্ষা ও জেনেভা কনভেনশন প্রয়োগসংক্রান্ত নীতিমালা নির্ধারণ করা হয়।
সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করলে, এই প্রস্তাবগুলো ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার দাবিকে সংজ্ঞাগতভাবে ‘সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে গণ্য করার বিরোধিতা করে। এগুলো স্পষ্ট করে যে, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মুক্তির সংগ্রামের অধিকার দখলদার শক্তির দেওয়া কোনো অনুগ্রহ বা ছাড় নয়। যেকোনো ধরনের প্রতিরোধকে ‘সন্ত্রাসবাদী’ আখ্যা দিয়ে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার অর্থ হলো—জাতিসংঘ স্বীকৃত অধিকারগুলো থেকে নিপীড়িত জনগণকে বঞ্চিত করা। এই প্রেক্ষাপটে ঔপনিবেশিক ও বিদেশি শাসনের অধীনে থাকা জনগণের প্রতিরোধ সংগ্রামকে সম্ভাব্য সব উপায়ে পরিচালনার অধিকার স্বীকার করা হয়েছে। তবে সেই অধিকার আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি দেয় না।
অন্যদিকে, অবৈধ দখলদারত্ব, বর্ণবাদ বা ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের বিষয়টিকে যৌক্তিক প্রমাণ করতে ইসরাইল আত্মরক্ষার অজুহাত খাড়া করতে পারে না। চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের ২৭, ৫৫, ৫৬ ও ৫৯ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, দখলদার শক্তি হিসেবে তাদের বেসামরিক জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে, খাদ্য, ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা সরবরাহ করতে এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রম সহজতর করতে বাধ্য। নিরাপত্তার কোনো অজুহাতই সমষ্টিগত শাস্তি, জোরপূর্বক স্থানান্তর কিংবা জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য পরিস্থিতি ধ্বংস করাকে বৈধতা দিতে পারে না।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, গাজায় ইসরাইল গণহত্যা চালিয়েছে। কমিশন হত্যাকাণ্ড, গুরুতর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি, কোনো জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে জীবনধারণের অযোগ্য পরিস্থিতি চাপিয়ে দেওয়া এবং জন্মহার রোধের মতো পদক্ষেপগুলোকে এই অপরাধের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে। জোরপূর্বক অনাহার ও বাস্তুচ্যুতি এবং বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য পরিবেশ ধ্বংস করে ফেলার মতো পদক্ষেপ ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলেছে। খাদ্য, পানি, আশ্রয় বা চিকিৎসাসেবার অভাবে মৃত্যুর ঘটনা শুধু বোমাবর্ষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না।
এই ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞকে ‘আনুষঙ্গিক ক্ষয়ক্ষতি’ হিসেবে অভিহিত করাটা ভুক্তভোগীদের মানবিক সত্তাকে অস্বীকার করার শামিল। এর আড়ালে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোকে আড়াল করা হয়।
৭ অক্টোবর হামলার তিন বছর পূর্তিতে সেসব শক্তির, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের, আচরণও পর্যালোচনার দাবি রাখে। তারা ইসরাইলকে অস্ত্র, কূটনৈতিক সুরক্ষা ও বস্তুগত সহায়তা দিয়ে আসছে। সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত অপরাধ এবং আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও এই সহায়তা অব্যাহত রাখার বিষয়টি এখন সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি রাখে। যে সহায়তা বেআইনি দখলদারত্বকে টিকিয়ে রাখে, তার অবসান ঘটানো জরুরি। একই সঙ্গে অপরাধ সংঘটনে সহায়ক অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ, মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর সুযোগ নিশ্চিত এবং অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনার প্রচেষ্টাকে সমর্থন জানাতে হবে।
ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সংগ্রাম আজও টিকে আছে সেসব পরিবারের মধ্যে, যারা নিজেদের ভিটেমাটি আঁকড়ে আছেন; সেসব স্বাস্থ্যকর্মীর মধ্যে, যারা আহতদের সেবা দিচ্ছেন এবং সেসব সাংবাদিকের মধ্যে, যারা হামলার ঘটনাগুলো নথিবদ্ধ করছেন। স্মৃতি সংরক্ষণ, শিশুদের শিক্ষা এবং নিজেদের অস্তিত্ব মুছে ফেলার চেষ্টাকে প্রত্যাখ্যান করার মধ্য দিয়েই এই প্রতিরোধ টিকে আছে। তাদের এই দৃঢ়সংকল্প ও ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতাকে স্বীকৃতি দেওয়ার অর্থ হলো, এটি মেনে নেওয়া যে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ কোনো জনগোষ্ঠীর টিকে থাকার অধিকারকে নস্যাৎ করতে পারে না।
নাগরিক সমাজকে অবশ্যই সরকারগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি ফিলিস্তিনি ও মানবিক সংস্থাগুলোকে সহায়তা করতে হবে। যারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা প্রকাশ করেন, তাদের সুরক্ষা দিতে হবে এবং শান্তিপূর্ণ সংহতি ও বয়কট কর্মসূচিকে জোরদার করতে হবে। নিত্যদিনের ধ্বংসযজ্ঞকে স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য করে তোলার অপচেষ্টার মুখেও ফিলিস্তিনের প্রতি অঙ্গীকার অটুট রাখতে হবে।
ফিলিস্তিনিদের জীবন রক্ষার অর্থ হলো অপরাধের অবসান, ভুক্তভোগীদের জন্য ক্ষতিপূরণ এবং আধিপত্য টিকিয়ে রাখা কাঠামোগুলো ভেঙে ফেলার দাবি জানানো। বিচার বা ন্যায়বিচার কখনোই সরকারগুলোর সুবিধাবাদ এবং তাদের মিত্রদের দায়মুক্তির কাছে জিম্মি থাকতে পারে না।
মিডল ইস্ট মনিটর অবলম্বনে মোতালেব জামালী
