দিল্লিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফর নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত নভেম্বরের কয়েকটি সম্ভাব্য তারিখ বিবেচনায় থাকলেও সফরের দিনক্ষণ, সূচি কিংবা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা চূড়ান্ত হয়নি। ভারত ও বাংলাদেশ— উভয় পক্ষই মনে করছে, সফরের জন্য রাজনৈতিক পরিবেশ অনুকূল হওয়া প্রয়োজন। ভারতের আমন্ত্রণ উন্মুক্ত রয়েছে, তবে
সফর এখনও আলোচনাধীন।
দুই দেশের নেতার এই সম্ভাব্য করমর্দন কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়। ভূগোল, ইতিহাস, বাণিজ্য ও দীর্ঘ অভিন্ন সীমান্তে যুক্ত দুই প্রতিবেশী গভীর অবিশ্বাস কাটিয়ে সম্পর্ক পুনর্গঠনের পথে এগোতে পারে কিনা, তারও ইঙ্গিত দেবে এটি। তবে সম্ভাবনাটি বাস্তবে রূপ নেবে কিনা, তা নির্ভর করবে দুই সরকার কী নিয়ে আলোচনা, দর-কষাকষি ও সমঝোতা করে এবং সেসবের কতটা বাস্তবায়ন করতে পারে, তার ওপর।
নির্বাসন থেকে ক্ষমতায় : প্রায় ১৭ বছর লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটানোর পর ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে পরিবর্তন আসে, তার প্রত্যাবর্তন ছিল সেই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ছেলে এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার উত্তরসূরি হিসেবে তার প্রত্যাবর্তন দলটির জন্য ছিল আবেগঘন মুহূর্ত।
দেশে ফেরার কয়েক দিন পর খালেদা জিয়ার মৃত্যু হয়। তার জানাজায় ঢাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
লন্ডনে স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমাকে নিয়ে বসবাসের সময় তারেক রহমান তুলনামূলক নিরিবিলি জীবন কাটাতেন। রিচমন্ড পার্কে হাঁটাহাঁটি ও ইতিহাসের বই পড়া ছিল তার পছন্দের কাজ। টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জাতীয় ঐক্য ও দেশের চ্যালেঞ্জ নিয়ে ভাবনার কথা বলেন। দীর্ঘ নির্বাসনের পর এখন তার সামনে বিভক্ত দেশ পরিচালনা, প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণের দায়িত্ব।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি নির্ণায়ক বিজয় অর্জন করে। ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তারেক রহমান। তার পারিবারিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকার দলটির ভেতরে শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করলেও বংশানুক্রমিক রাজনীতি, তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বিরোধী দলে থাকাকালে ওঠা অভিযোগের কারণে তাকে নানা প্রশ্নেরও মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
দিল্লির বার্তা ও কূটনৈতিক তৎপরতা : খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে ঢাকায় আসেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। তিনি তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত শোকবার্তা পৌঁছে দেন। জয়শঙ্কর আশা প্রকাশ করেন, খালেদা জিয়ার ‘দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধ’ দুই দেশের অংশীদারত্ব উন্নয়নে পথ দেখাবে। অন্যদিকে, ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে গিয়ে শোকবইয়ে স্বাক্ষর করেন। দুটি ছিল পৃথক ঘটনা।
শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি, ভারতে তার অবস্থান এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কে অবনতি ঘটে। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি নয়াদিল্লির সঙ্গে তুলনামূলক কম ঘনিষ্ঠ হিসেবে বিবেচিত হয়। নিরাপত্তা, প্রকাশ্য বক্তব্য ও দ্বিপক্ষীয় প্রত্যাশা নিয়ে উত্তেজনাও সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের পর মোদি তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, ‘একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের পাশে ভারত সমর্থন নিয়ে দাঁড়াবে।’ দুই দেশের বহুমাত্রিক সম্পর্ক জোরদার ও অভিন্ন উন্নয়ন লক্ষ্য এগিয়ে নিতে একসঙ্গে কাজ করার আগ্রহও জানান তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বিএনপি ও তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে নতুন সরকারের সঙ্গে ‘সমৃদ্ধি ও অঞ্চলের নিরাপত্তা’ এগিয়ে নিতে কাজ করার কথা বলেন। চীনও নির্বাচনকে স্বাগত জানিয়ে নতুন প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করার প্রস্তুতি জানায়। এসব বার্তা বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতে বড় শক্তিগুলোর আগ্রহ তুলে ধরে।
বাংলাদেশের প্রয়োজন বিনিয়োগ, রপ্তানি বাজার, জ্বালানি নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান। একই সঙ্গে কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে নিজস্ব স্বার্থরক্ষাও জরুরি। নির্বাচনের আগে তারেক রহমান বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির কথা বলেছেন। ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই অবস্থানের বাস্তব প্রয়োগ পর্যবেক্ষণে থাকবে।
নতুন দূত, পুরনো অমীমাংসিত প্রশ্ন : বাংলাদেশে ভারতের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য দীনেশ ত্রিবেদীর নিয়োগ সম্পর্ককে নতুন রাজনৈতিক গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত। অন্যদিকে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়ামকে নয়াদিল্লিতে পরবর্তী হাইকমিশনার নিয়োগে ভারতের আনুষ্ঠানিক সম্মতি পাওয়া গেছে। তিনি জেনেভায় জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হতে যাওয়া এম রিয়াজ হামিদুল্লাহর স্থলাভিষিক্ত হবেন। ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত সম্মতির খবর প্রকাশিত হলেও তার দায়িত্ব গ্রহণের তারিখ নিশ্চিত হয়নি।
দায়িত্বে থাকা পররাষ্ট্রসচিবকে হাইকমিশনার হিসেবে পাঠানোর সিদ্ধান্ত দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগে কূটনৈতিক গুরুত্ব যোগ করেছে। তবে কেবল নিয়োগের মাধ্যমে রাজনৈতিক মতপার্থক্য মিটবে না। প্রয়োজন ধারাবাহিক সংলাপ ও বাস্তবসম্মত সমঝোতা।
তারেক রহমানের সম্ভাব্য নভেম্বরের সফর নিয়ে জানতে চাইলে হাইকমিশনার ত্রিবেদী বলেন, ভারতের আমন্ত্রণ উন্মুক্ত রয়েছে এবং তাড়াহুড়োর প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরও জানিয়েছেন, আলোচনা চলছে। তার ভাষ্য, সফরের জন্য উভয় পক্ষের অনুকূল পরিবেশ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা প্রয়োজন। ফলে তারিখ নিয়ে জল্পনার চেয়ে সফরের প্রস্তুতি ও সম্ভাব্য ফলাফলই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
জনসমর্থন ও সম্পর্কের পরীক্ষা : তারেক রহমান প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, জননিরাপত্তার উন্নতি ও রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তার নির্বাচনী অঙ্গীকারে নিম্ন আয়ের পরিবার, কৃষক, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বিষয় রয়েছে। বিএনপির ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বা ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানও নিজস্ব অগ্রাধিকারকে গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা দেয়।
নির্বাচনের আগে টাইম ম্যাগাজিনকে তিনি বলেন, ‘আমরা যদি দেশকে ঐক্যবদ্ধ করতে না পারি, তাহলে দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না।’ প্রতিশোধের মাধ্যমেও দেশের উপকার হবে না বলে তিনি যুক্তি দেন। এসব অঙ্গীকারের বাস্তব পরীক্ষা হবে রাজনৈতিক বহুত্ববাদ, আইনের শাসন, জবাবদিহি এবং বিরোধীদের শান্তিপূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে। নির্বাচনী ম্যান্ডেট সরকারকে দেশ পরিচালনার ক্ষমতা দেয়, তবে যারা ভোট দেয়নি, তাদের অধিকার রক্ষার দায়িত্বও বহাল থাকে।
ভারতের জন্যও স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্তের ওপারের অস্থিরতা বাণিজ্য, পরিবহন, নিরাপত্তা ও জনগণের যোগাযোগে প্রভাব ফেলে। দুই দেশের সম্পর্ক ব্যক্তিকেন্দ্রিক না হয়ে প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছ চুক্তি ও নিয়মিত যোগাযোগের ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন।
যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হলে ব্যবসায়িক ব্যয় কমবে এবং আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশ সহজ হবে। নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সহযোগিতা শিল্প ও গৃহস্থালিতে সুবিধা দেবে। পূর্বানুমানযোগ্য ভিসাব্যবস্থা শিক্ষার্থী, রোগী, পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের যাতায়াত সহজ করতে পারে। তবে এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতির জন্য দুই পক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন। পানিবণ্টন, বাণিজ্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও ভিসা নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা জরুরি।
তিস্তার পানিবণ্টন বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে সংবেদনশীল। অন্যদিকে, সীমান্তপারের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক ভারসাম্য নিয়ে ভারতের উদ্বেগ রয়েছে। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানও বাংলাদেশে বিতর্কিত বিষয়। এসব প্রশ্ন এড়িয়ে গেলে ভবিষ্যতে সম্পর্ক আবারও সংকটে পড়তে পারে। বাংলাদেশের উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি ভারতের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ নিয়েও সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।
ধর্মীয় সম্প্রীতির বার্তা দিতে তারেক রহমান ২০ অক্টোবর রংপুরের রাধাগোবিন্দ ধর্মসভা মন্দিরে দুর্গাপূজার অনুষ্ঠানে অংশ নেন। তিনি মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান— সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকারের কথা বলেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক অধিকারের আন্দোলনে ঐক্যের কথাও স্মরণ করেন। তবে এই বার্তার কার্যকারিতা নির্ভর করবে সংখ্যালঘুদের সমান নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তা ধারাবাহিকভাবে নিশ্চিত করার ওপর।
শেখ হাসিনার শাসনামলের তুলনায় বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে গেছে। সম্পর্ক পুনর্গঠনের অর্থ পুরনো ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া নয়; বরং বাংলাদেশের পরিবর্তিত বাস্তবতা ও ভারতের বৈধ স্বার্থকে স্বীকৃতি দিয়ে এগোনো। এর জন্য প্রয়োজন বাস্তববাদ, ধৈর্য ও মতপার্থক্যকে শত্রুতায় রূপ নিতে না দেওয়া।
তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর এ প্রক্রিয়া শুরুর সুযোগ তৈরি করেছে। সফর নভেম্বরে হতে পারে, আবার আরও সময়ও লাগতে পারে। দুই সরকার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত এটিকে চূড়ান্ত বলা যাবে না।
দিল্লির কোথাও একটি করমর্দনের অপেক্ষা চলছে। সেই করমর্দন হবে সূচনা, উপসংহার নয়। এর মূল্য নির্ধারিত হবে পরবর্তী পদক্ষেপে— দুই প্রতিবেশী সদিচ্ছাকে চুক্তিতে, মতবিরোধকে সংলাপে এবং ভৌগোলিক নৈকট্যকে সীমান্তের উভয় পাশের মানুষের কল্যাণে কার্যকর সম্পর্কে রূপ দিতে পারে কিনা, তার ভিত্তিতে।
