ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৩ ধারার বিধান অনুযায়ী, তল্লাশি ও জব্দ কার্যক্রমে অন্তত দুজন স্থানীয় সম্মানিত ব্যক্তির উপস্থিতি নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। এ বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ না করে পরিচালিত তল্লাশি ও জব্দ বেআইনি এবং ফৌজদারি বিচারে তা বিবেচনার বাইরে রাখতে হবে বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।
‘রত্না খাতুন বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় দেওয়া রায়ে আদালত এ পর্যবেক্ষণ দেন। একই সঙ্গে মাদক উদ্ধারের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় নিম্ন আদালতের দণ্ডাদেশ বহাল রেখে আপিল খারিজের রায় বাতিল করে আসামি রত্না খাতুনকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট।
বিজ্ঞাপন
অধস্তন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা ফৌজদারি রিভিশন আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল যথাযথ ঘোষণা করে গত ১৭ জুলাই এ রায় দেন হাইকোর্টের বিচারপতি মো. সেলিমের একক বেঞ্চ। ১৪ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি গত ১১ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
আদালতে রিভিশন আবেদনকারীর পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. ইলিয়াস আহমেদ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মঞ্জরুল আলম সুজন।
বিজ্ঞাপন
তল্লাশি ও জব্দে আইনের বিধান মানার নির্দেশ
রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৩ ধারার ১ ও ২ উপধারা অনুযায়ী কোনো স্থানে তল্লাশি পরিচালনা এবং মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বস্তু জব্দ করার ক্ষেত্রে অন্তত দুজন স্থানীয় সম্মানিত ব্যক্তির উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। তল্লাশির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় তাদের উপস্থিতি থাকতে হবে।
আদালত আরও বলেন, স্থানীয় ব্যক্তিরা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগে তল্লাশি ও জব্দের কার্যক্রম সম্পন্ন করা হলে কিংবা তারা ঘটনাস্থল ত্যাগ করার পর এসব কার্যক্রম পরিচালিত হলে আইনের বিধান প্রতিপালিত হয় না। এ বিধান কঠোরভাবে অনুসরণ না করে পরিচালিত তল্লাশি ও জব্দ বেআইনি হিসেবে গণ্য হবে এবং ফৌজদারি বিচারে তা বিবেচনায় নেওয়া যাবে না।
যেভাবে দণ্ডিত হয়েছিলেন রত্না খাতুন
মামলার প্রকাশিত রায় অনুযায়ী, ২০০৮ সালের ২৫ আগস্ট কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা থানার কাছারিপাড়া গ্রামে রত্না খাতুনের বাড়িতে অভিযান চালায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একটি দল। অধিদপ্তরের পরিদর্শক মো. ফারুক সুলতানের নেতৃত্বে পরিচালিত ওই অভিযানে রত্না খাতুনকে আটক করা হয়।
বিজ্ঞাপন
অভিযোগ অনুযায়ী, পরে একজন নারী কনস্টেবলের মাধ্যমে তল্লাশি চালিয়ে তার কাছ থেকে কাগজে মোড়ানো ২৫ পুরিয়া হেরোইন উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার করা হেরোইনের ওজন ছিল আনুমানিক তিন গ্রাম।
এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯০-এর ১৯(১) ধারার সারণি ১(ক) অনুযায়ী মামলা করা হয়। তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দাখিলের পর মামলাটি কুষ্টিয়ার দায়রা আদালতে বিচারের জন্য পাঠানো হয়।
বিজ্ঞাপন
বিচার শেষে কুষ্টিয়ার তৃতীয় আদালতের যুগ্ম দায়রা জজ ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি রত্না খাতুনকে দোষী সাব্যস্ত করে দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেন। অর্থদণ্ড অনাদায়ে তাকে আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়।
এরপর দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিল করেন রত্না খাতুন। ২০১৪ সালের ১৩ এপ্রিল কুষ্টিয়ার দ্বিতীয় অতিরিক্ত দায়রা জজ আপিল খারিজ করে নিম্ন আদালতের দণ্ডাদেশ বহাল রাখেন। পরে ওই দণ্ডাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে ফৌজদারি রিভিশন আবেদন করেন তিনি।
সাক্ষ্য-প্রমাণে অসংগতি খুঁজে পান হাইকোর্ট
হাইকোর্টে আবেদনকারীর আইনজীবী মো. ইলিয়াস আহমেদ যুক্তি দেন, রত্না খাতুনের কাছ থেকে মাদক উদ্ধারের অভিযোগ নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মামলার বাদী নিজেই তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া জব্দতালিকার সাক্ষীরাও আদালতে মাদক উদ্ধারের ঘটনা সমর্থন করেননি।
বিজ্ঞাপন
এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যথাযথভাবে বিবেচনা না করেই বিচারিক আদালত তাকে দণ্ডিত করেছেন এবং আপিল আদালতও সেই দণ্ডাদেশ বহাল রেখেছেন বলে যুক্তি দেন আবেদনকারীর আইনজীবী।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ আখতারুল ইসলাম যুক্তি দেন, বিচারিক আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করেই আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন। আপিল আদালতও যথাযথভাবে সেই সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছেন।
তবে মামলার নথি ও সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট দেখতে পান, অভিযানে অংশ নেওয়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক ফারুক সুলতানই মামলার তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেছেন। তার জবানবন্দি ছাড়া প্রসিকিউশনের অন্য কোনো সাক্ষী মাদক উদ্ধারের ঘটনা সমর্থন করেননি। অধিদপ্তরের সদস্য হিসেবে সাক্ষ্য দেওয়া একজন কনস্টেবলও মাদক উদ্ধারের বিষয়ে কিছু বলেননি।
বিজ্ঞাপন
জব্দতালিকার দুই সাক্ষীর বক্তব্যেও অসংগতি পাওয়া যায়। তাদের একজন জানান, ঘটনাস্থলে পৌঁছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দেখতে পান এবং জব্দতালিকায় স্বাক্ষর করেন। তবে মাদক উদ্ধারের বিষয়ে তার প্রত্যক্ষ কোনো জ্ঞান ছিল না। অপর সাক্ষী জানান, তিনি ভেড়ামারা মোটর শ্রমিক কার্যালয়ে বসে থাকার সময় অধিদপ্তরের সদস্যরা সেখানে গিয়ে তার স্বাক্ষর নেন।
নিম্ন আদালতের রায় বাতিল, আসামি খালাস
এসব বিষয় এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৩ ধারার বিধান বিবেচনায় নিয়ে হাইকোর্ট অভিমত দেন, রিভিশন আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুলের যথেষ্ট সারবত্তা রয়েছে। ফলে রুল যথাযথ ঘোষণা করে তা মঞ্জুর করেন আদালত।
বিজ্ঞাপন
একই সঙ্গে ২০১৪ সালের ১৩ এপ্রিল কুষ্টিয়ার দ্বিতীয় অতিরিক্ত দায়রা জজের দেওয়া আপিল খারিজের রায় বাতিল করেন হাইকোর্ট। ওই রায়ের মাধ্যমে নিম্ন আদালতের দণ্ডাদেশ বহাল রাখা হয়েছিল।
হাইকোর্টের নির্দেশনায় রত্না খাতুনকে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়। পাশাপাশি রায়ের অনুলিপিসহ অধস্তন আদালতের নথিপত্র অবিলম্বে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
এফএইচ/ইএ
ফলো করুন
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।
