পরিবারের অভাব ঘোচানোর স্বপ্ন নিয়ে রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার তরুণ মো. সাগর (২৪)। সেখানে একটি বেকারিতে কাজ করে মাসে আয় করতেন প্রায় ৭০ হাজার টাকা। তবে বেশি উপার্জনের আশায় এক বাংলাদেশি দালালের প্রলোভনে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন তিনি। এরপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিতে গিয়ে প্রাণ হারান সাগর। মৃত্যুর চার-পাঁচ মাস পর এক সহযোদ্ধার ফোনে ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়েছে তাঁর পরিবার। এখন সন্তানের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার অপেক্ষায় দিন কাটছে স্বজনদের।
নিহত সাগর চান্দিনা পৌরসভার ছায়কোট এলাকার বাসিন্দা। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। পরিবারের আর্থিক অনটন দূর করতে একসময় বাবার সবজি ব্যবসায় সহযোগিতা করতেন। কখনো চালাতেন রিকশাভ্যান। অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়েই বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রায় ছয় লাখ টাকা খরচ করে রাশিয়ায় যান সাগর। সেখানে একটি বেকারিতে কাজ করার সময় এক বাংলাদেশি দালালের সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। ওই দালাল তাঁকে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে বেশি অর্থ উপার্জনের প্রলোভন দেখান। পরিবারের পক্ষ থেকে নিষেধ করা হলেও শেষ পর্যন্ত চলতি বছরের মে মাসে যুদ্ধে অংশ নিতে যান সাগর।
এরপর থেকে পরিবারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ চার-পাঁচ মাস ছেলের কোনো খোঁজ না পেয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটছিল স্বজনদের। অবশেষে গত শনিবার এক সহযোদ্ধার ফোনে সাগরের মৃত্যুর খবর পান তাঁরা। তবে কী পরিস্থিতিতে তাঁর মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো পরিবারের কাছে নেই।
সাগরের মৃত্যুর খবরে পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। অসুস্থ বাবা-মা ছেলের মৃত্যুসংবাদে ভেঙে পড়েছেন। ধারদেনা করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন তাঁরা। আশা ছিল, ছেলে উপার্জন করে পরিবারের অভাব দূর করবেন, ফিরিয়ে আনবেন সচ্ছলতা। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন গভীর শোকে পরিণত হয়েছে।
সাগরের বাবা কবির হোসেন ও মা দেলোয়ারা বেগম ছেলের মৃত্যুর খবরে দিশেহারা। পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীরাও এ ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন। তাঁদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিয়ে সাগরের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করবে।
এদিকে, কীভাবে সাগর রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেন, কোন বাংলাদেশি দালালের মাধ্যমে যুদ্ধে গেলেন এবং তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা পরিবারের কাছে। একই সঙ্গে ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সম্পর্কেও স্পষ্ট কোনো তথ্য পাননি তাঁরা।
এ বিষয়ে চান্দিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল হক জানান, সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি জানার পর তিনি খোঁজখবর নিচ্ছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা চাওয়া হলে প্রয়োজনীয় সহায়তা করা হবে।
পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে যাওয়া সাগরের জীবন থেমে গেছে যুদ্ধের ময়দানে। অন্তত পরিবারের কাছে আসা খবর তেমনটাই বলছে। এখন সন্তান হারানোর শোকের পাশাপাশি তার মরদেহ ফিরে পাওয়ার অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে স্বজনদের। তাঁদের একটাই চাওয়া, শেষবারের মতো যেন প্রিয় সন্তানের মুখ দেখতে পারেন।
যে আই
