যেখানে শেষ হয় সব ক্লান্তি, সেখানেই মা।
আজ বিশ্ব মা দিবস। পৃথিবীর সব ভাষা, সব সংস্কৃতি, সব সভ্যতার ভেতর একটি শব্দ সবচেয়ে কোমল, সবচেয়ে নিরাপদ, সবচেয়ে নির্ভরতার— “মা”। মানুষের জীবনের প্রথম ডাক, প্রথম স্পর্শ, প্রথম আশ্রয়, প্রথম বিদ্যালয়, সবকিছুর কেন্দ্রেই থাকেন মা।
সন্তান পৃথিবীতে আসার আগেই একজন মা তার জন্য স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। নিজের শরীরের ভেতর আরেকটি প্রাণকে ধারণ করে তিনি ধীরে ধীরে বদলে যান। তার ঘুম কমে যায়, কষ্ট বাড়ে, তবুও মুখে ফুটে থাকে অদ্ভুত এক শান্তি। কারণ মাতৃত্বের আনন্দ পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর অনুভূতিগুলোর একটি।
বিশ্ব মা দিবস শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন। প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার বিশ্বের বহু দেশে দিবসটি পালিত হয়। আধুনিক মা দিবস পালনের প্রচলন শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রে। সমাজকর্মী আনা জার্ভিস তাঁর মায়ের স্মৃতিকে সম্মান জানাতে এই দিবস পালনের উদ্যোগ নেন। পরে ধীরে ধীরে তা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।
তবে বাঙালি সংস্কৃতিতে মাকে ভালোবাসার জন্য আলাদা দিনের প্রয়োজন কখনো ছিল না। আমাদের লোকগান, কবিতা, ছড়া, গল্প, সর্বত্র মায়ের উপস্থিতি। সন্তানের মুখে ভাত তুলে দেওয়া ক্লান্ত হাত, জ্বরের রাতে নির্ঘুম চোখ, পরীক্ষার আগে নিঃশব্দ দোয়া, কিংবা দূরে থাকা সন্তানের জন্য অপেক্ষার জানালা, সবখানেই এক অনন্ত মমতার নাম মা।
ইসলামও মায়ের মর্যাদাকে সর্বোচ্চ সম্মানের আসনে বসিয়েছে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন,
“তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন, তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো।” — (সুরা আল-ইসরা : ২৩)
অন্য এক আয়াতে এসেছে,
“আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে গর্ভে ধারণ করেছেন।” — (সুরা লোকমান : ১৪)
হাদিসে প্রিয় নবি মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন,
“জান্নাত মায়ের পদতলে।”
হজরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্নিত, এক সাহাবি যখন জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমার উত্তম সঙ্গ পাওয়ার সবচেয়ে বেশি অধিকারী কে? তখন নবীজি (সা.) তিনবার বলেছিলেন, “তোমার মা”, এরপর বলেছিলেন “তোমার বাবা”।
এই শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয় মায়ের প্রতি ভালোবাসা শুধু আবেগ নয়, এটি ইবাদতেরও অংশ। একজন মায়ের সন্তুষ্টির মধ্যেই সন্তানের কল্যাণ লুকিয়ে থাকে।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন—
“বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।”
এই সৃষ্টির সবচেয়ে উজ্জ্বল রূপটি দেখা যায় একজন মায়ের ভেতর। একজন মা শুধু সন্তান জন্ম দেন না, তিনি একটি মানুষ গড়ে তোলেন, একটি পরিবার আগলে রাখেন, একটি সমাজকে মানবিক করে তোলেন।
আজকের ব্যস্ত পৃথিবীতে অনেক মা নিঃসঙ্গ। বৃদ্ধাশ্রমের জানালায় বসে কেউ সন্তানের অপেক্ষা করেন, কেউ মোবাইলের স্ক্রিনে একটি ফোনকল খোঁজেন, কেউবা সন্তানের সাফল্যের খবর শুনেই নিজের সব কষ্ট ভুলে যান। অথচ শৈশবে এই মানুষটিই সন্তানের কান্নায় সারারাত জেগে থাকতেন।
মা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মাকে শুধু ভালোবাসলেই হয় না, সেই ভালোবাসা প্রকাশও করতে হয়। একটি ফোনকল, একটি আলিঙ্গন, একসাথে কিছু সময়, কিংবা শুধু “মা, তুমি কেমন আছো?” এই সামান্য শব্দগুলোও একজন মায়ের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় উপহার হতে পারে।
যাদের মা আজ পৃথিবীতে নেই, তাদের কাছে মা দিবস এক নীরব হাহাকার। তবু স্মৃতির ভেতর মায়ের কণ্ঠ বেঁচে থাকে, বেঁচে থাকে তার শেখানো আদর্শ, তার মমতা, তার দোয়া। মানুষ বড় হলেও মায়ের কাছে সে চিরকাল সন্তানই থেকে যায়।
আজ বিশ্ব মা দিবসে পৃথিবীর সব মায়ের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
যে মায়েরা সন্তানকে মানুষ করতে নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দেন,
যে মায়েরা প্রতিদিন নীরবে যুদ্ধ করেন সংসারের জন্য,
যে মায়েরা দূরে থেকেও সন্তানের সুখে হাসেন,
তাদের সবার জন্য রইল অফুরন্ত ভালোবাসা।
মা আসলে কোনো একটি শব্দ নয়,
মা মানে আশ্রয়,
মা মানে প্রার্থনা,
মা মানে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ ঠিকানা।
