একদিন এক ক্ষুধার্ত সিংহ শিকারের খোঁজে বের হলো। সকাল থেকে বনের এদিক-ওদিক ঘুরেও সে কোনো শিকার পেল না। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল। ক্ষুধায় তার পেট তখন এমনভাবে গুড়গুড় করছে, মনে হচ্ছে ভেতরে বুঝি মেঘ ডাকছে!
ক্লান্ত সিংহ একটা বড় গাছের নিচে বসে হাঁপাচ্ছিল। ঠিক তখনই ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে সামনে এসে পড়ল এক ছোট্ট শেয়াল। শেয়ালকে দেখেই সিংহের চোখ চকচক করে উঠল। জিভে জল এসে গেল।
সিংহ গম্ভীর গলায় বলল, বাহ! আজ তাহলে ভাগ্য ভালোই। তোকে দিয়েই ক্ষুধা মেটাব।
শেয়ালের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। সে বলল, শেষ! আজ বুঝি আমার গল্পও শেষ!
এই বিশাল সিংহের সঙ্গে লড়াই করে জেতার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। দৌড়ে পালানোরও উপায় নেই। সিংহের এক লাফে যেখানে বেশ খানিকটা পথ পেরোনো যায়, সেখানে শেয়াল দৌড়ে কতটুকুই বা পালাবে? তাই শক্তি দিয়ে নয়, এবার বুদ্ধি দিয়েই বাঁচতে হবে।
শেয়াল মনে মনে ভয়ে কাঁপছিল। কিন্তু বাইরে তার কোনো লক্ষণ নেই। বরং বুকটা যতটা সম্ভব ফুলিয়ে সে সিংহের দিকে তাকাল। তারপর গম্ভীর গলায় বলল, আমাকে খাবি? তোর এত বড় সাহস!
সিংহ থমকে গেল, কী বললি?
শেয়াল চোখ কুঁচকে বলল, বললাম, আমাকে খাবি? তুই জানিস না আমি কে?
সিংহ অবাক হয়ে বলল, তুই কে?
শেয়াল গলা আরও ভারী করে বলল, আমি এই বনের রাজা!
সিংহ কয়েক মুহূর্ত শেয়ালের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হো-হো করে হেসে উঠল।
— তুই? বনের রাজা? শেয়াল আবার বনের রাজা হয় নাকি?
শেয়াল মনে মনে বলল, হাস যত খুশি। শুধু আমাকে খেয়ে ফেলিস না! কিন্তু মুখে বলল, বিশ্বাস হচ্ছে না?
— না!
— তাহলে আমার সঙ্গে চল। নিজেই দেখবি, আমাকে দেখামাত্র সবাই কীভাবে ভয়ে পালায়।
সিংহের অবশ্য কথাটা বিশ্বাস হলো না। কিন্তু সারা দিন শিকার না পেয়ে তার মাথাটাও যেন একটু গরম ছিল। সে ভাবল, ব্যাপারটা একটু দেখে আসাই যাক।
— ঠিক আছে। চল।
শেয়াল সামনে, সিংহ পেছনে। দুজন হাঁটতে লাগল।
কিছুদূর যেতেই দেখা গেল, কয়েকটা বানর গাছের ডালে বসে গল্প করছে। শেয়াল আর সিংহকে আসতে দেখেই বানরগুলো হইচই করে এদিক-ওদিক লাফিয়ে পালিয়ে গেল।
শেয়াল সঙ্গে সঙ্গে ঘাড় ঘুরিয়ে সিংহের দিকে তাকাল, দেখলি তো?
সিংহ একটু অবাক হয়ে বলল, হুম…দেখলাম বটে।
তবে মনে মনে সে বলল, হতেই পারে কাকতালীয় ব্যাপার।
আরও কিছুদূর এগিয়ে তারা একটা খোলা মাঠে পৌঁছাল। সেখানে একদল হরিণ নিশ্চিন্তে ঘাস খাচ্ছিল। শেয়াল আর সিংহকে দেখামাত্র হরিণগুলো কান খাড়া করল। তারপর মুহূর্তের মধ্যে ছুটে পালাল।
শেয়াল এবার আরও জোরে বুক ফুলিয়ে বলল, এবারও দেখলি তো?
সিংহ চুপ করে রইল। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। মনে মনে ভাবছে, দুটো দলই পালাল!
এবার তার মনে হলো, ব্যাপারটা বোধহয় নেহাত কাকতালীয় নয়। শেয়ালটির মধ্যে সত্যিই কিছু একটা আছে!
হাঁটতে হাঁটতে তারা বনের আরও ভেতরে গেল। হঠাৎ সামনে পড়ল কয়েকটা শেয়াল।
তারা এমন দৌড় দিল যে মুহূর্তের মধ্যে তাদের আর দেখা গেল না। সিংহের চোখ কপালে উঠল, এ কী! নিজের জাতভাই শেয়ালরাও যখন এই শেয়ালটাকে দেখে পালাচ্ছে, তখন নিশ্চয়ই সে সাধারণ কোনো শেয়াল নয়!
সিংহের বুকের ভেতর ধকধক করতে লাগল। সে ধীরে ধীরে শেয়ালের সামনে গিয়ে মাথা নিচু করল, রাজামশাই, আমাকে ক্ষমা করে দিন। আপনাকে চিনতে পারিনি।
শেয়াল মুখটা যতটা সম্ভব গম্ভীর রেখে বলল, ঠিক আছে। ভুল তো হতেই পারে।
যদিও ভেতরে তখন তার অবস্থা অন্য রকম। ভাবছে, বেঁচে গেছি! বেঁচে গেছি!
সিংহ আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। লেজ গুটিয়ে দ্রুত অন্য শিকারের খোঁজে চলে গেল।
সিংহ চোখের আড়াল হতেই শেয়াল হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। তারপর নিজের বুকের দিকে তাকিয়ে দেখল, এতক্ষণ বুক ফুলিয়ে রাখতে রাখতে সত্যিই ব্যথা হয়ে গেছে!
চারদিকে তাকিয়ে সে মুচকি হেসে বলল, বোকা সিংহ! ওরা আমার ভয়ে পালায়নি রে, পালিয়েছে তোকে দেখেই!
