অরণ্য থেকে প্রাচীন সৌধ— ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী নিদর্শনের তালিকায় ভারতের অসংখ্য জায়গাই অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সেই তালিকায় ভবিষ্যতে জুড়তে পারে আরও তিনটি স্থান। ইউনেস্কোর সম্ভাব্য বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় প্রাকৃতিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক ক্ষেত্র মিলিয়ে সম্প্রতি ভারতের তিনটি জায়গার নাম স্বীকৃত হয়েছে। সেখানে যেমন রয়েছে সমুদ্রবেষ্টিত আগ্নেয়গিরি, তেমনই আছে শতাব্দীপ্রাচীন এক সমৃদ্ধ সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ। কোথায় সেই স্থান, কী ভাবে যাবেন?
১. বারাটাঙের চুনাপাথরের গুহা এবং আগ্নেয়গিরি (আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ)
মাড ভলক্যানো, লাভার পরিবর্তে মাটি, জল ও ভূগর্ভস্থ গ্যাস বার হয়ে আসে। ছবি:সংগৃহীত।
আন্দামান মানেই নীল জলরাশি আর সমুদ্রসৈকত, তবে বারাটাঙের রূপ সম্পূর্ণ আলাদা। ম্যানগ্রোভের খাঁড়ি, চুনাপাথরের গুহা বারাটাংকে পৃথক করেছে অন্য স্থানগুলির থেকে। এখানেই রয়েছে মাড ভলক্যানো, যেখান থেকে লাভার পরিবর্তে মাটি, জল ও ভূগর্ভস্থ গ্যাস বার হয়ে আসে। ভারত মহাসাগরের টেকটনিক প্লেটের নড়াচড়ার কারণে এই আগ্নেয়গিরি তৈরি হয়েছে। ২০২৫ সালেও এখানে নতুন করে ভূগর্ভস্থ আলোড়ন ও কাদার উদ্গীরণ দেখা গিয়েছে।
অন্য দিকে, হাজার হাজার বছর ধরে বৃষ্টির জলের সঙ্গে বিক্রিয়ায় অদ্ভুত সব আকৃতি তৈরি হয়েছে এখানকার চুনাপাথরের গুহায়। চুনাপাথর এবং জলের বিক্রিয়ায় তৈরি হয় ক্যালশিয়াম কার্বোনেট। গুহায় জমাট বাঁধা ক্যালশিয়াম কার্বনেট নানা আকৃতির সৃষ্টি করেছে। ক্যালশিয়াম কার্বোনেট জমে যদি গুহার উপর থেকে ঝুলতে থাকে, তাকে বলা হয় স্ট্যালাকটাইট। গুহার ছাদ থেকে জল চুঁইয়ে পড়ে মেঝে থেকে স্তম্ভ তৈরি হলে তাকে বলা হয় স্ট্যালাগমাইট। এই দুইয়ের সম্মিলনে বারাটাঙের গুহা প্রকৃতির এক অনন্য সৃষ্টি।
কী ভাবে যাবেন?
জাহাজে বা বিমানে প্রথমে পোর্টব্লেয়ার পৌঁছোতে হবে। বারাটাং যেতে গেলে আন্দামান ট্রাঙ্ক রোড ধরতে হয়। সে জন্য বিশেষ অনুমতি লাগে। তার পর খাঁড়িপথে যেতে হয়। পোর্টব্লেয়ার থেকে জলপথেও যাওয়া যায়।
২. আন্দামানের আগ্নেয় দ্বীপপুঞ্জ
ব্যারেন দ্বীপে রয়েছে ভারতের একমাত্র সক্রিয় আগ্নেয়গিরি। ছবি:সংগৃহীত।
ভারতের একমাত্র সক্রিয় আগ্নেয়গিরি রয়েছে ব্যারেন দ্বীপে। বার বার লাভা উদ্গীরণের ফলে এটি তৈরি হয়েছে। ১৭৮৭ সাল থেকে এখানে অগ্ন্যুৎপাত হয় বলে জানা যায়।
সমুদ্রের বুকে ঘন অরণ্যে ঘেরা আর এক আগ্নেয় দ্বীপ নারকোন্ডাম। গোটা বিশ্বের মধ্যে এখানেই বিরল ‘নারকোন্ডাম ধনেশ’ পাখি দেখা যায়। পরিবেশ রক্ষার তাগিদে এখানে সাধারণ পর্যটকদের প্রবেশে কড়া বিধিনিষেধ রয়েছে। আগ্নেয়গিরি দেখার ছাড়পত্র সহজে মেলে না। ব্যারেন দ্বীপে নামাও যায় না। বিশেষ অনুমতি নিয়ে গেলে এবং সি-প্লেন ভাড়া করলে, উপর থেকে তা দেখার সুযোগ মেলে।
৩. সিরপুর সাংস্কৃতিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক ক্ষেত্র (ছত্তীসগঢ়)
সিরপুর (শ্রীপুর) ছিল পঞ্চম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ের এক জনপদ। ছবি:সংগৃহীত।
ছত্তীসগঢ়ের মহাসমুন্দ জেলায় মহানদীর তীরে সিরপুর (শ্রীপুর) ছিল পঞ্চম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ের এক জনপদ।
সিরপুর ছিল দক্ষিণ কোশলের রাজধানী। শরভপুরীয়, পাণ্ডুবংশী এবং সোমবংশী রাজাদের আমলে এটি মধ্য ভারত ও পূর্ব ভারতের একটি প্রধান রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হয়ে ওঠে। বিখ্যাত চিনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ সপ্তম শতাব্দীতে এখানে এসেছিলেন এবং তাঁর লেখায় এখানকার সমৃদ্ধ বৌদ্ধ ঐতিহ্যের কথা উল্লেখ করেছিলেন। এই জায়গার বিশেষত্ব হল, এখানে একই সঙ্গে হিন্দু মন্দির, বৌদ্ধ মঠ ও বিহার এবং জৈন স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়, যা প্রাচীন ভারতের ধর্মীয় এবং সাম্প্রদায়িক মেলবন্ধনের প্রমাণ। সিরপুরের অন্যতম প্রধান নিদর্শন হল লাল ইটের তৈরি বিখ্যাত ‘লক্ষ্মণ মন্দির’। মন্দিরের স্থাপত্যরীতি এবং দরজার সূক্ষ্ম পাথুরে খোদাইকার্য প্রাচীন ভারতীয় শিল্পকলার এক অনন্য রূপ।
কেবল ধর্মীয় স্থাপত্যই নয়, খননকার্যের ফলে এখানে প্রাচীন বাজার, বসতবাড়ি এবং কুটিরশিল্পের নিদর্শনের খোঁজও মিলেছে।
সিরপুর শুধু একটি প্রত্নতাত্তিক ক্ষেত্র নয়, ধর্মীয় ঐক্য, শিল্পকলা, এবং উন্নত নগর সভ্যতার দলিল। এই সমস্ত অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণেই এটি ইউনেস্কোর সম্ভাব্য বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে।
কী ভাবে যাবেন?
রায়পুর জংশন রেলস্টেশন বা রায়পুর বিমানবন্দর থেকে গাড়ি ভাড়া করে পৌঁছোনো সুবিধাজনক। সিরপুর যাওয়ার বাসও পাওয়া যায়।
