সিলেট, ২৫ অক্টোবর: ‘আমার মৃত্যুর জন্য শিল্পী রানী মোদক দায়ী থাকবেন’ এবং ‘আই রিজাইন ফ্রম অ্যাডমিন ক্যাডার’ শিরোনামে পরপর দুটি ফেসবুক পোস্ট দিয়ে আলোচনায় এসেছেন সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আরিফুর রহমান শান্ত। পোস্ট প্রকাশের পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তাকে ঢাকার একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) মধ্যরাতে ‘AC Land Jamalganj’ নামের ফেসবুক পেজে পোস্ট দুটি প্রকাশ করা হয়। এরপর সেগুলো মুছে ফেলা হয়। ঘটনার পর জামালগঞ্জ থানার পুলিশ, উপজেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকরা এসিল্যান্ডের বাসায় যান। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় তাকে প্রথমে সিলেটে এবং পরে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শিল্পী রানী মোদক জানান, পোস্ট প্রকাশের পর প্রথমে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার কথা বলা হয়েছিল। পরে তিনি জানতে পারেন, এসিল্যান্ডের স্ত্রী পোস্ট দুটি মুছে দিয়েছেন। তিনি বলেন, বিষয়টি রাতেই জেলা প্রশাসককে জানানো হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, পোস্ট প্রকাশের পর জামালগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বন্দে আলী পুলিশ নিয়ে এসিল্যান্ডের বাসায় যান। সেখানে ভীমখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আখতারুজ্জামান ও স্থানীয় সাংবাদিক ওয়ালী উল্লাহ সরকারসহ কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন।
এসিল্যান্ডের স্ত্রী তার স্বামী অসুস্থ বলে জানান। পরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে একজন চিকিৎসক গিয়ে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, তাকে ঘুমের ওষুধ দেওয়া হলেও পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় রাতেই তাকে সিলেটে নেওয়া হয়। সেখানে প্রথমে একটি বেসরকারি হাসপাতালে এবং পরে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় তাকে। চিকিৎসকেরা পরে তাকে ঢাকায় স্থানান্তর করেন। বর্তমানে তিনি রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
ইউএনও শিল্পী রানী মোদক বলেন, এসিল্যান্ড তার স্ত্রীকে নিয়ে তার মেয়ের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। কেক কাটার পর থেকেই তিনি অস্বাভাবিক আচরণ করতে থাকেন। তিনি অভিযোগ করেন, এ সময় এসিল্যান্ড ইউএনওর নিরাপত্তায় নিয়োজিত আনসার সদস্যদের গায়ে হাত তোলেন।
শিল্পী রানী মোদক আরও জানান, এসিল্যান্ডের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে তিনি জানতে পারেন, তাকে নিয়মিত দুটি ঘুমের ইনজেকশন দিতে হয়। তবে জামালগঞ্জের কোনো ফার্মেসিতে সেগুলো পাওয়া যাচ্ছিল না। এসিল্যান্ডের স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ে তার উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়। পরে তিনি পুলিশ ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তাকে (আরএমও) ফোন করেন। তাদের সহায়তায় এসিল্যান্ডকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।
ইউএনওর ভাষ্য, এসিল্যান্ডের পরিবারের সদস্যরা তাকে মানসিকভাবে অসুস্থ বলে জানিয়েছেন। তাকে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রায় দুই মাস ধরে জামালগঞ্জে দায়িত্ব পালন করছেন আরিফুর রহমান শান্ত। শুক্রবার ইউএনও শিল্পী রাণী মোদকের মেয়ের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পর থেকেই তিনি অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করেন। এ সময় ইউএনওর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যদের মারধর, বাসায় গিয়ে গ্লাস ভাঙচুর এবং শিশুদের গায়ে হাত তোলার অভিযোগ ওঠে।
স্থানীয় সাংবাদিক ওয়ালী উল্লাহ সরকার জানান, শনিবার রাতে এসিল্যান্ডের আচরণ দেখে তার অসুস্থ মনে হয়েছে। তিনি দাবি করেন, এসিল্যান্ড সামনে যাকে পেয়েছেন, তার সঙ্গেই খারাপ আচরণ করেছেন। এসিল্যান্ডের স্ত্রী তাকে ইনজেকশন দিলে স্বাভাবিক হয়ে যাবেন বলে জানিয়েছিলেন। তবে জামালগঞ্জে সেই ইনজেকশন পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।
ভীমখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আখতারুজ্জামান বলেন, ওসি ও ইউএনওর উপস্থিতিতে এসিল্যান্ডের স্ত্রী তার স্বামী অসুস্থ বলে জানিয়েছিলেন। মাঝেমধ্যে তার এমন আচরণ হয় বলেও স্ত্রী জানিয়েছেন। নিয়মিত ব্যবহারের ইনজেকশন না পাওয়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে তাদের ধারণা।
তিনি আরও বলেন, এসিল্যান্ডের সঙ্গে তার নিয়মিত দেখা হতো। কিন্তু ওই রাতে এসিল্যান্ড তাকে চিনতে পারেননি। পরিচয় জানতে চেয়েছেন এবং জমিজমাসংক্রান্ত কোনো সমস্যা থাকলে সমাধান করে দেওয়ার কথা বলেছেন।
জামালগঞ্জ থানার ওসি মো. বন্দে আলী বলেন, ইউএনওর ফোন পেয়ে তিনি পুলিশ নিয়ে এসিল্যান্ডের বাসায় যান। তার স্ত্রীর কথামতো ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তাতে কাজ হয়নি। পরে ইনজেকশনের কথা জানানো হলে জামালগঞ্জে তা পাওয়া যায়নি। এরপর রাত একটার পর এসিল্যান্ডকে সিলেটে পাঠানো হয়।

