বলিউড অভিনেতা টাইগার শ্রফের গাড়িতে রোববার (১৮ অক্টোবর) সন্ধ্যায় মুম্বাইয়ে অজ্ঞাতপরিচয় হামলাকারীরা গুলি চালিয়েছেন। মুম্বাই পুলিশের মতে, এ ঘটনায় দুজন আহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে টাইগার শ্রফের চালক ফিরদৌসও রয়েছেন। তার বাঁ হাতে গুলি লেগেছে।
গত কয়েক বছরে বলিউডের একাধিক তারকার ওপর প্রাণঘাতী হামলার চেষ্টা হয়েছে ও টাইগার শ্রফের ওপর হওয়া এ হামলা আবারও এমন ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিজ্ঞাপন
সাম্প্রতিক সময়ে চলচ্চিত্র জগতের যেসব শিল্পী হামলার শিকার হয়েছেন বা হামলাকারীদের নিশানায় ছিলেন, তাদের মধ্যে অভিনেতা সালমান খান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাছাড়া পরিচালক রোহিত শেট্টি, অভিনেত্রী দিশা পাটানি ও এনসিপি নেতা বাবা সিদ্দিকীও রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
আগের বেশ কয়েকটি হামলার ঘটনার মত টাইগার শ্রফের ঘটনায়ও উঠে এসেছে লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের নাম।
কিন্তু কারা এই লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাং? কেনই বা তারা বলিউড সেলিব্রিটিদের ওপর হামলার চেষ্টা করছেন?
লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাং কারা ও তারা কী চান?
বিজ্ঞাপন
লরেন্স বিষ্ণোই নামক এক ব্যক্তি ২০১৮ সালে বলিউড অভিনেতা সালমান খানকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছিলেন। মুম্বাই পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, তার অনুসারী শুটাররা মুম্বাইয়ে সালমান খানের বাড়ির বাইরে গুলি ছুঁড়েছিলেন। ওই ঘটনায় তিনজন শুটারকে সেসময় গ্রেফতারও করা হয়েছিল।
সেসময় রাজস্থানের যোধপুর শহরে আদালতে হাজিরার জন্য জেলে আনা হলে লরেন্স বিষ্ণোই সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, সালমান খানকে যোধপুরেই হত্যা করা হবে। তখন তিনি আমাদের প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে জানতে পারবেন।
বিজ্ঞাপন
প্রায় তিন দশক আগে ১৯৯৮ সালে বিরল প্রজাতির কৃষ্ণসার হরিণ শিকারের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন বলিউড সুপারস্টার সালমান খান, তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছিল। রাজস্থানের পশ্চিমাঞ্চলে একটি চলচ্চিত্রের শুটিংয়ের সময় সালমান খান সংরক্ষিত প্রজাতির দুটি কৃষ্ণসার হরিণ হত্যা করেছিলেন।
ওই চলচ্চিত্রে তার সঙ্গে অভিনয় করা ও একই অপরাধে অভিযুক্ত অন্য চারজন অভিনেতাকে আদালত খালাস দিয়েছিলেন।
বিষ্ণোই সম্প্রদায় কৃষ্ণসার হরিণকে পবিত্র বলে মানে ও লরেন্স বিষ্ণোই সালমান খানের সঙ্গে তার শত্রুতার কারণ হিসেবেও এ বিষয়টি উল্লেখ করেছিলেন। কৃষ্ণসার হরিণ শিকারের মামলায় সামনে আসার পর থেকেই সালমান খানকে হুমকি দিয়ে আসছে এ গ্যাং।
বিজ্ঞাপন
এনসিপি নেতা বাবা সিদ্দিকী সালমান খানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তার হত্যাকাণ্ডের পর সামাজিক মাধ্যমে করা এক পোস্টে দাবি করা হয় যে ওই ঘটনায় লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাং জড়িত ছিল।
কনভেন্ট স্কুলে পড়াশোনা করে পরে চণ্ডীগড়ের ডিএভি কলেজ থেকে স্নাতক হওয়ার সময় ছাত্ররাজনীতিতে আসা লরেন্স বিষ্ণোই শুধু ভারতেই নয়, বরং আমেরিকা ও কানাডাতেও আলোচিত অপরাধীদের একজন।
বর্তমানে গুজরাট উপকূল থেকে মাদক পাচার চক্র পরিচালনার মামলায় লরেন্স বিষ্ণোই সাবরমতী জেলে বন্দি রয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
আন্ততর্জাতিক অপরাধেও জড়িয়ে লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাং
চলতি বছরের জুলাই মাসে, মার্কিন প্রসিকিউটররা যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপ থেকে ২৪ জন সন্দেহভাজনকে গ্রেফতারের ঘোষণা করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে ভারতের সঙ্গে যুক্ত তিনটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংও রয়েছে। এ অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন হার্ড বল’।
বিজ্ঞাপন
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়ায় একটি গুরুদ্বারার বাইরে শিখ নেতা হরদীপ সিং নিজ্জরকে হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগও রয়েছে।
লস অ্যাঞ্জেলেসের ফেডারেল প্রসিকিউটররা জানিয়েছেন, এসব গ্রেফতার কয়েক বছর ধরে চলা তদন্তের ফল। এই তদন্ত ভারতীয় অপরাধী চক্রগুলোকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়েছিল। ওই চক্রগুলোর বিরুদ্ধে টার্গেটেড হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজি ও মাদক পাচারের অভিযোগ রয়েছে।
১৯৯৭ সালে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি প্রত্যর্পণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ভারতীয় দূতাবাসের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, এ চুক্তির অধীনে যে অপরাধের অভিযোগে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশের আইন অনুযায়ী অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে হবে ও সেই অপরাধের জন্য অন্তত এক বছরের কারাদণ্ডের বিধান থাকতে হবে।
প্রত্যর্পণের আবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক মাধ্যমে পাঠানো হয়। এই চুক্তির অধীনে কাউকে প্রত্যর্পণের জন্য কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম নির্ধারিত আছে।
মার্কিন ফেডারেল প্রসিকিউটর ও ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) তাদের ‘অপারেশন হার্ড বল’ এর আওতায় বিশ্বজুড়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগপত্র দাখিল করেছে।
এই অভিযান যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলির একটি বৃহৎ যৌথ উদ্যোগ। এই অভিযোগপত্রগুলিতে ‘খালিস্তানপন্থি’ এক কর্মীর হত্যার ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যাকে আদালতের নথিতে হরদীপ সিং নিজ্জর হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তিনি কানাডায় বসবাস করতেন।
হত্যাকাণ্ডের এ মামলায় লরেন্স বিষ্ণোই ও আরেক গ্যাংস্টার গোল্ডি ব্রারের বিরুদ্ধে হত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। ২০২৩ সালের ১৮ই জুন ব্রিটিশ কলম্বিয়ার সারে শহরে একটি গুরুদুয়ারা থেকে বেরিয়ে আসার সময় দুই বন্দুকধারী গুলি করে হরদীপ সিং নিজ্জরকে হত্যা করে।
লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের টার্গেটে যে বলিউড তারকারা
গত কয়েক বছরে বলিউডের সঙ্গে যুক্ত একাধিক তারকার ওপর প্রাণঘাতী হামলার চেষ্টা হয়েছে। এর মধ্যে সব লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত না থাকলেও সালমান খানের ঘনিষ্ঠদের উপর আক্রমণে বার বার এ গ্যাংয়ের নাম উঠে আসে।
চলচ্চিত্র নির্মাতা রোহিত শেট্টির মুম্বইয়ের জুহুতে অবস্থিত বাড়িতে ২০২৬ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি ভোরের দিকে গুলিচালনার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় নাম জড়িয়েছিল আমোল বিষ্ণোইয়ের, যিনি সম্পর্কে লরেন্স বিষ্ণোইয়ের ভাই।
মুম্বাই পুলিশের অভিযোগপত্রে রোহিত শেট্টির বাড়িতে বন্দুকধারীদের পাঠানোর পেছনে আমোল বিষ্ণোইয়ের যোগসাজশ আছে বলে অভিযোগ করা হয়েছিল। আমোল বিষ্ণোই ওই বন্দুকধারীর সঙ্গে তার কথোপকথনের ঘটনা স্বীকারও করেছিলেন।
আরো যে তারকারা হামলার শিকার হয়ছেন
দিশা পাটানি
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে উত্তর প্রদেশের বারেলিতে অভিনেত্রী দিশা পাটানির বাবা জগদীশ পাটানির পৈতৃক বাড়ির বাইরে অজ্ঞাত বন্দুকধারীরা গুলি চালায়। সামাজিক মাধ্যমে গোল্ডি ব্রার ও রোহিত গোদারা গ্যাং ওই হামলার দায় স্বীকার করেছিল।
সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, আধ্যাত্মিক গুরুদের সম্পর্কে দিশার বোন খুশবু পাটানির কথিত কিছু মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে এই গুলিবর্ষণকে গ্যাংটি একটি সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করেছিল। ঘটনার সঙ্গে জড়িত দুই হামলাকারী পরে গাজিয়াবাদে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয়।
রাকেশ রোশন
অভিনেতা হৃতিক রোশনের বাবা চলচ্চিত্র নির্মাতা রাকেশ রোশন ২০০০ সালের ২১শে জানুয়ারি একটি হামলা থেকে অল্পের জন্য বেঁচে যান। সেদিন মুম্বাইয়ে তার অফিসের বাইরে দুই অজ্ঞাত বন্দুকধারী তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। তার হাত ও বুকে গুলি লেগেছিল, তবে তিনি ওই হামলা থেকে প্রাণে বেঁচে যান।
ঘটনাটি ঘটে তার ছেলে হৃতিক রোশনের প্রথম ছবি ‘কাহো না পিয়ার হ্যায়’-এর সাফল্যের পর। জানা যায়, চাঁদাবাজির টাকা দিতে অস্বীকার করায় রাকেশ রোশনকে নিশানা করা হয়েছিল।
বিবিসির এক সাক্ষাৎকারে করণ থাপারের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে হৃতিক সেই মানসিক আঘাতের স্মৃতি তুলে ধরেন, যখন তার প্রথম ছবি নিয়ে চারদিকে আলোচনা চলার মধ্যেই তিনি তার বাবার ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনার খবর পান।
হৃতিক বলেন, বাবার বুকে এবং হাতে গুলি লেগেছিল। আমার মনে আছে, তিনি আমাকে ফোন করেছিলেন, কারণ তিনি চিন্তিত ছিলেন আমি ঠিক আছি কি না।
তিনি জানান, তার বাবার আশঙ্কা ছিল যে পরিবারের অন্য সদস্যরাও বিপদের মুখে পড়তে পারেন।
রাজীব রাই
‘গুপ্ত’ সহ বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র পরিচালনার জন্য পরিচিত চলচ্চিত্র নির্মাতা রাজীব রাই ১৯৯৭ সালে এক বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন, যখন আবু সালেম গ্যাংয়ের সঙ্গে কথিতভাবে যুক্ত পাঁচজন হামলাকারী মধ্য মুম্বাইয়ে তার ওপর আক্রমণ চালায়।
রাজীব রায় তার অফিস থেকে বেরিয়ে আসার সময় হামলাকারীরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এর আগে পাওয়া হুমকির কারণে পুলিশের পক্ষ থেকে তার নিরাপত্তার জন্য দেহরক্ষী নিয়োগ করা হয়েছিল।
এই দেহরক্ষীরা সামনে এসে হামলাকারীদের মোকাবিলা করেন ও তাদের তাড়িয়ে দিতে সক্ষম হন। জানা যায়, ওই ঘটনায় একজন হামলাকারী আহত হয়েছিলেন।
সূত্র: বিবিসি
এসএএইচ
ফলো করুন
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।
