সাতক্ষীরা প্রতিনিধি।।
গরু দিয়ে ধান মাড়াইয়ের সময় মুখের সামনে পরানো বাঁশের বা গোলপাতার ‘ঠুসি’, উঠোনে রাখা কাঠের পালকি, ঢেঁকি কিংবা জাঁতা—আধুনিকতার দাপটে উপকূলীয় অঞ্চল থেকেও এসব আর আগের মতো চোখে পড়ে না। তবে শ্যামনগরের গ্রামীণ মেঠো পথের ধারে গড়ে ওঠা এক সংগ্রহশালায় যত্ন করে আগলে রাখা হয়েছে বিলুপ্তপ্রায় এসব লোকজ ঐতিহ্য। শুধু পুরোনো জিনিসপত্রই নয়, এখানে প্রতিটি নিদর্শনের সাথে মিশে আছে প্রিয়জন ও পূর্বপুরুষের মায়ামাখানো স্মৃতি।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের পূর্ব ধানখালী গ্রামে বেসরকারি সংস্থা ‘প্রেরণা’র উদ্যোগে গড়ে তোলা হয়েছে এই ‘সুন্দরবন মিউজিয়াম’ (সুন্দরবন সংগ্রহশালা)। উদ্দেশ্য একটাই—উপকূলীয় অঞ্চলের হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতি, জীবনযাপন ও ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে জীবন্ত করে রাখা।
সংগ্রহশালার আঙিনায় গ্রামবাংলার স্মৃতির কোলাজ:
সুন্দরবনের কোলে গড়ে ওঠা এই সংগ্রহশালায় প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে সবুজ শস্যখেত, বাঁশের বেড়া আর লাল শাপলা ফোটা ছোট পুকুর। পুরো প্রাঙ্গণজুড়ে সাজানো রয়েছে গ্রামবাংলার পুরোনো দিনের নানা সামগ্রী—কাঠের পালকি, ঢেঁকি, জাঁতা, মাটির থালা-বাসন ও প্রাচীন চুলা। পাশাপাশি ধবধবে সাদা ভাস্কর্যে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সুন্দরবন অঞ্চলের পরিচিত ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ ‘বনবিবি’র কাহিনির চরিত্রগুলো।
মিউজিয়ামের মূল ঘরের ভেতরে রয়েছে সুন্দরবনের ঐতিহ্যবাহী নানা গাছের কাঠ ও ফলের নমুনা, কাচের বোতলে সংরক্ষিত রূপসা-পশুরের জোয়ার-ভাটার পানি এবং শতাধিক জাতের দেশি শাকসবজির বীজ। এ ছাড়া রয়েছে সাদা-কালো টেলিভিশন, গ্রামোফোন, কাঠের ফ্রেমের রেডিও, ক্যাসেট প্লেয়ার, হারিকেন, খড়ম, মাছ ধরার সরঞ্জাম ও কৃষিকাজের প্রাচীন নানা উপকরণ। আছে নকিপুর জমিদারবাড়ির পুরোনো স্থাপনার অংশ, প্রাচীন মুদ্রা ও ১৯৫৮ সালের দরখাস্ত, চিঠি, স্ট্যাম্প, পোস্টার এবং বনবিবির পূজার পাঁচালির দলিল।
জিনিসগুলোর পেছনে জড়ানো মানুষের আবেগ:
এই সংগ্রহশালার বিশেষত্ব হলো, এর সিংহভাগ উপকরণ সংগৃহীত হয়েছে স্থানীয় সাধারণ মানুষের হাত থেকে। পূর্ব ধানখালীর সখী রানী মণ্ডল ঘরের এক কোণে পড়ে থাকা গরুর মুখের ‘ঠুসি’ তুলে দিয়েছেন এই মিউজিয়ামে। একই গ্রামের সুবোধ মণ্ডল তাঁর প্রয়াত মামার দেওয়া পুরোনো ক্যাসেটটি তুলে দেওয়ার সময় আবেগাপ্লুত হয়ে কর্মীকে বলেছিলেন, “মামা নেই, এই জিনিসটা আঁকড়ে রেখেছিলাম। আপনারা এটাকে আগলে রাখবেন।”
এক বৃদ্ধা পানের সিসার বয়াম দিয়ে দেন হাসিমুখে, তো কেউ আবার নিজের হাতে বানানো কাঠের ফ্রেমের টেলিভিশন উপহার দিয়েছেন মিউজিয়ামকে।
ছেলেক নিয়ে মিউজিয়ামে আসা দর্শনার্থী সুধারানী বর্মণ বলেন, “এখানে এমন অনেক জিনিস আছে যা এখন আর দেখা যায় না। ছেলেকে ইতিহাস চেনানোর পাশাপাশি নিজের শৈশবে ফিরে যাওয়ার একটা সুযোগ তৈরি হলো।”
আগামীর স্বপ্ন:
প্রেরণার কর্মী বৃষ্টি মণ্ডল ও ছন্দা মল্লিক জানান, শুরুর দিকে তালিকার প্রায় ৮০ শতাংশ জিনিস সংগৃহীত হয়েছে এবং সংগ্রহের কাজ এখনো চলমান।
প্রেরণার নির্বাহী পরিচালক শম্পা গোস্বামী বলেন, “ঐতিহ্য ও স্মৃতি হারিয়ে যাওয়ার ক্ষতি কোনো অর্থ দিয়ে পূরণ করা যায় না। নতুন প্রজন্ম যেন তাদের শিকড় ও পূর্বপুরুষের জীবনধারা সম্পর্কে জানতে পারে, সে লক্ষ্যেই ২০২৫ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। বর্তমানে এক হাজারের বেশি নিদর্শন রয়েছে। ভবিষ্যতে পরিসর আরও বড় করার পরিকল্পনা আছে আমাদের।”
আধুনিক নগরজীবনের ভিড়ে যখন গ্রামের শিকড়গুলো হারিয়ে যেতে বসেছে, তখন সাতক্ষীরার এই ‘সুন্দরবন মিউজিয়াম’ নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাস আর ঐতিহ্যের এক পরম অমূল্য সেতুবন্ধন হয়ে টিকে রয়েছে।
