আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে পূর্বাভাসের চেয়েও বেশি হারে বৃদ্ধি পেয়েছে দেশটির মূল্যস্ফীতি। সরকারি হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিগত এক বছরে মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে, যা ঠিক তার আগের মাসে অর্থাৎ আগস্টে ছিল ৩ দশমিক ৪ শতাংশ।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণাকে ছাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি এভাবে বেড়ে যাওয়ার নেপথ্যে প্রধান ভূমিকা রেখেছে জ্বালানি তেলের চড়া দর। ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় পেট্রলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এমন সময়ে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় যখন আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে, তখন মূল্যস্ফীতির এই আকস্মিক উল্লম্ফন স্বাভাবিকভাবেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপ ও অস্বস্তি বাড়িয়ে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্যুরো অব লেবার স্ট্যাটিসটিকসের তথ্যানুযায়ী, বিগত এক বছরে দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারে মোটরযানের জ্বালানি খরচ বেড়েছে ৩৪ দশমিক ২ শতাংশ। শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই জ্বালানির দর বেড়েছে ৯ দশমিক ১ শতাংশ, যা সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির অর্ধেকেরও বেশি দায় বহন করছে। সব মিলিয়ে এক বছরে সামগ্রিক জ্বালানি মূল্যস্ফীতি পৌঁছেছে ২০ দশমিক ৪ শতাংশে। এর মাঝে চরম আঘাত এসেছে ঘর উষ্ণ রাখার জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে, যার দাম এক লাফে বেড়েছে ৭৪ দশমিক ২ শতাংশ।
জ্বালানির তুলনায় অবশ্য খাদ্যপণ্যের বাজার অনেকটাই স্থিতিশীল রয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে খাদ্যের দাম অপরিবর্তিত ছিল এবং বছরওয়ারি হিসাবে খাদ্য মূল্যস্ফীতি সীমাবদ্ধ ছিল ২ দশমিক ৫ শতাংশে। অন্যদিকে, খাদ্য ও জ্বালানির মতো অস্থিতিশীল খাতগুলোকে বাদ দিয়ে হিসাব করা মূল বা কোর মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৬ শতাংশে।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত রয়েছে ২ শতাংশে। জ্বালানি তেলের বাড়তি খরচ অর্থনীতির অন্যান্য খাতে, বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের বাজারে নতুন করে ছড়িয়ে পড়ছে কি না, সে বিষয়ে ফেডের নীতিনির্ধারকরা গভীর নজর রাখবেন বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। বাজারে জ্বালানির জোগান হ্রাস পেলে এবং চাহিদা আগের মতোই অটুট থাকলে স্বভাবতই দাম বাড়ে। এছাড়া অপরিশোধিত তেল ডিজেল ও পেট্রল উৎপাদনের প্রাথমিক কাঁচামাল হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের অস্থিরতা সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ের খরচে প্রতিফলিত হয়।
মূল্যস্ফীতির এই বৃদ্ধির পেছনে ট্রাম্পের আরোপিত শুল্কনীতির বড় প্রভাব রয়েছে। দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বের অধিকাংশ বাণিজ্যিক অংশীদার দেশের ওপর শুল্কের বোঝা চাপিয়ে দেন। সুপ্রিম কোর্ট ফেব্রুয়ারিতে অধিকাংশ বৈশ্বিক শুল্ক বাতিল করে দিলেও ট্রাম্প তাৎক্ষণিকভাবে বিকল্প হিসেবে ঢালাওভাবে ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক কার্যকর করেন। ট্রাম্পের দাবি ছিল, শুল্কের ফলে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন গতিশীল হবে এবং ক্রেতারা স্থানীয় পণ্য ক্রয়ে উৎসাহিত হবেন। তবে নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভের এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই শুল্ক নীতিই দেশটির মূল্যস্ফীতিকে নতুন করে উসকে দিচ্ছে।
আমদানিকৃত পণ্যের ওপর চড়া শুল্ক আরোপিত হলে বিদেশি রপ্তানিকারকরা যদি দাম কমিয়ে তার ভাগ না নেন, তবে মার্কিন ব্যবসায়ীদেরই সেই অতিরিক্ত ব্যয়ের দায় মেটাতে হয়। নিউইয়র্ক ফেডের তথ্যানুযায়ী, নতুন শুল্ক কার্যকর হওয়ার পর বিদেশি রপ্তানিকারকরা তাদের পণ্যের দাম নামমাত্র কমিয়েছে। যার ফলে বাড়তি শুল্কের প্রায় ৯০ শতাংশ আর্থিক চাপই বহন করতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে। গবেষণায় আরও সতর্ক করা হয়েছে, গড় শুল্কের হার ১ শতাংশ বাড়লে পরবর্তী এক বছরে ভোক্তা পণ্যের দাম প্রায় ০ দশমিক ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়।
বর্তমান মূল্যস্ফীতি ফেডারেল রিজার্ভের ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ওপরে অবস্থান করলেও সাম্প্রতিক ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেকর্ডের তুলনায় তা এখনও যথেষ্ট কম। বৈশ্বিক মহামারির সময় সরবরাহ শৃঙ্খলের বিপর্যয় এবং ২০২২ সালের শুরুতে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক আগ্রাসনের জেরে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। সেসব বৈশ্বিক সংকটের জেরে একপর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির হার প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি গিয়ে ঠেকেছিল।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যস্ফীতি হ্রাসের মানে বাজারে পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়; বরং এর অর্থ হলো আগের তুলনায় ধীরগতিতে দাম বাড়ছে। একটি সচল অর্থনীতিতে পরিমিত মাত্রার মূল্যস্ফীতিকে সাধারণত আর্থিক স্থিতিশীলতার পরিচায়ক হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যার প্রতিফলন দেখা যায় ফেডের ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রায়। পক্ষান্তরে মূল্যস্ফীতি মাত্রাতিরিক্ত কমে গেলে ভবিষ্যতে আরও কম দামে পাওয়ার আশায় সাধারণ ক্রেতারা ব্যয় স্থগিত রাখতে পারেন, যার ফলে বাজারে সামগ্রিক চাহিদা সংকুচিত হয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মীদের মজুরি হ্রাস বা ছাঁটাইয়ের মতো পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়।
