নতুন কোনো রাজনৈতিক দল গঠন না করে ‘সমমনা ইসলামী দল’ নামে অভিন্ন ব্যানারে কার্যক্রম পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কওমি ধারার সাতটি ইসলামী দল। দলগুলো নিজ নিজ স্বতন্ত্র পরিচয় বজায় রেখেই এ উদ্যোগে অংশ নেবে।
কওমি ধারার সাতটি ইসলামী দলকে নিয়ে রাজনৈতিক ঐক্য গঠনের উদ্যোগে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নেতৃত্বে সাত দলের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাজধানীর খিলগাঁওয়ের মাখজানুল উলুম মাদরাসায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
নতুন এ প্ল্যাটফর্মে থাকা সাতটি দল হলো—ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, ইসলামী ঐক্যজোট, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব আল্লামা সাজিদুর রহমানের সভাপতিত্বে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন নায়েবে আমির মাওলানা আব্দুল আউয়াল, মাওলানা আইয়ুব বাবুনগরী, যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব, সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি বশির উল্লাহ, খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন ও মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী ও মহাসচিব মাওলানা ইউসুফ সাদেক হক্কানি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমীন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুফতি মুসা বিন ইজহার, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা বাহাউদ্দীন জাকারিয়া, ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আব্দুল কাদির, মহাসচিব মুফতি শাখাওয়াত হোসেন রাজীসহ সংশ্লিষ্ট দলগুলোর অন্য নেতারা।
বৈঠকে প্রাথমিকভাবে চারটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত ও আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রথমত, সাতটি সমমনা ইসলামী রাজনৈতিক দল পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করবে বলে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, নতুন কোনো রাজনৈতিক দল গঠন না করে ‘সমমনা ইসলামী দল’ নামে অভিন্ন ব্যানারে কার্যক্রম পরিচালনা করবে দলগুলো। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক দল নিজস্ব পরিচয় বজায় রাখবে।
তৃতীয়ত, বর্তমানে বিএনপি বা জামায়াতে ইসলামীর মতো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোটবদ্ধ থাকা দলগুলো পর্যায়ক্রমে নিজ নিজ দলীয় প্রধানের সঙ্গে আলোচনা করে এ ঐক্যপ্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ার বিষয়ে অগ্রসর হবে। সংশ্লিষ্ট দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা ও সমঝোতার ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
চতুর্থত, আগামী ৫ ডিসেম্বর পরবর্তী বৈঠকের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।
মূলত আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধভাবে অংশ নেওয়ার লক্ষ্যেই কয়েক মাস ধরে এ জোট গঠনের প্রক্রিয়া চলছিল। সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে কওমি ধারার দলগুলো বিএনপি ও জামায়াতের জোটে যুক্ত হলেও এবার দলীয় প্রতীকবিহীন স্থানীয় নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত একক প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দেয়। এরপর স্থানীয় নির্বাচনে একসঙ্গে লড়তে হেফাজতে ইসলামের মধ্যস্থতায় নতুন এ প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলেছে কওমিপন্থী দলগুলো।
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুফতি মুসা বিন ইজহার নয়া দিগন্তকে বলেন, জাতীয় স্বার্থে জনগণের সঙ্গে তাদের যে কমিটমেন্ট, সেই লক্ষ্যেই তারা এখনো জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সঙ্গে আছেন। ওই জোট ছাড়ার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। তবে স্থানীয় নির্বাচনে জামায়াত এককভাবে প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সাতটি ইসলামী দলের সঙ্গে জোট করে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন তারা।
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী নয়া দিগন্তকে বলেন, বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, অন্যান্য জোটে থাকা দলগুলো পর্যায়ক্রমে সেখান থেকে বের হয়ে আসবে। সাত দলের এ জোটের সঙ্গে যারা থাকবে, তারা অন্য কোনো রাজনৈতিক জোটে থাকতে পারবে না। স্থানীয় ও জাতীয়—যেকোনো নির্বাচনে সাতটি দল একসঙ্গে অংশ নেবে।
তবে এ উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির আরেক অংশের নির্বাহী সভাপতি মাওলানা এ কে এম আশরাফুল হক। নয়া দিগন্তকে তিনি বলেন, এটি জাতির সঙ্গে নতুন প্রতারণা। তার দাবি, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের শাসনামলে ডিপ স্টেট ও গোয়েন্দাদের তত্ত্বাবধানে ‘সমমনা ইসলামী দল’ গঠন করা হয়েছিল। এ নামে একটি সিন্ডিকেট তৈরি করা হয়, যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে জামায়াতের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘সমমনা’ জোটের ধারাবাহিকতায় গত নির্বাচনের আগে একপর্যায়ে সরাসরি জামায়াতের নেতৃত্বে ১১ দলীয় জোট গঠন করা হয়। তার মতে, আগামীতে জামায়াতের পক্ষে আরও বড় কিছু করার প্রাথমিক প্রক্রিয়া এটি। আগে সিন্ডিকেটের পরিসর ছোট ছিল, এবার তা কিছুটা বড় করা হয়েছে। এতে চরমোনাইয়ের ইসলামী আন্দোলনকে যুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া ইসলামী ঐক্যজোটের দুই অংশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের একাংশ, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির একাংশ এবং বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের একাংশ রয়েছে। তার দাবি, পুরোনো উদ্যোগটিকেই নতুনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
মাওলানা এ কে এম আশরাফুল হক আরও বলেন, এখনো ওই ডিপ স্টেটকে সক্রিয় দেখা যাচ্ছে। তার ভাষ্য, এ জোটের ঘোষণা জাতির সঙ্গে আরেকটি বড় প্রতারণা। যারা জামায়াতের সঙ্গে রয়েছেন, তারা কোনো অবস্থাতেই দলটি ছাড়তে পারবেন না বলে তিনি মনে করেন। জামায়াত ছাড়ার কথা বলে ইসলামী অঙ্গনকে নতুন করে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চলছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, হেফাজতে ইসলাম একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। তারা রাজনীতি নিয়ে এত মাথা ঘামাচ্ছে কেন? এটিকেও তিনি জাতির সঙ্গে বড় ধরনের প্রতারণা বলে মন্তব্য করেন।
-20261023080748.jpg&w=1440&q=75)