পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলকে (সিএইচটি) যেন মগের মল্লুক বানানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলো। বিশেষত রাঙামাটির সাজেক ভ্যালি ঘিরে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ-প্রসীত) সশস্ত্র সদস্যদের অরাজকতা ও তাণ্ডবের ঘটনায় নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমেই মূলত পার্বত্য জেলাগুলোয় নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখার চেষ্টা করছে ইউপিডিএফসহ অন্য আঞ্চলিক সংগঠনগুলো। তবে গতকাল বৃহস্পতিবার সাজেকে ইউপিডিএফ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও পর্যটকদের লক্ষ্য করে প্রায় ৪০ রাউন্ড গুলি চালিয়ে যে তাণ্ডব এবং দুঃসাহস দেখিয়েছে, সেটা পরিকল্পিতভাবে তাদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার বিষয় হিসেবে দেখছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, পার্বত্য অঞ্চলে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা, নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান না হওয়া এসব বিষয় পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। তাদের কেউ কেউ মনে করেন, নিজেদের অবস্থান জানান দেওয়া এবং নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতার ওপর চাপ সৃষ্টি করা এ ধরনের সহিংসতার সম্ভাব্য উদ্দেশ্য হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সাজেকে অবরোধের কারণে তিন হাজারের বেশি পর্যটক আটকা পড়েন। সড়কে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করা হলে তাদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা তৎপর হন। এ সময় গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)। সংস্থাটির প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা জড়িত ছিলেন।
আইএসপিআর আরও জানিয়েছে, স্থানীয় বাসিন্দাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে অবরোধে অংশ নিতে বাধ্য করা এবং তাদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সংস্থাটির দাবি, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর চলমান অভিযানের কারণে ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের একটি অংশ পর্যটন এলাকাকেন্দ্রিক অবস্থান নিয়েছে। এ ধরনের সহিংসতা পর্যটনশিল্প, স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা এবং জননিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছে আইএসপিআর।
পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে এ ধরনের ঘটনা ঘটার পেছনে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্প প্রত্যাহার ও মোতায়েনের পরিবর্তন নিয়েও নতুন করে পর্যালোচনা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত জটিল। দুর্গম পাহাড়ি এলাকার সুযোগ নিয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা চালানোর আশঙ্কা রয়েছে। সীমান্ত পথে অস্ত্রের অবৈধ প্রবাহ ও গোপন তৎপরতা বন্ধে যৌথ বাহিনীর সমন্বিত অভিযান প্রয়োজন। তার মতে, যেসব এলাকায় নিরাপত্তাঝুঁকি বেশি, সেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানোর বিষয়টি সরকারের বিবেচনা করা উচিত।
পাহাড়ি তরুণদের সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সম্ভাব্য কারণগুলোও খতিয়ে দেখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, এসব সমস্যার রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণ শনাক্ত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে পার্বত্য অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর খবরের কাগজকে বলেন, ‘শান্তিচুক্তি হওয়ার পর আমরা কোনোভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের ওপর থেকে মনোযোগ হারিয়ে ফেলেছি। শান্তিচুক্তি করে ফেলেছি, এই ভেবে আমরা নিশ্চিন্ত হয়ে গেছি। অথচ একের পর এক ঘটনা ঘটছে এবং একই ঘটনা বারবার ঘটছে। সরকার যদি এটি পরিকল্পনামাফিক ঠিকভাবে মোকাবিলা না করে, তাহলে এটা দেশের জন্য বিষফোড়া হয়ে দাঁড়াবে।’
ফজলে এলাহী আকবর আরও বলেন, ১৯৯৭ সালে যে রাজনৈতিক চুক্তি, অর্থাৎ শান্তিচুক্তি হয়েছিল, সেটির বরখেলাপ হচ্ছে। এখনো আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর মধ্যে অস্ত্র নিয়ে চলাফেরা চলছে। এর জন্য তাদেরও দায়ী করতে হবে। শান্তিচুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে যেসব সংগঠন, টাস্কফোর্স, কমিশন ও পরিষদ গঠিত হয়েছে এবং যারা এগুলোর নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যারা সুবিধা ভোগ করছেন, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবেও আমাদের সেখানে সম্পৃক্ত হতে হবে। আমাদের যতগুলো রাজনৈতিক দল আছে, তাদের অনেক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায় কিছুই নেই। এই জনগোষ্ঠীকে যদি আমরা রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত করতে না পারি, তাহলে বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি আরও উৎসাহ পাবে।
পার্বত্য অঞ্চলে গোয়েন্দা কার্যক্রমে যুক্ত কয়েকজন কর্মকর্তার দাবি, সীমান্তের বিভিন্ন পথ ব্যবহার করে আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কাছে অস্ত্র পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকা ও নাফ নদীপথে অস্ত্র পাচারের সম্ভাব্য রুট নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। রকেট লঞ্চার, একে-৪৭ রাইফেল, হ্যান্ড গ্রেনেড ও মাইনের মতো অস্ত্রের কথাও তারা উল্লেখ করেছেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামে ইউপিডিএফ, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) এবং কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) মতো বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠনের তৎপরতা ও পারস্পরিক বিরোধ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে।
চলমান পরিস্থিতির মধ্যে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন সাজেক ভ্রমণে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। নিরাপত্তার কারণে পর্যটকদের সাজেক ত্যাগ করার নির্দেশ দেওয়ার পর পর্যটন কেন্দ্রটির ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘায়িত হলে রিসোর্ট ও কটেজের মালিক, জিপচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিকসহ পর্যটননির্ভর বিভিন্ন পেশার মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাদের বড় একটি অংশ স্থানীয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বাসিন্দা। পর্যটকের উপস্থিতি কমে গেলে তাদের আয় ও কর্মসংস্থানে সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে।
জেলা প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা জানান, পর্যটকরা কেবল ভ্রমণ ও পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগে এসেছিলেন। আঞ্চলিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল, চাঁদাবাজি বা আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। অথচ নিজেদের আধিপত্য জানান দিতে পাহাড়ের সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান ধ্বংস করছে ইউপিডিএফ।
