এক. ভূমিকা: মানুষ ও সংস্কৃতি
মানুষ কেবল একটি জৈবিক সত্তা নয়। প্রতিটি মানুষ ওতপ্রোতভাবে জড়িত অন্তত তিনটি সত্তার এক জটিল ও যৌগিক সমন্বয়— ব্যক্তির জৈবিক সত্তা, তার সমাজের সমষ্টিগত সাংস্কৃতিক সত্তা এবং ব্যক্তির গভীরগোপন একান্ত মানসিক সত্তা। ব্যক্তিক জৈবিক সত্তাটি হলো মানব প্রজাতির সদস্য হিসেবে ও বংশগতভাবে বহন করা অগণিত চারিত্র্যবৈশিষ্ট্যের সত্তা।
সংস্কৃতি হলো ব্যক্তি যে জনগোষ্ঠির সদস্য সে জনগোষ্ঠির সামগ্রিক পরিচয়। সংস্কৃতি অনুধাবনের জন্য এক ডজনেরও বেশি স্কুল অব থট বা ঘরানা রয়েছে। খুব সংক্ষেপে, সংস্কৃতি হলো মানুষের অর্জিত ও ভাগাভাগি করা জ্ঞান, বিশ্বাস, আচরণগত ধরন, প্রতীক, সামাজিক মূল্যবোধ, প্রতিষ্ঠান এবং বস্তুগত উপাদানের এমন একটি গতিশীল ব্যবস্থা—যার মাধ্যমে একটি সমাজের মানুষ তাদের চারপাশের জগতকে উপলব্ধি করে, অভিজ্ঞতাকে অর্থবহ করে তোলে এবং নিজেদের টিকে থাকা ও পারস্পরিক যোগাযোগ পরিচালনা করে। একটি প্রতিবেশ ব্যবস্থায় জৈবিক সত্তা ও সাংস্কৃতিক সত্তার জটিল মিথষ্ক্রিয়ায় গড়ে উঠে ব্যক্তির মনোজগত। কোন ধরনের অভিঘাত কোন ধরনের মিথষ্ক্রিয়া কোন ধরনের মানস গড়ে তোলে তা নির্ধারণ করা কঠিন, তবে ব্যক্তির মনোজগত হলো জলতলদেশের অন্তঃশীল স্রোতের মতো, সহজে তা টের পাওয়া যায়না। যে কোন সমাজে একজন ব্যক্তির জৈবিক সত্তা ও মানসিক সত্তার ক্রিয়াকর্ম লাগামহীন হতে পারে না সেই সমাজের সামষ্টিক সাংস্কৃতিক বোধ, প্রভাব, নির্দেশনা, আরোপন, নিয়ন্ত্রণের মতো বিবিধ নিয়ামক ও প্রভাবকের জন্য।
দুই. সংস্কৃতি ও নন্দন-সংস্কৃতি
সংস্কৃতি একটি জনগোষ্ঠির সামগ্রিক জীবনযাপনের পরিচায়ক; সমাজে উৎপাদনের উপকরণ, খাওয়া-দাওয়া, ঘর-দুয়ার, পোশাক-পরিচ্ছদ, চলা-ফেরা, চিন্তা-ভাবনা, ক্ষমতা-রাজনীতি-অর্থনীতি, আইন-বিধি-বিধান-প্রথা, বিশ্বাস-ধর্ম-দর্শন, আচার-অনুষ্ঠান-প্রতীক-অর্থ, নন্দন-চর্চা ইত্যাদি সবই সংস্কৃতির এক একটি অংশ। সংস্কৃতির বিজ্ঞানে অপসংস্কৃতি নামে কোনো ধারনার স্থান নেই; সেখানে বিভিন্ন গোষ্ঠির সংস্কৃতি থাকতে পারে; যেমন, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক সংস্কৃতি, নন্দন সংস্কৃতি, ধর্মীয় সংস্কৃতি, জেলে বা শিল্প-শ্রমিকের সংস্কৃতি, ঋণখেলাপি বা চোরের সংস্কৃতি ইত্যাদি।
নন্দন-সংস্কৃতিকে বলা যেতে পারে জীবনাচারের আনন্দময় বা বিনোদনময় অংশ; নন্দন সংস্কৃতি শিখনেরও, ইতিহাসেরও, ক্ষমতা চর্চারও। জীবনাচারের সামগ্রিকতাকে উপেক্ষা করে কেবলমাত্র গল্প-কবিতা-নাচ-গান-নাটক-সিনেমা-চিত্রকর্ম এসবকে ‘সংস্কৃতি’ মনে করা সংস্কৃতির খণ্ডিত অনুধাবন।
সংখ্যালঘু নাগরিক শিক্ষিতজন নিজেদের সংস্কৃতিকে একটি সমাজের প্রধান সংস্কৃতি ধরে নিয়ে বিচারকের আসনে বসে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সংস্কৃতিকে ‘লোকসংস্কৃতি’ নাম দিয়ে আদর করে সার্টিফিকেট দেয়ার চেষ্টা করেন। প্রকৃতপক্ষে একটি জনগোষ্ঠির বৃহত্তম অংশের সংস্কৃতি সে সমাজের প্রধান সংস্কৃতি হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত; তবে প্রধান জনগোষ্ঠির সংস্কৃতিকে এখানে ‘অধিপতি’ বা ‘আগ্রাসী’ সংস্কৃতির ভূমিকা পালন অগ্রহণযোগ্য। যদিও কোন কোন প্রধান সংস্কৃতির মধ্যে সে প্রবণতা বিরাজমান, বিশেষত অধিপতিদের আচরণকাঠামোয়।
অন্য যে কোনো সংস্কৃতির মতো বাঙালি সংস্কৃতির নন্দনসংস্কৃতিতেও সঙ্গীতের অনেক ধারা রয়েছে— বাউল, ভাটিয়ালি, মুর্শিদি, মারফতি, বারোমাসি, জারি, সারি, পালা ইত্যাদি। এগুলোর অন্যতম প্রধান একটি হিসেবে বাউল সঙ্গীত সর্বজনস্বীকৃত। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সঙ্গীত চর্চা প্রধানত বিনোদনধর্মী হলেও বাউল সঙ্গীত ও এ জাতীয় কিছু সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে বাঙালি জনগোষ্ঠি অতি উচ্চ মাত্রার বুদ্ধি ও জ্ঞানের চর্চা করেছেন শত শত বছর ধরে। এসবের মধ্য দিয়ে তারা অনুশীলন করেছেন মৌলিক দার্শনিক বিষয়াবলী। বাউলদের রচিত ও গীত সঙ্গীত শোনার মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষ তাদের হৃদয়ের বা আত্মার মৌলিক জিজ্ঞাসার জবাব খুঁজেছেন আর জ্ঞান-বিশ্বাস-আচরণগত উৎক্রমণের মধ্য দিয়ে নিজেদের সামষ্টিক ও ব্যক্তি জীবন বিকশিত করেছেন।
মুক্তবিশ্বকোষ ‘উইকিপিডিয়া’ ‘বাউল সঙ্গীত’ শিরোনামের নিবন্ধে লিখছে যে “... এটি বাউল সম্প্রদায়ের নিজস্ব সাধনগীত। আবহমান বাংলার প্রকৃতি, মাটি আর মানুষের জীবন জিজ্ঞাসা একাত্ম হয়ে ফুটে ওঠে বাউল গানে। আরো ফুটে ওঠে সাম্য ও মানবতার বাণী। এ ধারাটি পুষ্ট হয়েছে পঞ্চদশ শতাব্দীর তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্মের ভাব, রাধাকৃষ্ণবাদ, বৈষ্ণব সহজিয়া তত্ত্ব ও সুফি দর্শনের প্রভাবে। কোনো কোনো ইতিহাসবিদের মতে, বাংলাদেশে বাউল মতের উদ্ভব সতের শতকে। এ মতের প্রবর্তক হলেন আউল চাঁদ ও মাধব বিবি। ... লালন সাঁইয়ের গানের মাধ্যমে উনবিংশ শতাব্দী থেকে বাউল গান ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন শুরু করে। তিনিই শ্রেষ্ঠ বাউল গান রচয়িতা হিসেবে বিবেচিত হন। ধারণা করা হয় তিনি প্রায় দু'হাজারের মত গান বেধেছিলেন।”
জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা ‘ইউনেসকো’ মানব প্রজাতির ৪৩টি বিমূর্ত ও বাক ঐতিহ্য চিহ্নিত করতে গিয়ে বাংলাদেশের বাউল সঙ্গীতকে মানব সমাজের অসাধারণ সৃষ্টি হিসেবে বর্ণনা করে বিশ্ব সভ্যতার সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং ২০০৮ সালে অফিশিয়ালি একে ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। ইউনেসকোর তালিকায় বাউল সঙ্গীতের এই অন্তর্ভুক্তির পেছনে কাজ করেছে মূলত বাউল সঙ্গীতে লালনের ভূমিকা ও অবদানের জন্য— লালনের গান শুনে মানুষ ক্রমবর্ধমানহারে বাউল সঙ্গীতের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন। নবপ্রজন্মের অনেক তরুণ-তরুণি লালনের গান গাইছেন, ফিউশন তৈরি করছেন, শুনছেন ও বোঝার চেষ্টা করছেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে লালনের গান সংগ্রহ ও প্রকাশ করেছেন। উল্লেখ্য, ইউনেসকো বাউল সঙ্গীতকে বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষণার বহু আগে থেকে— মূলত গত শতক থেকে— প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিদ্যায়তনিক পরিমণ্ডলের অনেক গবেষক লালনের সৃষ্টিকর্মে মুগ্ধ হয়ে বাংলাদেশে গবেষণাকাজে এসেছেন এবং তাদের কেউ কেউ লালনমতে দীক্ষাও নিয়েছেন, কেউ কেউ দীর্ঘমেয়াদে এদেশে থেকেও গিয়েছেন। অ্যালেন গিনসবার্গের মতো প্রথিতযশা শিল্পী ধারণ করেন লালনকে; তাঁর এক বিখ্যাত কবিতার নাম: আফটার লালন।
তিন. লালন পরিচয়
নিজের সম্পর্কে কোনো ধরনের তথ্য জানাতে লালনের ছিল চরম অনীহা; এ বিষয়ে তিনি তাঁর অনুসারীদের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন।
লালনের তিরোধান হয় ১২৯৭ বঙ্গাব্দের ১ কার্তিক, খ্রিস্টিয় হিসেবে দিনটি ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর, শুক্রবার। তাঁর কবরের নামফলকে জন্মসাল অজ্ঞাত লেখা রয়েছে। তবে বিবিধ গবেষণাকর্মের পরিণতিতে আজ এটা মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত যে ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে তাঁর জন্ম। দুদ্দু শাহ বিরচিত লালন-জীবনী থেকে জানা যায় যে ১১৭৯ বঙ্গাব্দের ১ কার্তিক তাঁর জন্ম। সে সূত্রে বাংলা একাডেমি কর্তৃক পরিমার্জিত বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুসারে বলা যায় যে ১ কার্তিক বা ১৭ অক্টোবর লালনের জন্ম (১৭৭৪) ও মৃত্যু (১৮৯০) দিবস।
লালনের জন্মস্থান নিয়ে রয়েছে তিন ধরনের মত। অনুসারী ও গবেষকদের কেউ কেউ তাঁর মা-বাবার পরিচয় জানিয়েছেন, কিন্তু তিনি নিজে এ বিষয়ে নীরব ছিলেন। যতোদিন বেঁচে ছিলেন, সমাজের চাপ ছিল তাঁর ধর্মবিশ্বাস জানার জন্য, তিনি তা উপেক্ষা করেছেন। দেহত্যাগের পর তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াও কোন ধর্মমত অনুসারে আয়োজিত হয়নি। তারপরও তাঁর দেহত্যাগের পর গবেষণার নামে তাঁর গায়ে ধর্মীয় পরিচয়ের লেবাস সাঁটার অপপ্রয়াস কম নয়। তিনি গেয়েছেন—
সব লোকে কয়, লালন ফকির হিন্দু কি যবন।
লালন বলে, আমার আমি জানি না সন্ধান।
আবার—
সব লোকে কয়, লালন কি জাত সংসারে।
লালন বলে, জাতির কি রূপ দেখলাম না দুই নজরে।
তিনি আরো গেয়েছেন—
যখন তুমি ভবে এলে তখন তুমি কি জাত ছিলে
কি জাত হবা যাবার কালে সেই কথা কেনো বল না।
এ গানটিতে তিনি আরো স্পষ্ট করেছেন—
গোপনে যে বেশ্যার ভাত খায় তাতে ধর্মের কি ক্ষতি হয়
লালন বলে, জাত কারে কয় এ ভ্রম তো গেল না।
সবাই আসল কাজ বাদ দিয়ে জাত নিয়ে পরে থাকায় একই গানে তিনি তাঁর হতাশাও ব্যক্ত করেন—
সত্য কাজে কেউ নয় রাজি
সবই দেখি তা না না না।
বিশ্বাসের দিক থেকে কেউ কেউ তাঁকে সংশয়বাদি বা অজ্ঞেয়বাদি বলার চেষ্টা করেন; এক্ষেত্রে সংশয় হয় তারা হয়তো তাঁর গানের অর্থকরণ করেন এমন একটি বিশ্বাসের ভিত্তি থেকে যা লালন নিজে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
প্রকৃতপক্ষে লালন সচেতনভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন সকল ধরনের পরিচয়। প্রচলিত সকল বিশ্বাস-জ্ঞান-আচার-অনুষ্ঠান-কার্যক্রম-প্রতিষ্ঠান-ক্ষমতাকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন অবলীলায়। নিজের উপলব্ধি-চেতনা-অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে একজন প্রজ্ঞাবান মানুষ হিসেবে সব ধরনের ভেদ-বিভেদ-অসমতার বিপরীতে প্রজ্ঞার শিখরে তিনি মানবতার ও সাম্যের কালোত্তীর্ণ দার্শনিক চিন্তার বিকাশ ঘটিয়েছেন। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধিরও পঁচিশ বছর আগে ভারত উপমহাদেশে তিনি ‘মহাত্মা’ নামে পরিচিত ছিলেন।
তিনি তাঁর অনুসারীদের নিয়ে স্বতন্ত্র বিশ্বাসনির্ভর জীবনাচার পালন করেছেন; এজন্য কেউ কেউ তাঁদের বিশ্বাস-আচার-অনুষ্ঠানকে আলাদা একটি ধর্মের পরিচয় দিতে চান। কিন্তু লালন তাঁদের জীবনাচারকে কোনো ধর্মের মর্যাদা দেননি, লেবেল সাঁটেননি। ধর্ম যে চিন্তার অন্ধকূপে পরিণত হয় তা তিনি জানতেন। অনুসৃত জীবনাচারে গান তাঁদের পবিত্র ‘কালাম’ হিসেবে পরিগণিত হয়। তাঁর গানের বিষয়াবলী বিষয়ে একটু পরে আলোচনা করা হচ্ছে।
চার. বাউল সঙ্গীত ও লালন সঙ্গীত
সাংস্কৃতিক আচরণের ভিত্তি যে সাংস্কৃতিক জ্ঞান, তা হতে পারে স্পষ্ট বা প্রচ্ছন্ন; প্রচ্ছন্ন এমন যেন সাগরনদীজলতলদেশের স্রোতের মতো অন্তঃশীল। অনুরূপ, লালন সঙ্গীতের প্রকাশ্য বা স্পষ্ট অর্থের বাইরেও এসবের অধিকাংশের রূপক-প্রতীক-সংকেত-চিহ্নের অধীনে রয়েছে প্রচ্ছন্ন বা গোপন অর্থ।
বাউলদের বা লালনকে প্রায়সই মিস্টিক হিসেবে অভিহিত করা হয়। তারা বা তিনি মোটেই তা নন। বাউলদেরকে তাদের মতো করে না বোঝার চেষ্টা করে নিজেদের বোধ দিয়ে তাদেরকে বোঝার চেষ্টা করলে তাদেরকে রহস্যময় মনে হতেই পারে বৈকি! প্রকৃতপক্ষে লালন ও বাউলগণ সহজসরল কথা বলেছেন। তবে, প্রতিকূল আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-ক্ষমতাবিন্যাসের মধ্যে প্রায়শ তাদেরকে এমন ভাষায় কথা বলতে হয় বা লিখতে-গাইতে হয় যার সাধারণ অর্থের গভীরে থাকে গূঢ় অর্থ। গূঢ়ার্থ অনুধাবনের অক্ষমতা থেকে তাদেরকে মনে হতে পারে রহস্যময়। সংস্কৃতির প্রতীকবাদি অধ্যয়ন তা নিশ্চিত করে। অনেক মেটাফোরিক বা রূপক-সাংকেতিক ভাষা তাদেরকে ব্যবহার করতে হয়, তাদেরকে রূপক-প্রতীক-সংকেত-চিহ্ন ব্যবহার করতে হয়, তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক অভিধানে রয়েছে এসবের আলাদা অর্থ ও ব্যাখ্যা। সম্প্রতি এসব নিয়ে পুস্তকাদি প্রকাশিত হলেও তা বাউল ধারার ব্যবহারিক ও জীবন্ত অভিধানকে ধারণ করতে পেরেছে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়ে যায়।
লালনের গানের একটি শ্রেণিকরণ থেকে জানা যায় যে তাঁর গানের বিষয়াবলী হলো কমপক্ষে ২২ ধরনের: সৃষ্টিতত্ত্ব, আল্লাহতত্ত্ব, রাসুলতত্ত্ব, মুরশিদতত্ত্ব, গুরুতত্ত্ব, পঞ্চবেনাতত্ত্ব, মানুষতত্ত্ব, মনতত্ত্ব, আত্মতত্ত্ব, মনের মানুষতত্ত্ব, জাতিতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, করণতত্ত্ব, চাঁদতত্ত্ব, রূপতত্ত্ব, প্রেমতত্ত্ব, লীলাতত্ত্ব, গৌরতত্ত্ব, পারাপারতত্ত্ব, পরমতত্ত্ব, গোষ্ঠতত্ত্ব ও বিবিধতত্ত্ব।
মনে রাখা দরকার যে সৃষ্টিতত্ত্ব, আল্লাতত্ত্ব, রাসুলতত্ত্ব, পঞ্চবেনাতত্ত্ব, লীলাতত্ত্ব, গৌরতত্ত্ব ও গোষ্ঠতত্ত্ব বিষয়ক গান রচনা ও গাওয়ার পরও হিন্দু-মুসলিম সমাজের হর্তাকর্তারা কেন বাউলদের ও লালনকে প্রচণ্ড ঘৃণা করে ও অত্যাচার-নির্যাতন-নিপীড়ন করে। কারণ প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসীরা লালনের প্রতীক-সাংকেতিক সঙ্গীতের গূঢ়ার্থ উদ্ধার করে ও তাদের জীবনাচারের খোঁজ নিয়ে তাদেরকে নিজ সমাজের অংশ মনে করে না। শত্রু মনে করে। অতীত সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদি গোষ্ঠি তাদেরকে আক্রমণ করতো আজকে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামাতের নেতাকর্মীরা তাদের উপর যেভাবে আক্রমণ পরিচালনা করে ঠিক সেভাবে; আর সমকালীন হিজবুত-হেফাজতিরা তো লালন অনুসারী ও বাউলদের তো বাম-সমাজতন্ত্রী-কম্যুনিস্টদের আগে ‘জবাই’ করতে চায়। লালনের গান ও বাউলদের জীবযাত্রা নিয়ে ধর্মান্ধদের চরম ঘৃণ্য অসংখ্য বক্তব্য রয়েছে ইউটিউবে। প্রকৃতপক্ষে লালনের এসব গানে যেভাবে সৃষ্টি-আল্লা-রাসুল-পঞ্চবেনা-গৌর-লীলা-গোষ্ঠতত্ত্ব ব্যাখ্যা করা হয়, গূঢ়ার্থ বিবেচনায় তা প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসের অনুরূপ নয়, স্বতন্ত্র।
দশ শতক থেকে আঠারো শতক পর্যন্ত বাংলা সাহিত্য ও নন্দন-সংস্কৃতিসমেত বাঙালি সংস্কৃতিতে মানবতাবাদের যে স্ফুরণ, তার সর্বোচ্চতম বিকাশ ঘটিয়েছেন লালন।
সহজিয়া বৈষ্ণববাদ ও সুফিবাদের প্রভাবে এবং এগুলোকে উৎরিয়ে গুণগতভাবে আরো উচ্চতর দর্শন হিসেবে বিকশিত হয় বাউল তত্ত্ব এবং এর মহত্তম বিকাশ হয় লালনের মাধ্যমে। বাউল তত্ত্বের বিষয় বা কন্টেন্টের সাথে যুক্ত হয় পদ্ধতি বা মেথডোলজি— বৌদ্ধ তান্ত্রিকদের গোপন অনুশীলনের ধারা।
ক.
বৈষ্ণববাদের রাধাকৃষ্ণ-যুগল হলেন বাঙালির এক অসামান্য সামাজিক বিপ্লব। বারো শতক থেকে জয়দেব ও অপরাপর বাঙালি কবিগণ কুরুক্ষেত্রের ‘যুদ্ধ-উপদেষ্টা’ কৃষ্ণকে পাল্টে দিলেন প্রেমের অবতার রূপে; বারোশত গোপিনীর এক অখ্যাত রাধার সাথে তাঁর প্রেমকাহিনী রচনা করে। এটা সত্যিই বিস্ময়কর।
খ.
পরবর্তীকালে চৌদ্দ শতকে মন্দিরের পুজারি চণ্ডিদাস ও বিধবা ধোপানি রামির প্রেমের মধ্য দিয়ে আমরা শুনতে পাই, “কহে চণ্ডিদাস, কানুর পীরিতি— জাতকুলশীল ছাড়া।” চণ্ডিদাসের উক্তি “শুনহ মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই” বাঙালি মানসে এক চিরস্থায়ী পরিবর্তনের সূচনা করে।
গ.
এই ধারায় ষোল শতকে সিলেট ও নদীয়ার আরেক বাঙালি সন্তান শ্রীচৈতন্য দেবের নেতৃত্বে আমরা আরেকটি বিপ্লব দেখতে পাই। তা হলো হিন্দু বা সনাতন ধর্মের চার বর্ণপ্রথানির্ভরতাকে তছনছ করে গুড়িয়ে দেয়া— সকলের মধ্যে প্রেম ছড়িয়ে দেয়া। এ বিপ্লবে মিছিল ও সঙ্গীতের ব্যবহার অপরিমেয় শক্তি ও গতি দান করে।
ঘ.
ইসলামের সুফিবাদি ধারা ব্যক্তির আত্মিক পরিশুদ্ধি ও সৃষ্টিকর্তার সাথে ভালোবাসার সম্পর্কের উপর গুরুত্ব আরোপ করে। অগণিত পির-ফকির-দরবেশ ইসলামের ভালোবাসার ও সমতার বাণী প্রচার করেন এবং একাজে তাঁদের অনুসারীগণ সঙ্গীত ব্যবহার করেন।
মনে রাখা দরকার মানবপ্রেমকে উর্ধে তুলে ধরার বৈষ্ণববাদ ও সুফিবাদ এক ধরনের সামাজিক বিদ্রোহ ও বিপ্লব হলেও শেষবিচারে এগুলো ছিল ধর্ম প্রভাবিত ধারা। ঈশ্বরকে পাবার উপায় হিসেবে তারা মানবপ্রেমের ধারা বিকশিত করেছেন।
জর্জ ভিলহেলম ফ্রিডরিখ হেগেলের দ্বন্দ্বতত্ত্ব বিষয়ে বলা হতো যে এর মাথাটা নিচে আর পা উপরে, তিনি দ্বন্দ্বতত্ত্ব মানলেও ভাববাদি ছিলেন; বলা হয় কার্ল মার্কস হেগেলের দ্বান্দ্বিকতাকে বস্তুবাদের মাধ্যমে সোজা দাঁড় করিয়ে দেন। একইভাবে বলা যায়, লালন বাঙালির মানবতাবাদি চিন্তা চেতনাকে ধর্মের খোলসমুক্ত করেন ও সাম্যবাদি ভিত্তি দেন। মানুষ-আকারের মধ্যে লালন নিরাকার-ঈশ্বর আবিষ্কার করেন। কোনো ধরনের অতিপ্রাকৃতিক সত্তা নয়, মানুষের শরীর তাঁর আরাধ্য হয়ে ওঠে। একাজে, এখানে আগেও বলা হয়েছে, বাউলদের অভ্যন্তরীণ অনুশীলনকেন্দ্রিকতার বিষয়টি তিনি গ্রহণ করেছেন বৌদ্ধ ধর্মের তান্ত্রিক ধারা থেকে; বৌদ্ধ ধর্মের মূল শিক্ষা হলো অহিংসা ও ভালোবাসা আর এর তান্ত্রিকগণ নিজেদের জীবনে অনুশীলনকে প্রাধান্য দেন; নিজেদের শুদ্ধতম বিকাশ নিশ্চিত করতে তাদের ছিল অনেক গোপন জীবনাচার। বলা বাহুল্য, বাউলদের অনুশীলন হলো লোভ-লালসা-কাম-ঘৃণা-বিদ্বেষ-হিংসা থেকে নিজেদের মুক্ত করার উপায়, উত্তরণের উপায়।
ঠিক এইখানে লালন হলেন বাঙালি জাতির মহত্তম দার্শনিক; তিনি অতুলনীয়; তাঁর চেয়ে স্বচ্ছ ও সহজভাবে বাস্তবকে উপলব্ধি করেছেন এমন দার্শনিক আমাদের সংস্কৃতিতে বিরল।
লালনের গানের দিকে তাকানো যাক। আগে বলা হয়েছে যে লালন অন্তত ২২টি বিষয় কেন্দ্র করে গান রচনা করেছেন ও গেয়েছেন। এগুলোর সব ধারা এখানে আলোচনা করা সম্ভব নয়; এর আগে লালনের পরিচয় অংশে মানুষের মধ্যে ভেদাভেদের বিষয়টিকে লালন কিভাবে অস্বীকার ও নাকচ করেন তা দেখানো হয়েছে। এখানে মানুষ বিষয়ে তাঁর কিছু গান থেকে উদ্ধৃতি দেয়া হচ্ছে। উল্লেখ্য, লালনের গানের কাঠামো হচ্ছে: প্রথমে একটি বিবৃতি দেয়া, পরে সে বিবৃতির পক্ষে বাস্তব উদাহরণ বা বিবরণ উপস্থাপন করা; আমরা এখানে উভয় দিকে তাকাবো।
১. কত জ্বিন ফেরেশতাগণ করে আরাধন জন্ম দিতে মানবে। এর গীতরূপভেদ: দেব-দেবতাগণ করেন আরাধন জন্ম দিতে মানবে।
২. এই মানুষে সেই মানুষ আছে। কত মুনিঋষি চার যুগ ধরে খুঁজে বেড়াচ্ছে।
৩. পেয়েছ মানব-জন্ম হেন দুর্লভ জনম আর কি হবে।
৪. এমন মানব জনম আর কি হবে, মন যা কর ত্বরায় কর এই ভবে।
৫. মানুষ তত্ত্ব যার সত্য হয় মনে, সে কি অন্য তত্ত্ব মানে।
৬. মানুষ ভজনে মানুষ হবি। মানুষ ছেড়ে ক্ষ্যাপা রে তুই মূল হারাবি। এর গীতরূপভেদ: মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি। মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপা রে তুই মূল হারাবি।
৭. সর্ব সাধন সিদ্ধ হয় তার, ভবে মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার।
৮. সহজ মানুষ ভজে দেখ না রে মন দিব্য জ্ঞানে। পাবি রে অমূল্য নিধি বর্তমানে।
৯. এই মানুষে আছে রে মন যারে বলে মানুষ-রতন।
১০.এই মানুষে মানুষ বিহার, মানুষ ধরে নিষ্ঠা হয় যার, সে কি বেড়ায় দেশ দেশান্তর, পিড়েয় পেড়োর খবর পায়।
এরকম আরো অনেক উদ্ধৃতি দেয়া সম্ভব যেগুলোতে মানুষ আকারের মধ্যে নিরাকার ঈশ্বরকে দেখতে পাবার কথা বলা হয়েছে। মানুষকে জ্বিন- ফেরেশতা-দেব-দেবতার মতো অতিপ্রাকৃতিক সত্তার চেয়ে উর্ধে তুলে ধরা হয়েছে, এমনকি মুনি-ঋষির চেয়েও বেশি মর্যাদা দেয়া হয়েছে। মানুষের জন্মকে এক জন্ম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, পরকালের বা পরজন্মের ধারণাকে নাকচ করা হয়েছে। বলা হয়েছে মানুষ তত্ত্ব যার কাছে সত্য সে অন্য কোন তত্ত্ব মানতে পারে না। মানুষকে পুজা করলে মানুষ হওয়া যায়; মানুষকে গুরু মানলে সব সাধনা পূরণ হয়; মানুষকে পুজা করলে বর্তমানকাল অসামান্য হয়, পরকালের পুরষ্কারের আশায় বর্তমানকালের অর্জনকে উপেক্ষা করা ঠিক নয়।
মার্কসবাদের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠাতা ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস যদিও বলেছেন যে অর্থনীতি মানুষি সম্পর্কে প্রধান নিয়ামক হলেও একমাত্র নিয়ামক নয়, তিনি অ-অর্থনৈতিক নিয়ামক-প্রভাবকের কথাও বলেছেন। কিন্তু ব্যবহারিকভাবে শ্রেণি সংগ্রামের কথা বলে সারা দুনিয়ায় কেবলমাত্র বৈষম্যের অর্থনৈতিক বা শ্রেণিগত বিষয়টিতে মনযোগ দিয়েছেন বাম-সমাজতন্ত্রী-কম্যুনিস্টগণ। পাশ্চাত্যের সমাজের সাথে আমাদের প্রাচ্যের সমাজে পার্থক্য রয়েছে; এখানে অর্থনৈতিক শ্রেণির বাইরেও অনেক সাংস্কৃতিক শ্রেণিভেদ কখনও কখনও এমনকি অর্থনৈতিক শোষণ-বৈষম্যের চেয়েও তীব্রতর হয়ে ওঠে। উদাহরণ হিসেবে আমাদের প্রাচ্য সমাজের হিন্দু-মুসলিম উভয় সমাজের ধর্ম-বর্ণ-পেশাগত পরিচয়নির্ভর বৈষম্যের কথা বলা যায়, যা এতটাই তীব্র ও নিপীড়নমূলক হয় যে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে তা মানবিক সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে, মানুষকে অবরুদ্ধ করে রাখে। প্রাচ্য সমাজের এ ভেদ-বিভেদ-বৈষম্যের দিকে না তাকিয়ে কেবলমাত্র অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণবাদি মার্কসবাদি হবার কোনো প্রয়োজন নেই।
একাত্তরে আমরা দেখেছি ধর্মের নামে আমাদের জাতির উপর চাপিয়ে দেয়া গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধ। আমরা দেখছি ধর্মের নামে শিয়া-সুন্নি বিরোধ ক্রমে আমাদের সমাজেও তীক্ষ্ম হয়ে উঠছে; ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপাসনালয়ে হামলা করা হচ্ছে; তাদের সহায়-সম্পদ গ্রাস করা হচ্ছে; বিভিন্নভাবে তাদের হেনস্তা করা হচ্ছে। ভেদ-বিভেদের পথ ধরে ক্রমে অসহিষ্ণুতা-সংঘাত-সহিংসতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। ক্ষমতাবাজির স্বার্থে সাম্প্রদায়িকতা ব্যবহার করা হচ্ছে। লালন জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্রের ভেদ-বিভেদ-বৈষম্য-সংঘাত-সহিংসতা কেবল উপেক্ষা ও নাকচই করেননি, উষ্মাও প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন—
জাত-কুল নিয়ে আছো যারা
যার যার জাত-কুল নিয়ে থাকো তারা
আমি কুল ধুইয়া কি জল খাইব রে
এমন কুলের মুখে ছাই রে।
অন্যত্র আরো বলেছেন—
জাত না গেলে পাই না হরি
কি ছার জেতের গৌরব করি
ছুঁসনে বলিয়ে
লালন কয় জাত হাতে পেলে
পোড়াতাম আগুন দিয়ে।
অর্থাৎ, তিনি ‘কুলের মুখে ছাই’ দিতে চেয়েছেন এবং জাতকে হাতে পেলে আগুন দিয়ে পোড়াতে চেয়েছেন। সেমতে আমাদেরও সাম্প্রদায়িক-জঙ্গিবাদি-পুঁজিবাদি ভেদ-বিভেদ-অসমতা-বৈষম্য-সহিংসতার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। তিনি তাকিয়ে আছেন, “এমন সমাজ কবে গো সৃজন হবে যেদিন হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ-খ্রিস্টান জাতি-গোত্রের ভেদ নাহি রবে।” তাঁর আরাধ্য সমাজ নির্মাণে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। তাঁর শিক্ষার ব্যাপকতর প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে আমাদের সে সমাজ নির্মাণের পথ প্রশস্ত করতে হবে।
পাঁচ. বাঙালির জাতীয়তাবাদ বিকাশে লালন সঙ্গীতের প্রভাব
হাজার বছরের ধারাবাহিকতায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক অভিঘাতে স্পষ্ট রূপ পায় বাঙালির জাতীয়তাবোধ; বাঙালির মধ্যে স্বাধীনতা অর্জন ও নিজের দেশ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা প্রখর হয়ে ওঠে। বাঙালির নবজাগরণের ধারায় ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে সশস্ত্র নিরস্ত্র উভয় পন্থায় বাঙালি রাজনৈতিক সংগ্রাম গড়ে তোলেন। সূর্যসেন চট্টগ্রামের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, রাসবিহারী বসু ঔপনিবেশিক সরকারের সদর দফতরে সশস্ত্র আক্রমণ পরিচালনা করেন আর পরে দেশত্যাগ করে প্রবাসী সরকার ও সেনাবাহিনী গঠন করেন, শরৎচন্দ্র বোস ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী যুক্ত বাংলার পক্ষে অবস্থান নেন, সুভাষ চন্দ্র বোস ব্রিটিশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন ও রাসবিহারী বোসের কাছ থেকে আজাদ হিন্দ ফৌজের দায়িত্ব বুঝে নেন। এখানে স্পষ্টভাবে মনে রাখা দরকার ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে বাঙালির যে সংগ্রাম, তা ছিল ‘জাতিসমূহের স্বাধীনতার সংগ্রাম’; ভারত তখন কোনো একক জাতির অখণ্ড দেশ ছিলনা। নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস ঘোষিত রাজনৈতিক কর্মসূচি জাতিগুলোর আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারভিত্তিক স্বাধীনতার পক্ষাবলম্বন করেছিল।
বিশ শতকের প্রথমার্ধব্যাপী বাঙালির এই যে প্রবল ও প্রচণ্ড রাজনৈতিক উত্থান, তার অনেক আগেই উনিশ শতকে লালনের বাউল তত্ত্বে বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় স্পষ্টরূপ লাভ করে।
বলা হয় যে বাঙালি জাতীয়তাবাদ হলো বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকেন্দ্রিক জীবন ও জাতীয়তাবোধ। তাহলে বাঙালির জীবন ও জাতীয়তাবোধটি কী? তা আমরা রাজনৈতিক ও সমাজতাত্ত্বিক সাহিত্যের কোথাও স্পষ্টভাবে দেখতে পাইনা, কারোর কাছে শুনিনা, কেবল অস্পষ্টতানির্ভর প্রকট ও উৎকট বাগাড়ম্বর শুনি।
বাঙালির জীবন ও জাতীয়তাবোধ হলো ভেদ-বিভেদ-অসমতা-বৈষম্য-সহিংসতার বিপরীতে সকল মানুষের জন্য ভালোবাসাবোধ। বাঙালির জীবন ও জাতীয়তার বোধ কেবল স্বজাতিকেন্দ্রিক বা এথনোসেন্ট্রিক নয়, অন্য জাতির প্রতি আগ্রাসী নয়; বরং তা মানবতার পক্ষে, সকল মানুষকে ভালোবাসার পক্ষে, সমতার পক্ষে, সাম্যের পক্ষে। এভাবেই অনুধাবন করতে হবে বাঙালি জাতীয়তাবাদ। এসব আমাদের সংস্কৃতির উপাদান, বাউল তত্ত্ব ও লালনের গানে এসব অতি স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয় উনিশ শতকে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ যদি ভাষা ও সংস্কৃতিভিত্তিক হয়ে থাকে, তাহলে লালনের তত্ত্বই তার প্রধানতম ভিত্তি, এবং অতি অবশ্যই রাজনৈতিক চিন্তা স্পষ্টতর হবার আগেই লালন তা তাঁর গানের মাধ্যমে প্রকাশ ও প্রচার করেছেন।
আবারও বলতে চাই, ঔপনিবেশিক ভারতে রাজনৈতিক চিন্তা স্পষ্ট হবার অন্তত একশ বছর আগে লালন আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই সংস্কৃতি পরে আমাদের রাজনৈতিক চিন্তাকে স্পষ্টতা দান করেছে— যদিও লালনের সাথে সম্পর্কিত করে কেউ তা বলেন না। বলেন না কারণ, সংস্কৃতি-জীবন-জাতীয়তাবোধ-জাতীয়তাবাদ ও লালনকে তারা স্পষ্টভাবে অনুধাবন করতে পারেন না।
এবং এমনকি বৈষম্যের বিরুদ্ধে সাম্যের পক্ষে লালন অবস্থান গ্রহণ করেন কার্ল মার্কসের জন্মেরও আগে। কার্ল মার্কসের জন্ম ১৮১৮ সালে, আর লালন ‘খেলকা’ গ্রহণ করেন ১৭৯৮ সালের আগে। মার্কস মারা যান ১৮৮৩ সালে, আর লালন ১৮৯০ সালে। এসব হিসেব ভুলে গেলে মোটেই চলবে না।
সাম্রাজ্যবাদী ও সাস্প্রদায়িক রাজনীতির ঐক্যবদ্ধ কূটচালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে বাঙালির রাজনৈতিক সংগ্রাম ১৯৪৭ সালে বাঙালির রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সাফল্য লাভ না করলেও, অল্প সময়ের জন্য তাতে একটি ‘ছেদ’ পরলেও, ১৯৭১ সালে স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাঙালি ১৯৪৭ সালের দ্বিজাতি তত্ত্বভিত্তিক সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নাকচ ও পরাভূত করে।
স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয় চার মূলনীতি: জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা।
ছয়. বাংলাদেশের সংবিধানে বর্ণিত চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি এবং বাঙালি সংস্কৃতির জীবন ও জাতীয়তাবোধ
লালন ও বাংলার বাউলগণ বাঙালি সংস্কৃতিতে জীবন ও জাতীয়তাবোধের যে বিকাশ ঘটিয়েছেন, তার আলোকে বাঙালি জাতির মুক্তিযুদ্ধের অর্জন ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান’ ঘোষিত চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতির একটি অতি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনার মাধ্যমে শেষ করা হচ্ছে বর্তমান আলোচনা।
ক. কেউ কেউ বলেন যে বাংলাদেশ কেবল বাঙালির দেশ নয়, তাই বাংলাদেশের সংবিধানে জাতীয়তাবাদ হিসেবে বাঙালি জাতীয়তাবাদ গ্রহণযোগ্য নয়। এক্ষেত্রে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে বাঙালির ভাষার অধিকার এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণ ও বিকাশে নিবেদিত সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় এদেশের জনগণের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা পুনর্গঠিত হয়েছে ও স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। উপরন্তু এ আলোচনাপত্রে দেখানো হয়েছে বাঙালি জাতীয়তাবাদ স্বজাতিকেন্দ্রিক নয়, আগ্রাসী নয়; বরং মানবিকতা ও সমতার পক্ষে। সেজন্য সংবিধানে জাতীয়তাবাদ বা বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিদ্যমানতা বাংলাদেশের অন্যান্য জনগোষ্ঠির জন্য হুমকি নয়। তারপরও, সংবিধান যেহেতু বাংলাদেশ ভূখণ্ডের সকল জাতির দলিল, এতে সকল জাতির বা জাতিসত্তার স্বীকৃতি নিশ্চিত করা দরকার।
খ. অর্থনৈতিক শোষণ-বঞ্চনা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে সমাজতন্ত্র অসমতাবিরোধী বাঙালি সংস্কৃতির সমতার ধারণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সংবিধানে সমাজতন্ত্র থাকার পরও সরকার পুঁজিবাদের পথ অনুসরণ করছে। সরকারকে সংবিধান অনুসরণ করতে হবে। সমাজতন্ত্রকে বিশ শতকের চর্চিত কাঠামোগুলোর বাইরে একুশ শতকে নতুন করে বিকশিত করার সম্ভাবনা অনুসন্ধান করতে হবে।
গ. গণতন্ত্র মানে সংখ্যালঘুর উপর সংখ্যাগুরুর আধিপত্য নয়। বাঙালি সংস্কৃতি মানবতাবাদী; আধিপত্যবাদী নয়। সেজন্য প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের বাইরে এসে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র বিকশিত করা দরকার।
ঘ. বাংলাদেশের সংবিধানের নির্দেশনা অনুসারে এর বাংলা পাঠ প্রাধান্য পায়। ইংরেজি পাঠে ধর্মনিরপেক্ষতার ভাষান্তর করা হয়েছে সেক্যুলারিজম হিসেবে। সেক্যুলারিজমের বাংলা অর্থ ইহজাগতিকতা। আমাদের সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থকরণ ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে বলা যে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়’। একথা বলে ইহজাগতিকতাকে নাকচ করা হয়, সকল ধর্মকে সমর্থনের নামে সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মমতের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করা হয় এবং ধর্ম না-মানার স্বাধীনতাকে নাকচ করা হয়। প্রকৃতপক্ষে আমাদের সংবিধানে বর্ণিত ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থকরণ ও ব্যাখ্যা হলো বাঙালি সংস্কৃতির বাউল তত্ত্বের বিপরীত মত। বাঙালি সংস্কৃতির বাউল তত্ত্বে জাতি-ধর্ম-বর্ণভিত্তিক ভেদ-বিভেদ-অসমতাকে নাকচ করা হয়। তাই বাংলাদেশের সংবিধানে বর্ণিত ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থকরণ ও ব্যাখ্যায় বাঙালি সংস্কৃতির প্রতিফলন থাকতে উচিত।
বাংলাদেশের সংবিধান বারবার ক্ষতবিক্ষত হয়েছে সামরিক-বেসামরিক স্বৈরতান্ত্রিক আক্রমণে। এই পাতাকাটা-ছেঁড়াফাটা সংবিধানের সম্ভাব্য আগামী পর্যালোচনা ও সংশোধনীর কালে চার মূলনীতি বিষয়ক এই পর্যালোচনাও বিবেচনা করা হবে সে প্রত্যাশা করছি।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর বাঙালিকে আবারও যখন সাম্প্রদায়িক-জঙ্গিবাদি-পুঁজিবাদি ভেদ-বিভেদ-অসমতা-বৈষম্য-সহিংসতার রাজনীতি মোকাবেলা ও চিরতরে বন্ধ করার সংগ্রাম পরিচালনা করতে হচ্ছে, তখন লালন বাঙালির নৈতিক ও বুদ্ধিবৃদ্ধিক প্রেরণা, সক্ষমতা ও ক্ষমতার ভিত্তি। লালনের সঙ্গীতে বিবৃত তাঁর তাত্ত্বিক চিন্তার পাঠ-আলোচনা-পর্যালোচনা-ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ-প্রচার-প্রচারণা সংগ্রামের নৈতিক ও বুদ্ধিবৃদ্ধিক প্রেরণা, সক্ষমতা ও ক্ষমতাকে শাণিত করবে।
