কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটোয়ারটেক সৈকতে কাঠের তৈরি একটি পর্যটন রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১০ জনের প্রাণহানি এবং বেশ কয়েকজনের অগ্নিদগ্ধ হওয়ার মর্মান্তিক খবর পুরো দেশকে গভীর শোকে নিমজ্জিত করেছে। অত্যন্ত জনপ্রিয় মেরিন ড্রাইভ সড়কসংলগ্ন টুপটুপ রিসোর্ট নামের ওই তিনতলা কাঠের স্থাপনায় শনিবার সকালে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনা আমাদের দেশের পর্যটন খাতের নিরাপত্তাব্যবস্থার চরম দুর্বলতা ও নজরদারির অভাবকে নতুন করে উন্মোচন করেছে। আনন্দ ও বিনোদনের জন্য পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরতে এসে মুহূর্তের মধ্যে এমন তাজা প্রাণের প্রস্থান অত্যন্ত হৃদয়বিদারক এবং একই সঙ্গে প্রশাসনিক উদাসীনতার এক স্পষ্ট দলিল।
প্রাথমিক তথ্য ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রিসোর্টটির তিনটি তলাই সম্পূর্ণ কাঠের তৈরি ছিল এবং এর রান্নাঘরের চুল্লি থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়। কাঠ অত্যন্ত দাহ্য পদার্থ হওয়ায় আগুন মুহূর্তের মধ্যে পুরো স্থাপনায় ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে সকালের দিকে যখন অধিকাংশ পর্যটক ঘুমে কিংবা বিশ্রামে ছিলেন, তখন অগ্নিকাণ্ড ঘটায় তারা নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার ন্যূনতম সুযোগটুকুও পাননি। এই ঘটনায় ঢাকা ও চুয়াডাঙ্গা থেকে আসা নারী ও শিশুসহ যে ১০ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আরও কয়েকজন গুরুতর দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন, তাদের এই অপূরণীয় ক্ষতির দায় কার? সমুদ্রসৈকত বা প্রাকৃতিক পরিবেশসংলগ্ন সংবেদনশীল এলাকায় এ ধরনের সম্পূর্ণ কাঠে তৈরি ও দাহ্য আবাসিক স্থাপনা কোন নিয়মে নির্মিত হয়েছিল, তা নিয়ে এখন বড় ধরনের প্রশ্ন উঠছে। রিসোর্টটি নির্মাণের ক্ষেত্রে জাতীয় বিল্ডিং কোড অনুসরণ করা হয়েছিল কি না এবং জরুরি অবস্থায় অগ্নিপ্রতিরোধক ও দ্রুত বের হওয়ার কোনো ব্যবস্থা ছিল কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বাস্তবে দেখা যায়, আইনের তোয়াক্কা না করে এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর তদারকির অভাবেই বাণিজ্যিক লাভের উদ্দেশ্যে এমন চরম ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা গড়ে উঠছে।
কক্সবাজার বাংলাদেশের প্রধান পর্যটনকেন্দ্র এবং প্রতিবছর লাখো দেশি-বিদেশি পর্যটক এখানে সমবেত হন। পর্যটকদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসন ও রিসোর্ট মালিকদের প্রধান নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব। অথচ ইনানীর এই রিসোর্টটিতে ফায়ার সেফটির প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, স্মোক ডিটেক্টর বা পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা ছিল কি না, তা নিয়ে ঘোর সংশয় রয়েছে। অতীতেও দেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র কিংবা বাণিজ্যিক ভবনে বারবার আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। দুর্ঘটনা ঘটার পরপরই একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয় এবং কিছুদিন পর তা লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যায়। এবারও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা সময়োপযোগী একটি পদক্ষেপ। তবে কেবল দায়সারা তদন্ত ও কাগুজে প্রতিবেদনের মধ্যে এই প্রক্রিয়াকে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করে রিসোর্ট মালিক ও সংশ্লিষ্ট গাফিলতিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা থেকে আমাদের সুদূরপ্রসারী শিক্ষা নেওয়া জরুরি। পর্যটনশিল্পকে টেকসই ও নিরাপদ করতে হলে নিয়মিত তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কাঠের বা অতিদাহ্য পদার্থের তৈরি অবকাঠামোর ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্নিপ্রতিরোধক প্রলেপ, ফায়ার অ্যালার্ম এবং কার্যকর ফায়ার ড্রিল বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ফায়ার সার্ভিস, ট্যুরিজম বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে কক্সবাজারসহ দেশের সব পর্যটন এলাকার হোটেল ও রিসোর্টগুলোর নিরাপত্তা ছাড়পত্র পুনর্মূল্যায়ন করা উচিত। নিয়মবহির্ভূত ও ঝুঁকিপূর্ণ কোনো প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে দেওয়া যাবে না।
ঢাকার বনশ্রী, খিলগাঁও কিংবা চুয়াডাঙ্গা থেকে ছুটি কাটাতে এসে এভাবে অকালে প্রাণ হারানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। পর্যটনের বিকাশ আমাদের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মানুষের জীবনের মূল্যের চেয়ে কোনো ব্যবসাই বড় হতে পারে না। রাষ্ট্র ও প্রশাসন যদি এখনই আইন প্রয়োগে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ না করে, তবে এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত অঘটন ভবিষ্যতেও ঘটে চলবে। নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি আমরা আশা করব, এই ট্র্যাজেডি যেন দেশের পর্যটন খাতকে কাঠামোগতভাবে নিরাপদ ও জবাবদিহিমূলক করার ক্ষেত্রে এক চূড়ান্ত চোখ-খোলা বার্তা হিসেবে কাজ করে।
