প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাবনা তৈরি হলে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বিশেষজ্ঞ, প্রশাসন ও ভুক্তভোগীদের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সমন্বিত পর্যালোচনা কাঠামো গঠন করা যেতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ঝুঁকি বাড়িয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এ পরিস্থিতি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানীকৃত কয়লা, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও তরল জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতায় চাপ সৃষ্টি করছে। এমন বাস্তবতায় দেশের নিজস্ব কয়লাসম্পদ ব্যবহারের সম্ভাবনা পুনর্মূল্যায়নে সরকারের উদ্যোগ যৌক্তিক। তবে জ্বালানি নিরাপত্তার তাগিদে কয়লা উত্তোলনের সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে এর অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা, পরিবেশগত ঝুঁকি ও সামাজিক মূল্য নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি।
দেশের পাঁচটি কয়লা ক্ষেত্রে বিপুল পরিমান মজুদ থাকার তথ্য দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। বর্তমানে বড়পুকুরিয়া ছাড়া অন্য খনিগুলো থেকে কয়লা উত্তোলন হচ্ছে না। অথচ দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। সরবরাহকারী দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া কিংবা আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যবস্থায় বিঘ্ন দেখা দিলে বিদ্যুৎ উৎপাদনও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এ অবস্থায় দেশীয় কয়লার সম্ভাবনা যাচাইয়ের পাশাপাশি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ এবং বিকল্প জ্বালানির সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। কোনো একটি জ্বালানি বা সরবরাহকারী দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোই হওয়া উচিত জাতীয় জ্বালানি কৌশলের মূল লক্ষ্য।
ভূগর্ভে বিপুল কয়লা মজুদ থাকার অর্থ এই নয় যে পুরোটা উত্তোলনযোগ্য কিংবা উত্তোলন করলেই অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়া যাবে। কয়লার মোট মজুদের বাজারমূল্যকে সম্ভাব্য আয় হিসেবে বিবেচনা করাও বিভ্রান্তিকর। প্রকৃত অর্থনৈতিক সুফল নির্ভর করবে উত্তোলনযোগ্য মজুদের পরিমাণ, কয়লার গুণমান, খনন ও পরিবহন ব্যয়, অবকাঠামো নির্মাণ, অর্থায়নের খরচ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ভবিষ্যৎ দামের ওপর। এর সঙ্গে জমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন, পানি ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ পুনরুদ্ধারের ব্যয়ও যুক্ত করতে হবে। আমদানীকৃত কয়লার পরিবর্তে দেশীয় কয়লা ব্যবহার করলে প্রকৃতপক্ষে কত বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, তারও নির্ভরযোগ্য হিসাব প্রয়োজন। ফলে প্রতিটি খনির জন্য পৃথক আর্থিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া সমীচীন হবে না।
বিশেষ করে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী কয়লা ক্ষেত্রের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিলে বিপুল জমি ব্যবহার, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্থানান্তর, কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে পরিবর্তনের মতো ঝুঁকি গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে। খনির আশপাশের মানুষের জীবিকা, সামাজিক সম্পর্ক ও স্থানীয় অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও উপেক্ষা করা যাবে না। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে জমির বাজারমূল্য অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দিলেই তাদের সব ক্ষতি পূরণ হয় না। কৃষিজমি হারানো মানুষের বিকল্প জীবিকা, পুনর্বাসিত পরিবারের বাসস্থান এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সুপেয় পানির সুযোগ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে কয়লা উত্তোলনের সিদ্ধান্তের আগে পুরনো সমীক্ষাগুলো স্বাধীন ও স্বার্থের সংঘাতমুক্ত তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। উন্মুক্ত ও ভূগর্ভস্থ—উভয় পদ্ধতির প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, ব্যয়, নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত প্রভাব তুলনা করে দেখতে হবে। কোনো পদ্ধতিকেই আগাম সমাধান হিসেবে ধরে নেয়া যাবে না। একই সঙ্গে উত্তোলন না করার বিকল্পটিও মূল্যায়নের আওতায় রাখতে হবে। সমীক্ষার ফলাফল, ব্যয়ের হিসাব, ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্তের যুক্তি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হলে নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আস্থা অর্জন সহজ হবে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাবনা তৈরি হলে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বিশেষজ্ঞ, প্রশাসন ও ভুক্তভোগীদের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সমন্বিত পর্যালোচনা কাঠামো গঠন করা যেতে পারে। পুনর্বাসন, ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও জীবিকা পুনর্গঠনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট এলাকায় খননকাজ শুরু করা উচিত নয়। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর, পানির গুণমান, মাটির উর্বরতা ও কৃষি উৎপাদনের ভিত্তিমূলক তথ্য সংগ্রহ করে নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রাখতে হবে। পরিবেশগত ক্ষতি হলে প্রতিকার, ক্ষতিপূরণ ও প্রয়োজনে কার্যক্রম স্থগিতের বিধানও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কয়লা উত্তোলনের সম্ভাবনা যাচাইয়ের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি রূপান্তরের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। বৈশ্বিক সংকটে বিভিন্ন দেশ কয়লার ব্যবহার বাড়ালেও তাদের পরিস্থিতি বাংলাদেশের সঙ্গে পুরোপুরি অভিন্ন নয়। তাই অন্য দেশের সাময়িক সিদ্ধান্ত অনুসরণ না করে নিজস্ব চাহিদা, অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও পরিবেশগত বাস্তবতার ভিত্তিতে নীতিনির্ধারণ করতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ, বিদ্যুৎ উৎপাদনে দক্ষতা বৃদ্ধি, সঞ্চালন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং আমদানির উৎস বহুমুখীকরণও জ্বালানি নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া উচিত। দেশীয় কয়লা উত্তোলনে বড় বিনিয়োগের আগে ভবিষ্যৎ জ্বালানি চাহিদা ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে সম্পদ আটকে যাওয়ার ঝুঁকিও বিবেচনা করা দরকার।
নিজস্ব কয়লাসম্পদ ব্যবহারের সম্ভাবনা যাচাইয়ে সরকারের উদ্যোগ তাই অব্যাহত থাকা উচিত, তবে সিদ্ধান্ত হতে হবে তথ্যনির্ভর ও জনস্বার্থকেন্দ্রিক। কোনো খনিতে উত্তোলন অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক এবং সামাজিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি গ্রহণযোগ্য মাত্রায় নিয়ন্ত্রণযোগ্য প্রমাণ হলে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থার অধীনে এগোনো যেতে পারে। বিপরীতে ক্ষতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলে বিকল্প জ্বালানি কৌশল গ্রহণ করতে হবে। জাতীয় স্বার্থে লক্ষ্য শুধু ভূগর্ভস্থ কয়লা উত্তোলন নয়; বরং অর্থনৈতিক সাশ্রয়, পরিবেশ সংরক্ষণ ও মানুষের অধিকার সমুন্নত রেখে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
