সাজছে রাজবাড়ীর ৪৬১ পূজামণ্ডপ, বিভিন্ন মন্দিরে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি

প্রভাত সংবাদদাতা, রাজবাড়ী: রাজবাড়ীতে এ বছর ৪৬১টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে, যা গত বছরের তুলনায় ২১টি বেশি। আগামী ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে শুরু হবে দুর্গোৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা। এ উপলক্ষ্যে জেলার বিভিন্ন মন্দিরে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। পৌরাণিক কাহিনি ও বৈচিত্র্যময় থিমে সাজানো হচ্ছে পূজামণ্ডপগুলো।
সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলার অনেক মন্দিরে প্রতিমা তৈরির কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। কোথাও চলছে রং-তুলির শেষ আঁচড়, আবার কোথাও মণ্ডপ সাজসজ্জায় ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগরেরা। প্রতিমাশিল্পীদের নিপুণ হাতে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে দেবী দুর্গার প্রতিমা। পাশাপাশি তৈরি করা হচ্ছে দেবী লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের প্রতিমা। মণ্ডপের বাইরের প্যান্ডেল ও আলোকসজ্জার কাজও শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এবার জেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে থাকছে বৈচিত্র্যময় আয়োজন। কোথাও দেবী দুর্গার সঙ্গে তুলে ধরা হচ্ছে রামের অকালবোধনের চিত্র, আবার কোনো কোনো মন্দিরে আয়োজন করা হচ্ছে থিমভিত্তিক পূজা। এসব আয়োজন ঘিরে আয়োজক ও দর্শনার্থীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে বাড়তি আগ্রহ।
দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে প্রতিমা তৈরি ও মণ্ডপসজ্জার পাশাপাশি চলছে আলোকসজ্জা, বিদ্যুৎ সংযোগ এবং দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রস্তুতি। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, মন্দিরগুলোতে বিকল্প বিদ্যুতের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। অনেক মন্দিরে স্থাপন করা হয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা। পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক দল গঠনসহ নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন নিরাপত্তামূলক উদ্যোগ।
পূজার দিনগুলোতে জেলার মণ্ডপগুলোতে বিভিন্ন বয়সী মানুষের সমাগম ঘটবে। উৎসব নির্বিঘ্ন করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকেও নেওয়া হচ্ছে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা। সব মিলিয়ে দুর্গোৎসবকে ঘিরে জেলা পূজা উদযাপন কমিটি, প্রতিমাশিল্পী ও আয়োজকদের মধ্যে এখন ব্যস্ততা তুঙ্গে।
পুলিশ সুপার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলায় মোট ৪৬১ টি পূজা মণ্ডপে শারদীয় দুর্গা পূজা উদযাপন করা হবে। এর মধ্যে রাজবাড়ী সদর উপজেলায় (পৌরসভা সহ) ১১৮ টি, গোয়ালন্দ উপজেলায় (পৌরসভা) ২৬ টি, বালিয়াকান্দি উপজেলায় ১৫৮ টি, পাংশা উপজেলায় (পৌরসভা সহ) ১০৪ টি ও কালুখালী উপজেলায় ৫৫টি পূজা মণ্ডপে দূর্গা পূজা অনুষ্ঠিত হবে।
রাজবাড়ীর জমিদারবাড়িতে দুর্গাপূজার আয়োজন প্রসঙ্গে উৎসব চক্রবর্তী বলেন, প্রতিবছরের মতো এবারও জমিদারবাড়িতে শারদীয় দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। দেবী দুর্গার কাছে প্রার্থনা, সমাজ ও দেশ থেকে সব অন্যায়, অবিচার ও দুঃখ-কষ্ট দূর হোক। পৃথিবীর সব মানুষ ভালো থাকুক, সবার জীবনে শান্তি ও কল্যাণ বয়ে আসুক—এ প্রত্যাশা নিয়েই পূজার আয়োজন করা হয়েছে।
স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বী অভিজিৎ কুমার সোম বলেন, আগামী ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে শারদীয় দুর্গাপূজা শুরু হবে এবং ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে পূজার সমাপ্তি ঘটবে। দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনার পাশাপাশি জাতি, ধর্ম ও বর্ণনির্বিশেষে সবার কল্যাণ ও শান্তি কামনায় এ পূজা অনুষ্ঠিত হবে। তিনি বলেন, প্রশাসনের সার্বিক তদারকি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের মাধ্যমে যেন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গাপূজা উদযাপন করতে পারি, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
রাজবাড়ী শহরের ধুঞ্চি পূর্বপাড়া সার্বজনীন দুর্গা মন্দির কমিটির সভাপতি শ্রীকান্ত কুমার বিশ্বাস রাহুল বলেন, এবার তাঁদের মন্দিরে দুর্গাপূজার পাশাপাশি শ্রীরামের অকালবোধন, রাম-রাবণের যুদ্ধ ও রাবণ বধের থিম শো প্রদর্শন করা হবে। এ ছাড়া ৫২ খণ্ডের প্রতিমায় আদি যোগী, শিব ও শ্রীকৃষ্ণের জন্মসহ বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনি তুলে ধরা হবে। সনাতন ধর্মের ইতিহাস ও পৌরাণিক কাহিনি সম্পর্কে মানুষকে জানানোই এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। তিনি ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবাইকে মণ্ডপে আসার আমন্ত্রণ জানান।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক স্বপন কুমার বিশ্বাস বলেন, এ বছর রাজবাড়ী জেলায় ৪৬১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে, যা গত বছরের তুলনায় ২১টি বেশি। প্রতিবছরের মতো এবারও আনন্দঘন পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের সঙ্গে তাঁদের আলোচনা হয়েছে। তাঁরা সার্বিক নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েছেন। কেন্দ্রীয় নির্দেশনার কপি প্রতিটি মন্দিরে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি মন্দিরে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সুপার মীর মনির হোসেন বলেন, শারদীয় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠুভাবে উদযাপনে পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট, বিজিবি, আনসার, এসআরবি, স্ট্রাইকিং ফোর্স ও মন্দির কমিটির স্বেচ্ছাসেবকেরা দায়িত্ব পালন করবেন। পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় বাইক পার্টি, গোয়েন্দা সদস্য ও সাদাপোশাকের পুলিশ মোতায়েন থাকবে। তিনি বলেন, এবার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক ও পূজা কমিটির সদস্যদের সমন্বয়ে যানবাহন ও জনসমাগম নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে দর্শনার্থীরা নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে পূজা উপভোগ করতে পারেন।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধন অটুট রেখে নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হবে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব।
More News Of This Category

