শারদীয় দুর্গোৎসব নানা মহিমায় মহিমান্বিত এক উৎসব। সনাতন বাঙালির জীবনের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে এ উৎসবের রঙ। শুধু পূজা, অর্চনা কিংবা অঞ্জলি,ভক্তি নয়- দুর্গোৎসবের সঙ্গে মিশে আছে আমাদের চিরায়ত জীবন ও সংস্কৃতি।
পূরাণ জানায়, কন্যা উমাকে কৈলাসে পাঠিয়ে মা মেনকা গভীর উদ্বেগে দিনপার করছিলেন। কেননা, উমা রাজার কন্যা। কিন্তু বিয়ে করে শ্মশানচারী সংসার বিবাগী শিবের সঙ্গে সংসার করেন। এ যেন বাঙালি মায়েদের দৈনন্দিন দুশ্চিন্তা। কেমন আছে তাঁর মেয়ে? বিয়ের পর কন্যার জন্য মায়ের এ উৎকণ্ঠা আসলে সর্বজনীন। শরতের এক ভোরে পর্বতরাজ মহিষী মেনকা ‘কুস্বপন’ দেখে গিরিরাজকে তাগাদা দেন কন্যা উমাকে কৈলাস থেকে বাপের বাড়ি নিয়ে আসার জন্য। কন্যার জন্য মায়ের এ আনচান যেন প্রতিটি বাঙালি মায়ের হৃদয়ে ছড়িয়ে যায়।
হিন্দু পুরাণ মতে, দেবতা ব্রহ্মার পুত্র সন্তান প্রজাপতি দক্ষ কঠোর তপস্যায় আদিশক্তি দেবী দুর্গাকে তুষ্ট করে দেবীকে নিজ কন্যারূপে পাওয়ার বর প্রার্থনা করেন। ফলে দেবী দক্ষগৃহে জন্ম নেন সতী নামে। এদিকে শিবের প্রতিপক্ষ দক্ষের কন্যা সতী প্রেমে পড়েন সংসার বিবাগী শিবের। পিতা দক্ষের অমতেই বিয়ে হয়ে যায় শিব ও সতীর। পরবর্তী সময়ে দক্ষ এক বিরাট যজ্ঞের আয়োজন করেন, যা দক্ষযজ্ঞ নামে পরিচিত। অনেকেই সেখানে আমন্ত্রিত হলে ও শিব ছিলেন ব্রাত্য। কন্যা সতী সে যজ্ঞে উপস্থিত হলে, পতি শিবের নিন্দা শুনে অপমানে দেহত্যাগ করেন। সংবাদ পেয়ে শিব তাঁর অনুচরসহ পন্ড করেন দক্ষের যজ্ঞ। একইসাথে সংকল্প নেন, এ পৃথিবী তিনি ধ্বংস করে দেবেন। বিষ্ণু তখন তাঁকে থামান। এরপর শোকাভিভূত শিব মগ্ন হন গভীর তপস্যায়।
এদিকে সতী পুনরায় জন্ম নেন পর্বতরাজ হিমালয়ের কন্যা হয়ে। এজন্মেও পার্বতী শিবকে পতি হিসেবে পেতে গভীর তপস্যায়রত হন। সে তপস্যা দেখে মা মেনকা তাকে নাম দেন ‘উমা’। তপস্যার ফলে অবশেষে মিলন হয় শিব-পার্বতীর। পার্বতী পতি শিবের সঙ্গে কৈলাস চলে যান। কিন্তু মায়ের মন মানেনা। নানা কুচিন্তা তাড়িয়ে বেড়ায় দিনরাত্রি। কেমন আছে তাঁর মেয়ে? কেমন যাচ্ছে পতিগৃহে দিনকাল।
সেই আকুতি ও তাগিদই ধরা দেয় আগমনী গানে। মা মেনকার বয়ানে কখনও গিরিরাজের প্রতি, কখনোবা দুর্গার প্রতি আকুতি প্রকাশ পায়। কিন্তু, এ আকুতি যেন বাংলার মায়েদেরই কণ্ঠস্বর। যেমন এক জায়গায় মা মেনকা গিরিরাজকে বলছেন—
‘কামিনী করিল বিধি/ তাইযে তোমারে সাধি/ নারীর জনম কেবল/ যন্ত্রণা সহিতে।’ এর মানে, যিনি গর্ভেধারণ করেন স্বয়ং ঈশ্বরীকে, তাঁকেও হায় পিতৃতন্ত্রের কাছে বশ্যতা মানতে হয়। আবার, উমা বাপের বাড়ি ফেরার পরে মা মেনকা বলেন—‘যদি আসে মৃত্যুঞ্জয়/ উমা নেবার কথা কয়/ তখন মায়ে ঝিয়ে করব ঝগড়া/ জামাই বলে মানিব না। ’মায়ের কাছে মেয়ে কখনো বড় হয়না। সে থাকে চিরকালের ছোট্ট খুকিই। তাই যখন গিরিরাজ মহিষ মর্দিনী দুর্গাকে ঘরে নিয়ে আসেন, মা মেনকা অবাক হয়ে বলেন—‘মোর লীলাময়ী চঞ্চলারে ফেলে/ এ কোন দেবী মূর্তি নিয়ে এলে,/ এ যে মহীয়সী মহামায়া, / বামা মহিষমর্দিনী।’
মা দুর্গা আসেন বাবার বাড়ি, মর্ত্যে। ছেড়ে আসেন স্বামীর বাড়ি কৈলাসধাম; কিন্তু বাবা ভোলানাথ আর ছেলে কার্তিক ও গণেশ, মেয়ে সরস্বতী ও লক্ষ্মী কে ছেড়ে আসেন না। সবাই একসঙ্গে আসেন। তিনি শুধু দেবী নন, তিনি ঘরের মেয়ে; তিনি উমা, তিনি পার্বতী, তিনি দুর্গা।তাঁর আগমনকে ঘিরে মর্ত্যে উৎসবের আয়োজন, ঢাকের বাদ্য, আলোর ঝলকানি, নতুন পোশাক আর মানুষের মিলনমেলা। কিন্তু এই সমস্ত আয়োজনের অন্তরালে যে অনুভূতিটি সবচেয়ে গভীরভাবে প্রবহমান, তা হলো—ঘরে ফেরার আনন্দ।
দুর্গাপূজার বহুমাত্রিক ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্যের মধ্যে বাঙালির কল্পনায় উমার পিতৃ গৃহে প্রত্যাবর্তন এক অনন্য আবেগের জন্ম দেয়। এখানে দেবী দূর আকাশের অধিষ্ঠাত্রীকোনো অলৌকিক শক্তিমাত্র নন; তিনি আমাদের ঘরের মেয়ে, যিনি সংসার ছেড়ে অন্য সংসারে গেছেন, যাঁর জন্য মা মেনকার মন কাঁদে, যাঁর আগমনের অপেক্ষায় পিতৃগৃহের প্রতিটি দিন যেন দীর্ঘ হয়ে ওঠে। তাঁর ফিরে আসা তাই নিছক পৌরাণিক ঘটনা নয়; এটি মানুষের চিরন্তন বিচ্ছেদ ও পুনর্মিলনের গল্প, মাতৃত্বের আকুলতার গল্প, কন্যার প্রতি পরিবারের নিঃশর্ত ভালোবাসার গল্প।
দেবী দুর্গার মহিমা যেখানে অসুর বধে, সেখানে বাঙালির উমা-কল্পনার মহিমা তাঁর ঘরে ফেরায়। একদিকে তিনি মহিষাসুরমর্দিনী, অন্যদিকে তিনি মেনকার আদরের মেয়ে। একদিকে দশভুজা শক্তির প্রতীক, অন্যদিকে পিতৃগৃহে ফিরে আসা স্নেহকাতর কন্যা। এই দুই পরিচয়ের মধ্যবর্তী সেতুটিই বাঙালির সংস্কৃতিকে দিয়েছে এক বিশেষ মানবিকমাত্রা। দেবত্ব এখানে মানবিকতাকে অতিক্রম করে দূরে সরে যায়না; বরং মানুষের সম্পর্ক, স্মৃতি ও অনুভূতির মধ্যেই নিজের অর্থ খুঁজে পায়।
হিন্দু পুরাণে দুর্গা ও পার্বতীর পরিচয় বহুমাত্রিক। শাক্ত ঐতিহ্যে দেবী আদ্যাশক্তি, বিশ্বজননী এবং অসুরবিনাশিনী। দেবী মাহাত্ম্য বা দুর্গা সপ্তশতীতে দেবী মহিষাসুরকে পরাজিত করে দেবতাদের স্বর্গরাজ্য পুনরুদ্ধার করেন। এই আখ্যানের কেন্দ্রে রয়েছে দেবীশক্তির স্বয়ং সম্পূর্ণতা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং বিশ্বব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা। অন্যদিকে, শিবের পত্নী পার্বতীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পৌরাণিক ধারায় তাঁর পিতৃপরিবার, দাম্পত্যজীবন ও মাতৃপরিচয়ের নানাদিক উঠেআসে। বাংলার দুর্গাপূজার প্রচলিত সাংস্কৃতিক কল্পনায় এই বৃহৎ পৌরাণিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একঘরোয়া, আবেগময়আখ্যান—বছরের কয়েকটি দিনের জন্য উমার বাপের বাড়ি আসা।
এই ঘরোয়া আখ্যানের সঙ্গে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি: উমার আগমন ও বিজয়ার বিদায়কে ঘিরে বাঙালি যে আবেগময় পারিবারিক ছবি নির্মাণ করেছে, তা পুরাণের কোনো একক গ্রন্থে হুবহু বর্ণিত পূর্ণাঙ্গ কাহিনি নয়। বিভিন্ন পৌরাণিকধারা, শাক্ত উপাসনা, বাংলা মঙ্গল কাব্যের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল এবং আগমনী-বিজয়ার গানের সম্মিলিত প্রভাবে এই কল্পনা বাঙালির নিজস্ব সাংস্কৃতিক রূপ পেয়েছে।
মিথের এই রূপান্তর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একটি ধর্মীয় আখ্যান যখন কোনো জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, অভিজ্ঞতা ও আবেগের সঙ্গে মিশে যায়, তখন সেটি কেবল ধর্ম বিশ্বাসের বিষয় থাকেনা; হয়ে ওঠে সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ। বাঙালি উমাকে নিজের ঘরের মেয়ে হিসেবে কল্পনা করেছে বলেই দেবীর আগমন ঘিরে তৈরি হয়েছে মায়ের অপেক্ষা, বাবার স্নেহ, প্রতিবেশীর আনন্দ, বিদায়ের বেদনা এবং আবার ফিরে আসার আশ্বাস।
উমার ঘরে ফেরার গল্পে মা মেনকার অবস্থান বিশেষভাবে হৃদয়স্পর্শী। তিনি জানেন, তাঁর মেয়ে দেবী; জানেন, তাঁর কন্যার মহিমা পৃথিবীর সীমা ছাড়িয়ে বিস্তৃত। তবু মাতৃত্বের কাছে দেবত্বের এই বিপুল পরিচয় যেন কখনো কখনো গৌণ হয়ে যায়। মেনকার কাছে উমা প্রথমত তাঁর মেয়ে—যে দূরে থাকে, যার জন্য মন কাঁদে, যাকে কাছে পেলে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটে।
এই অনুভূতির মধ্যে মানব মনস্তত্ত্বের একটি গভীর সত্য লুকিয়ে আছে। মা ও সন্তানের সম্পর্ক কেবল জৈবিক বন্ধন নয়; এটি স্মৃতি, অভ্যাস, পরিচর্যা, স্পর্শ, ভাষা ও নিরাপত্তাবোধের দীর্ঘনির্মাণ। সন্তানের অনুপস্থিতি তাই শুধু একটি মানুষের দূরে থাকা নয়; মায়ের প্রতিদিনের জীবনে পরিচিত একটি ছন্দের অনুপস্থিতি।
উমার আগমনী গানগুলোতে মেনকার আকুলতা যেন সেই চিরন্তন মাতৃমনেরই সংগীতরূপ। প্রচলিত আগমনী গানের একটি সুপরিচিত পংক্তি—
“যাও যাও গিরি, আনিতে গৌরী।” এই সংক্ষিপ্ত আহ্বানের মধ্যে শুধু দেবীকে ফিরিয়ে আনার অনুরোধ নেই; আছে মায়ের অসহায় আকুলতা, দীর্ঘ প্রতীক্ষার ক্লান্তি এবং মেয়েকে একবার কাছে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। গিরিরাজ হিমালয়ের কাছে মেনকার আবেদন যেন পৃথিবীর সব মায়ের কাছে একই আবেদন—দূরে থাকা সন্তানটিকে একবার ঘরে ফিরিয়ে দাও।
বাঙালি সংস্কৃতিতে কন্যার পিতৃগৃহ ত্যাগের সঙ্গে দুর্গাপূজার আগমন-বিজয়ার একটি আবেগময় সাদৃশ্য দীর্ঘকাল ধরে অনুভূত হয়েছে। উমার কৈলাসে গমন ও পিতৃগৃহে প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে যে সাংস্কৃতিক কল্পনা তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে বাংলার প্রচলিত বিবাহ সংস্কৃতি ও কন্যার বিদায়ের অভিজ্ঞতার একটি সম্পর্ক রয়েছে। তবে এই সম্পর্ককে একমাত্রিকভাবে দেখা উচিত নয়। সব কন্যার জীবন এক রকম নয়, সব পরিবারে বিবাহের পর কন্যার অবস্থান ও এক নয়। আধুনিক সমাজে বহু নারী শিক্ষা, পেশা, স্বাধীনতা ও নিজস্ব সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নিজেদের জীবন নির্মাণ করছেন। তবু কন্যার শৈশবের বাড়ির সঙ্গে আবেগীয় সম্পর্ক বহু মানুষের জীবনে একটি স্থায়ী অনুভূতি হয়ে থাকে।
একটি মেয়ে যখন বড় হয়, তার সঙ্গে বাড়ির সম্পর্ক ও বদলে যায়। এক সময় যে ঘর ছিল তার সমগ্র পৃথিবী, পরে সেটিই হয়ে ওঠে স্মৃতির ঠিকানা। যে জানালা দিয়ে সে বর্ষার বৃষ্টি দেখত, যে উঠোনে শিউলি কুড়াত, যে বারান্দা ছিল খেলার আঙিনা সেসব স্থান ধীরেধীরে তার জীবনের মানচিত্রে স্মৃতির চিহ্ন হয়ে থাকে। উমা যেন সেই কন্যারই পৌরাণিক প্রতিরূপ, যিনি জীবনের অন্য পরিসরে গিয়েও নিজের শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক হারাননা। তাঁর ঘরে ফেরার অর্থ অতীতের কাছে ফিরে যাওয়া নয়; বরং নিজের পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের সঙ্গে আবার সংযোগ স্থাপন করা।
বাঙালির ঘর তাই শুধু ইট, কাঠ ও ছাদের সমষ্টি নয়।ঘর হলো এমন একটি স্থান, যেখানে মানুষকে তার অর্জন, ব্যর্থতা কিংবা সামাজিক পরিচয়ের হিসাব দিয়ে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়না। সেখানে সে কারও সন্তান, কারও আপনজন, কারও স্মৃতির অংশ। এই নিঃশর্ত গ্রহণযোগ্যতার আকাঙ্ক্ষাই হয়তো উমার প্রত্যাবর্তনকে এত গভীরভাবে মানবিক করে তোলে। আবার মানুষের জীবনে ঘরের ধারণা বহুমাত্রিক। জন্মস্থান, পারিবারিক বাড়ি, শৈশবের পাড়া কিংবা দূরদেশে থাকা একটি পরিচিত ঘর—সবই কোনো না কোনো ভাবে মানুষের আত্মপরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত। নৃতত্ত্ব ও সমাজবিজ্ঞানের আলোচনায় ঘরকে শুধু বসবাসের স্থান হিসেবে নয়, স্মৃতি, সম্পর্ক, পরিচয় এবং সামাজিক নিরাপত্তার পরিসর হিসেবেও দেখা হয়।উমার ঘরে ফেরা এই বহুমাত্রিক ধারণাকে প্রতীকী রূপ দেয়। কৈলাস তাঁর বর্তমান আবাস, কিন্তু পিতৃগৃহ তাঁর শৈশব ও আত্মীয়তার স্মৃতিবাহী স্থান। দুটি স্থান পরস্পরের বিরোধী নয়; বরং তাঁর জীবনের ভিন্ন ভিন্ন মাত্রাকে ধারণ করে।
মানুষের ক্ষেত্রে ও এমন হয়। যে ব্যক্তি জীবনের প্রয়োজনে শহর ছেড়ে অন্য শহরে যায়, যে তরুণ উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমায়, যে শ্রমজীবী মানুষ কাজের সন্ধানে পরিবার থেকে দূরে থাকে, কিংবা যে কন্যা বিবাহের পর অন্য সংসারে জীবন শুরু করে—তাদের প্রত্যেকের জীবনেই ঘর একটি জটিল আবেগীয় ধারণা। নতুন জায়গায় জীবন গড়ে উঠলে ও পুরোনো ঘরের স্মৃতি মুছে যায় না।
কিন্তু বাংলাদেশের সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে উমারা কেমন আছেন-সে প্রশ্নটা অত্যন্ত জরুরী। নারীর নিরাপত্তাহীনতা ক্রমশ দেশটাকে পেছনে নিয়ে যাচ্ছে। ঘরে,বাইরে কোথাও বাংলাদেশের উমারা নিরাপদে নেই। ধর্ষণ, হেনস্তা, পোশাকের জন্য নিগৃহীত হওয়া, ডিজিটাল বুলিং এখন এমন মাত্রায় পৌছেছে যে-নিজেদের সভ্য জাতি হিসেবে পরিচয় দেয়ার জায়গাটা ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। সেই বাস্তবতা নিয়েও এবারের উমার আগমনকে দেখার প্রয়াস রয়েছে।
কেন আমাদের কন্যার ঘরে ফেরা নিয়ে এতো দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়? তার নিজের বাড়ি, নিজের সিদ্ধান্ত এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে সমাজের কেন এতো প্রশ্ন? অনেক সময় এত কঠোর? কেন কন্যাকে একদিকে পরিবারের সম্মান ও স্নেহের কেন্দ্র হিসেবে দেখা হয়, অন্যদিকে তার স্বাধীনতা, পেশা, চলাফেরা কিংবা জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়?
দুর্গাপূজার উমা কল্পনা এই বৈপরীত্য নিয়ে ভাবার সুযোগ তৈরি করে। যে দেবীকে আমরা শক্তির প্রতীক হিসেবে পূজা করি, তাঁর মানবিক প্রতিরূপ কন্যাটিকে কি আমরা সমানভাবে স্বাধীন ও শক্তিমান হিসেবে দেখতে প্রস্তুত? যে মায়ের আকুলতা আমাদের স্পর্শ করে, বাস্তব জীবনে সেই মায়ের মেয়ের নিজের পছন্দের জীবন বেছে নেওয়ার অধিকার আমরা কতটা সম্মান করি?
এখানে দেবীকে পূজা করার সঙ্গে নারীকে মর্যাদা দেওয়ার পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। প্রতীকী শ্রদ্ধা বাস্তব জীবনের সমতা নিশ্চিত করেনা। নারীর প্রতি সম্মান তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা তার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, মতপ্রকাশ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারে প্রতিফলিত হয়।
বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতায় উমার ঘরে ফেরা তাই কেবল কন্যার প্রতি আবেগের উদযাপন নয়; এটি কন্যার অধিকার নিয়ে নতুন করে ভাবারও উপলক্ষ। যে ঘর কন্যাকে ভালোবাসে, সেই ঘর তার স্বপ্নকে ভয় পাবে কেন? যে সমাজ তার ফিরে আসায় আনন্দিত হয়, সেই পরিবার তার নিজের মতো করে বাঁচার আকাঙ্ক্ষাকেও সম্মান করবেনা কেন?
আবার উমার ঘরে ফেরার আবেগকে যদি কেবল কন্যা ও মায়ের সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখি, তাহলে দেবীর বৃহত্তর পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক অনালোচিত থেকে যায়। দুর্গা একইসঙ্গে মাতৃমূর্তি, জগৎজননী, যোদ্ধা, রক্ষাকর্ত্রী এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক। দেবী মাহাত্ম্যতে দেবীর আবির্ভাব দেবতাদের সম্মিলিত শক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও তিনি নিজেই অসুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন এবং বিজয় অর্জন করেন। এই আখ্যান নারীত্বকে কেবল কোমলতা, স্নেহ ও মাতৃত্বের মধ্যে আবদ্ধ রাখেনা; বরং ক্ষমতা, সাহস, ক্রিয়া ও আত্মনির্ভরতার সঙ্গে যুক্ত করে।
ফলে দুর্গাপূজা বাঙালির জীবনে শুধু ধর্মীয় আচারনয়; এটি একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসব। পূজামণ্ডপ, প্রতিমাশিল্প, ঢাক, আলোকসজ্জা, সংগীত, সাহিত্য, পোশাক, খাদ্যসংস্কৃতি ও সামাজিকমিলন—সব মিলিয়ে উৎসবটি একটি বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরি করে।
বাংলার দুর্গাপূজায় এই সামষ্টিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঘরে ফেরার আবেগ। মণ্ডপ যেন একটি বৃহত্তর পিতৃগৃহ, যেখানে পরিচিত-অপরিচিত মানুষ একত্রিত হয়। শহরের ব্যস্ত মানুষ, প্রবাসী আত্মীয়, দূরের গ্রামের অতিথি—সবাই উৎসবের কয়েকটি দিনে নিজেদের পরিচিত সম্পর্ক ওসাংস্কৃতিক স্মৃতির সঙ্গে পুনরায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পায়। এই মিলনমেলা অবশ্য তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা ধর্মীয় ও সামাজিক বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে। বাংলাদেশের মতো বহু ধর্মীয় সমাজে দুর্গাপূজার আনন্দের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং নাগরিক হিসেবে সবার সমান মর্যাদার স্বীকৃতি। সম্প্রীতি শুধু উৎসবের শুভেচ্ছা বার্তায় নয়; মানুষের নিরাপত্তা, অধিকার ও দৈনন্দিন আচরণেও প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন।
উমার ঘরে ফেরার গল্প এই বৃহত্তর সামাজিক অর্থটিও ধারণ করতে পারে। যে ঘরে মেয়ে ফিরে আসে, সেই ঘর শুধুতার একার নয়; তা হয়ে ওঠে সম্পর্ক পুনর্নবীকরণের স্থান। উৎসবের প্রকৃত সার্থকতা এখানেই— মানুষের মধ্যে দূরত্ব কমানো, ভুল বোঝাবুঝি দূর করা এবং ভিন্নতার মধ্যেও সহাবস্থানের জায়গা তৈরি করা। বাঙালির কাছে দুর্গাপূজা তাই শুধু অশুভের বিনাশের উৎসব নয়; এটি আপনজনকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ, শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং ভালোবাসার সম্পর্ক গুলোকে নতুন করে অনুভব করার সময়। কাশফুলের দোলায়, শিউলির গন্ধে, আগমনী গানের সুরে এবং বিজয়ার অশ্রুতে বাঙালি প্রতিবছর নিজের ঘরকে নতুন করে আবিষ্কার করে।
প্রতিবছর ঋতুচক্রের আবর্তনে শরৎ আসে, দেবী আসেন, ঢাক বাজে, মানুষ উৎসবে মিলিত হয়। তারপর একদিন বিসর্জনের জল প্রতিমার রূপকে আড়াল করে দেয়। কিন্তু ঘরে ফেরার আকাঙ্ক্ষা বিসর্জিত হয় না। তা থেকে যায় মায়ের অপেক্ষায়, কন্যার স্মৃতিতে, পুরোনো উঠোনের শিউলিগন্ধে এবং মানুষের সেই চিরন্তন বিশ্বাসে—পৃথিবী যত দূরেই নিয়ে যাক, ভালোবাসার একটি দরজা কোথাও খোলা থাকতে পারে। হয়তো এই কারণেই উমা শুধু পুরাণের দেবী নন; তিনি বাঙালির ঘরে ফেরার নাম। তিনি সেই অনন্ত প্রত্যাশা, যেখানে বিচ্ছেদের পরও সম্পর্ক বেঁচে থাকে, দূরত্বের পরও আপনজন আপন থাকে, আর মানুষের সমস্ত অর্জনও ব্যস্ততার শেষে হৃদয় ফিরে যেতে চায় একটি পরিচিত আশ্রয়ে।
গুগলে আমাদের খবর পেতে
