আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে নতুন কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৪ থেকে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ এবং বিশ্বব্যাংকের কাছে আগামী তিন বছরে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন চাইছে বাংলাদেশ।
জ্বালানি খাতে বাড়তি ব্যয়, অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা, ব্যাংক খাত পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এই অর্থায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে দুই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চললেও ঋণ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে আরও সময় লাগবে বলে জানা গেছে।
থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার ফাঁকে এসব অর্থায়ন ও সংস্কার নিয়ে আলোচনা করছে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল। ১৩ অক্টোবর বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে বৈঠকের পর অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, অতিরিক্ত অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা আরও কয়েক মাস চলতে পারে।
অন্যদিকে আইএমএফের সম্ভাব্য নতুন ঋণ কর্মসূচির শর্ত একসঙ্গে বাস্তবায়নের পরিবর্তে ধাপে ধাপে সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছে সরকার।
সভায় অংশ নেওয়া অর্থ মন্ত্রণালয় ও বিশ্বব্যাংক সূত্রে জানা যায়, বিশ্বব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাবটি বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল ১২ অক্টোবরের বৈঠকে তুলেছিল। আর আইএমএফের নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলছে আগের ঋণ কর্মসূচির বিষয়ে। অগ্রগতি থাকলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে সময় ও আরও আলোচনা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংক সংশ্লিষ্ট একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে বলেন, আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনার অনেক ইতিবাচক দিক রয়েছে। তবে এই মুহূর্তে বিস্তারিত বলার সময় আসেনি। আমার ধারণা আইএমএফ শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের বিষয়টি ইতিবাচক হিসেবেই দেখবে। আর আইএমএফ যদি বাংলাদেশের ঋণ সহায়তার বিষয়ে একমত হয় তাহলে বিশ্বব্যাংকের কাছে দেওয়ার প্রস্তাব ও অনুমোদন হতে বেশি সময় লাগবে না ।
তিনি আরো বলেন, সাধারণত আইএমএফ যেখানে বা যে দেশের প্রতি ইতিবাচক সাড়া দেয় বিশ্বব্যাংকও একই পথে হাটে। সবচেয়ে বড় কথা হল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণে দুটো সংস্থাই মনেপ্রাণে কাজ করছে এবং ভবিষ্যতেও করবে।
তিন বছরে বিশ্বব্যাংকের অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার দাবি
বিশ্বব্যাংকের নিয়মিত সহায়তার বাইরে আগামী তিন বছরে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণসহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ। মূল লক্ষ্য, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধির কারণে সরকারের বাড়তি ব্যয় সামলানো এবং বৃহত্তর অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা করা।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। দেশে জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতির কারণে সরকারের ভর্তুকি ব্যয়ও বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে অর্থায়নের একটি আর্থিক সুরক্ষাবলয় গড়ে তোলার বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করছে সরকার। গত ১২ অক্টোবর বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে অতিরিক্ত অর্থায়নের প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। ওই বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলে ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।
এদিকে ১৩ অক্টোবর বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে বৈঠকের পর অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, অর্থায়নের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আলোচনা থেকে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে এবং প্রক্রিয়াটি কয়েক মাস চলতে পারে। ঢাকাতেও আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক (সিপিএফ) চূড়ান্ত করার কাজও চলছে। এই কাঠামোর মাধ্যমে আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশের জন্য বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতার অগ্রাধিকার, অর্থায়নের ক্ষেত্র ও উন্নয়ন পরিকল্পনা নির্ধারণ করা হবে। প্রস্তাবিত অতিরিক্ত অর্থায়নের বিষয়টিও এই বৃহত্তর সহযোগিতার কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। তবে ১০ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন কোন কোন প্রকল্প বা খাতে ব্যয় হবে, এর সুদহার কত হবে এবং ঋণ পরিশোধের মেয়াদ কী হবে, এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়নি এখনও। আলোচনা প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও এ বিষয়ে আশাবাদী বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে কাজ করা বাংলাদেশ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
আইএমএফের সম্ভাব্য ৪–৪.৫ বিলিয়ন ডলারের নতুন কর্মসূচি
বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে অতিরিক্ত অর্থায়ন নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি আইএমএফের কাছেও নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা করেছে বাংলাদেশ। সম্ভাব্য ঋণের পরিমাণ ৪ থেকে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। এটি আগের ঋণ কর্মসূচির পরিবর্তে নতুন একটি কর্মসূচি হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ আইএমএফের সঙ্গে ৪. ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি করেছিল। পরবর্তী সময়ে কর্মসূচির আকার বাড়িয়ে ৫.৫ বিলিয়ন ডলার করা হয়। আগের কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ প্রায় ৩.৬৪ বিলিয়ন ডলার মিলেছিল।
আগের কর্মসূচির ষষ্ঠ কিস্তি ছাড় ও সংস্কারের শর্ত নিয়ে আলোচনা আটকে যাওয়ার পর নতুন সরকার পুরোনো কাঠামো থেকে সরে এসে নতুন ঋণ কর্মসূচির প্রস্তাব দেয়। আইএমএফ গত ৩ জুন নতুন অর্থায়নের জন্য বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক আবেদনের কথা জানায়। তবে সংস্থাটি ঋণের নির্দিষ্ট পরিমাণ প্রকাশ করেনি। ৪ থেকে ৪.৫ বিলিয়ন ডলার হতে পারে বলে জানা গেছে। নতুন ঋণ কর্মসূচির আলোচনায় আইএমএফের কর্মসূচিতে সাধারণত রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ও সুশাসন জোরদার, ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা গুরুত্ব পেয়েছে।
সরকারের যুক্তি, সংস্কারের লক্ষ্য দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। একসঙ্গে অনেক সংস্কার চাপিয়ে দেওয়ার বদলে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করলে অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সামলানো সহজ হতে পারে। তবে কোন শর্তে আইএমএফ ছাড় দিতে পারে, কোন সংস্কার বাধ্যতামূলক থাকবে এবং নতুন ঋণের অর্থ ছাড়ের সঙ্গে কী ধরনের শর্ত যুক্ত হবে। এসব বিষয়ে আলোচনা এখনো চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।
বৈশ্বিক ঋণচাপের মধ্যেও আলোচনায় বাংলাদেশ
উন্নয়নশীল দেশগুলো ঋণের উচ্চ ব্যয় ও বাড়তি পরিশোধের চাপে রয়েছে। বার্ষিক সভায় জি-২৪-এর চেয়ারম্যান ও নাইজেরিয়ার অর্থমন্ত্রী তাইও ওয়েদেলে বলেছেন, উন্নয়নশীল দেশগুলো উন্নত দেশগুলোর তুলনায় ঋণসংক্রান্ত ব্যয়ে আনুমানিক ৫০০ বিলিয়ন ডলার বেশি ব্যয় করছে। ওয়েদেলের ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু ঋণের পরিমাণ নয়, ঋণের ব্যয়ও বড় সমস্যা। ঋণের অর্থ পরিশোধে বেশি অর্থ চলে গেলে নতুন উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বিনিয়োগের সুযোগ কমে যায়। এ কারণে জি-২৪ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন বাড়াতে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। এমন আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নতুন ঋণ সাময়িকভাবে বৈদেশিক অর্থায়নের চাপ কমাতে পারলেও ভবিষ্যতে সুদ ও আসল পরিশোধের দায় বাড়ায়। তাই ঋণের পরিমাণের পাশাপাশি অর্থায়নের শর্ত, মেয়াদ, সুদহার এবং ঋণের অর্থ কতটা উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার হবে সেটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
ঋণ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী যা বলেন
বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ঋণসহায়তা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। মঙ্গলবার থাইল্যান্ডের ব্যাংককে বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া নীতি ও কর্মসূচির সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঐকমত্য রয়েছে। তবে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা নিয়ে আলোচনা এখনো প্রক্রিয়াধীন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, এখানে কোনো সিদ্ধান্ত হচ্ছে না। এটা একটা আলোচনা। এই আলোচনার ভিত্তিতে একটা ফলোআপ হবে। এটা একটা প্রক্রিয়া, যা আগামী কয়েক মাস চলবে।’ তিনি জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনীতি সংকটের মধ্যে ছিল। আগের সময়ের বিভিন্ন দায়দায়িত্বের বোঝার পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক অস্থিরতাও দেশের ওপর চাপ তৈরি করছে। এসব পরিস্থিতি বিশ্বব্যাংক অনুধাবন করছে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সরকারের নেওয়া নীতির সঙ্গে একমত হয়েছে সংস্থাটি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতা রয়েছে। এ বিষয়ে দুই পক্ষ একসঙ্গে কাজ করবে। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে অংশীদারত্বের কাঠামো নির্ধারণে বাংলাদেশ লিখিত প্রস্তাবও জমা দিয়েছে। তবে প্রস্তাবিত অর্থের পরিমাণ, অর্থায়নের শর্ত ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়ে আরও আলোচনা প্রয়োজন হবে।
আরএম/বিআরইউ
