সরকারি ফি ২০ টাকা, অথচ নকল হাতে পেতে গুনতে হলো ১ হাজার ৯০০ টাকা! রাজধানীর লালবাগ রাজস্ব সার্কেল ভূমি অফিসে জমিসংক্রান্ত সেবা নিতে আসা এক ব্যক্তির কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে রাশেদ নামে এক ওমেদারের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ অনুযায়ী, মিস কেসের নকল তুলে দেওয়ার কথা বলে লালবাগের বাসিন্দা মো. উজ্জ্বলের কাছ থেকে টাকা নেন তিনি। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) দুপুরে অফিসের নিচতলায় সিঁড়ির পাশে নকল হস্তান্তর ও টাকা লেনদেনের সময় সরেজমিনে উপস্থিত ছিলেন যুগান্তরের প্রতিবেদক। টাকা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে রাশেদ বলেন, এটি নামজারি সংক্রান্ত কেস করার জন্য আমি নিয়েছি। ১৯০০ টাকা। এখন কী হয়েছে বলেন। এরপর আর কথা না বাড়িয়ে অফিসের নিচতলার গেট দিয়ে বেরিয়ে যান তিনি। এ ঘটনার ভিডিও ফুটেজ রয়েছে যুগান্তর প্রতিবেদকের হাতে।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১১টা থেকে রাজধানীর কাঁটাবনে লালবাগ রাজস্ব সার্কেল সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে অনুসন্ধান চালায় যুগান্তর। এ সময় সকাল থেকেই রাশেদকে অফিসের দ্বিতীয় তলাসহ বিভিন্ন স্থানে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়। তার হাতে ছিল লালবাগ রাজস্ব সার্কেলের সরকারি প্যাড। দুপুর ১২টা ৪ মিনিটে অফিসের নিচতলায় সিঁড়ির পাশে উজ্জ্বলের হাতে একটি মিস কেসের নকল তুলে দেন তিনি। এরপর ঘটে টাকা লেনদেনের ঘটনা।
লালবাগের বাসিন্দা মো. উজ্জ্বল যুগান্তরকে বলেন, জমিসংক্রান্ত একটি মিস কেসের নকল সংগ্রহ করতে তিনি ভূমি অফিসে যান। সেখানে রাশেদ নিজেকে ভূমি অফিসের লোক পরিচয় দিয়ে নকল তুলে দেওয়ার কথা বলেন। পরে নকলটি হাতে দিয়ে তার কাছ থেকে টাকা নেন রাশেদ।
উজ্জ্বলের অভিযোগ, প্রথমে তিনি ১ হাজার ৫০০ টাকা দিতে চাইলে রাশেদ তা নিতে চাননি। পরে ১০০ টাকা করে কয়েক দফায় বাকি অর্থ নিয়ে মোট ১ হাজার ৯০০ টাকা নেন তিনি। অথচ ওই নকলের সরকারি ফি ২০ টাকা বলে দাবি করেন উজ্জ্বল।
টাকা লেনদেনের সময় রাশেদের সঙ্গে কথা বলেন প্রতিবেদক। এ সময় টাকা নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার না করে তিনি বলেন, এটি নামজারি সংক্রান্ত বিষয়ে আমি টাকা নিয়েছি। এখন কী হয়েছে বলেন। এরপর প্রসঙ্গ এড়িয়ে দ্রুত অফিসের নিচতলার গেট দিয়ে বেরিয়ে যান তিনি। টাকা লেনদেন ও রাশেদের বক্তব্যের ভিডিও ফুটেজ প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে।
ভূমি অফিসের একাধিক কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রায় ১০ বছর ধরে লালবাগ রাজস্ব সার্কেল সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে অবস্থান করছেন রাশেদ। তিনি লালবাগের পাশাপাশি ধানমন্ডি, নিউমার্কেট ও তেজগাঁওসহ বিভিন্ন সার্কেল অফিসে জমিসংক্রান্ত কাজ করে দেওয়ার নামে দালালি করেন। তৃতীয় তলায় কম্পিউটার-সংক্রান্ত কাজ করা সুমনও ওমেদার হিসেবে পরিচিত এবং জমিসংক্রান্ত কাজে সহযোগিতা করেন। ভূমি অফিসের ক্যাশিয়ার হিসেবে পরিচিত ওমেদার রাসেলও এসব কাজে যুক্ত। অফিসের পাশে কাটাবনে পাঠক সমাবেশ ভবনের তৃতীয় তলায় রাসেলের ভাড়া করা অফিস রয়েছে। এর আগে তিনি রাজধানীর আজিমপুরে লালবাগ তহশিল অফিসে ছিলেন বলে সূত্র জানিয়েছে।
এ ছাড়া জহিরুল ইসলাম নামে আরেক ব্যক্তি নতুন করে যুক্ত হয়েছেন। তিনি অফিসে আসা গ্রাহকদের কাছে নিজেকে কর্মচারী পরিচয় দিয়ে নিচে বা বাইরে নিয়ে গিয়ে বিভিন্ন কর্মকর্তার ফাইল অনুযায়ী কাজ করিয়ে দেওয়ার জন্য সমঝোতা করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সেবাগ্রহীতা জানান, অতিরিক্ত অর্থ না দিলে অনেক সময় নির্ধারিত সময়ে ফাইল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাদের অভিযোগ, অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কিছুদিন আড়ালে থাকেন, পরে আবার অফিসে আসেন।
মিস কেসের নকলটি কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে, তা নিয়েও দেখা দিয়েছে অসংগতি। ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, মিস কেসের নকলসংক্রান্ত কাজের সঙ্গে মিউটেশন শাখার মিস কেস সহকারী ও নাজিরের দায়িত্বে থাকা এস এম আরিফুর রহমান যুক্ত। তিনি এর আগে ধামরাইয়ে কর্মরত ছিলেন এবং প্রায় এক বছর ধরে চাকরি করছেন বলে সূত্র জানিয়েছে। পুরো অফিসের দায়িত্ব তার হাতে বলেও দাবি করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
এ বিষয়ে আরিফুর রহমানের সঙ্গে সরাসরি কথা বললে প্রথমে তিনি রাশেদকে চেনেন না বলে জানান। পরে ভিডিও দেখানো হলে তিনি বলেন, রাশেদ স্টেশনারি, দলিল-সংক্রান্ত স্ট্যাম্পসহ বিভিন্ন কাজ করেন এবং মাঝেমধ্যে অফিসে আসেন।
উজ্জ্বলের কাছ থেকে টাকা নিয়ে মিস কেসের নকল সংগ্রহের বিষয়ে জানতে চাইলে আরিফুর রহমান বলেন, তার কাছ থেকে নকল নেওয়া হয়নি। বিষয়টি ভালোভাবে খোঁজ নিতে বলেন তিনি।
অন্যদিকে, রাশেদ প্রতিবেদকের কাছে দাবি করেন, মিস কেসের নকলটি তিনি এস এম আরিফুর রহমানের কাছ থেকেই নিয়ে এসেছেন। তবে এ জন্য আরিফকে টাকা দেননি বলে জানান তিনি। নকলটি আরিফের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে দুজনের বক্তব্যে অমিল রয়েছে।
রাশেদের সঙ্গে প্রথমে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ভূমি অফিসে আছেন বলে জানান এবং প্রতিবেদককে সেখানে যেতে বলেন। প্রতিবেদক পরিচয় দেওয়ার পর ভাত খাওয়ার কথা বলে ফোন কেটে দেন তিনি।
পরবর্তীতে আবার ফোনে যোগাযোগ করে সমঝোতার চেষ্টা করা হলে রাশেদ বলেন, এটা আমার রুটি-রোজি। ডাল ভাত খাই। তিনি দাবি করেন, এস এম আরিফুর রহমানের কাছ থেকে মিস কেসের নকল তুলে দেওয়ার বিনিময়ে টাকা নিয়েছেন। তবে ১ হাজার ৯০০ টাকা নয়, ১ হাজার ৫০০ টাকা নিয়েছেন বলে জানান তিনি।
রাশেদ আরও বলেন, আমি একা না। সুমন, রাসেল, আগে পারভেজ ভাই ছিল, এখন বর্তমানে নেই। রাসেল, সুমন এরা সবাই লালবাগ ভূমি অফিসে জমিসংক্রান্ত বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের কাজ করে।
এদিকে সরেজমিনে সকাল সাড়ে ১১টা থেকে মো. জহিরুল ইসলাম নামের এক দালালকে লালবাগ এসি ল্যান্ড অফিসের দ্বিতীয় তলায় বিভিন্ন স্থানে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়। তার সঙ্গে কথা হলে তিনি লালবাগে থাকেন বলে জানান। অফিসে আসার কারণ জানতে চাইলে বলেন, এমনিতেই এসেছেন।
রাশেদকে চেনেন কি না, জানতে চাইলে প্রথমে কাউকে চেনেন না বলে দাবি করেন জহিরুল। পরে তার মোবাইল ফোনে রাশেদের নম্বর সংরক্ষিত এবং যোগাযোগের তথ্য দেখা যায় বলে জানিয়েছেন প্রতিবেদক। এরপর জহিরুল রাশেদকে চেনেন বলে স্বীকার করেন। কাজ থাকলে তার কাছে নিয়ে আসেন বলেও জানান তিনি। এ ছাড়া জহিরুল এস এম আরিফুর রহমানের কাছেও কাজ নিয়ে আসেন বলে জানান।
এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) দুপুরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। পরে আজ শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সকালে সাড়ে ১১টার দিকে হোয়াটসঅ্যাপে এ সংক্রান্ত ছয়টি প্রশ্ন পাঠানো হলেও প্রথমে কোনো উত্তর দেননি লালবাগ রাজস্ব সার্কেল সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আমিনুল ইসলাম। পরে বারবার বক্তব্য চাওয়া হলে ধাপে ধাপে লিখিতভাবে তিনি মেসেজে জানান, আমার অফিসে কোনো ওমেদার নেই। আমার অফিসের কোনো স্টাফের অনিয়ম নিয়ে অভিযোগ থাকলে আমার কাছে লিখিত আবেদন দিতে পারেন।
সিসি ক্যামেরার ফুটেজ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, যে কোনো ব্যক্তিও লিখিত অভিযোগ দিতে পারবেন। তদন্ত করে উপযুক্ত প্রমাণ সাপেক্ষে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আমি এখন মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ পরীক্ষার ম্যাজিস্ট্রেসির ডিউটিতে আছি। বাকি সব বিষয়ে আমার আর কোনো বক্তব্য নেই। অভিযোগ প্রাপ্তি সাপেক্ষে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।