দেবী দুর্গাকে বিদায়ের মধ্য দিয়ে শেষ হলো শারদীয় দুর্গোৎসব। বুধবার (২১ অক্টোবর) বিজয়া দশমীতে রাজধানী ঢাকা, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় আচার, ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি ও সিঁদুর খেলার মধ্য দিয়ে প্রতিমা বিসর্জন দেন ভক্তরা। রাজধানীতে বাড়তি নিরাপত্তার মধ্যে ৩৩টি স্থানে বিসর্জনের আয়োজন করা হয়। সবচেয়ে বেশি প্রতিমা বিসর্জন হয় বুড়িগঙ্গার ওয়াইজঘাটে। অন্যদিকে, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে অন্তত ৪০০টি প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে তিন থেকে চার লাখ মানুষের সমাগম হয়েছিল বলে জানিয়েছেন আয়োজকেরা। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতেও হাজারো ভক্তের উপস্থিতিতে সাগরের জলে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়।
উৎসবের শেষ দিনে দেবীকে বিদায় জানানোর পাশাপাশি আগামী বছর আবারো ফিরে আসার প্রার্থনা করেন ভক্তরা। তাঁদের প্রত্যাশা, অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটিয়ে দেবী দুর্গা পৃথিবীতে শান্তি, সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধির বার্তা নিয়ে ফিরবেন। রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবীদের তৎপরতায় বিসর্জন আয়োজন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
রাজধানীতে ৩৩ স্থানে বিসর্জন, নিরাপত্তায় ১৬ হাজার পুলিশ
রাজধানীতে ১৬ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন এবং বিশেষায়িত ইউনিটগুলোর নজরদারির মধ্যে প্রতিমা বিসর্জন অনুষ্ঠিত হয়। বুধবার ঢাকা মহানগরের ৩৩টি স্থানে বিসর্জনের আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রতিমা বিসর্জন হয় বুড়িগঙ্গার ওয়াইজঘাটে।
বিসর্জন ঘিরে পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা পুলিশ, কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম, স্পেশাল রেসপন্স ইউনিট, সোয়াট ও বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিটের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া সশস্ত্র পুলিশ ব্যাটালিয়ন ও বিশেষায়িত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও দায়িত্বে ছিলেন।
বুধবার বিকেল ৪টার দিকে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির থেকে প্রতিমা নিয়ে বিজয়া শোভাযাত্রা শুরু হয়। শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি ও ঢাকের বাদ্যের তালে তালে ভক্তরা শোভাযাত্রায় অংশ নেন। শোভাযাত্রাটি জগন্নাথ হল, দোয়েল চত্বর, গুলিস্তান মোড়, নবাবপুর সড়ক ও রায়সাহেব বাজার হয়ে ওয়াইজঘাটে পৌঁছায়। সেখানে বুড়িগঙ্গার তীরে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়।
তবে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের মূল প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয় না। মন্দিরের ঐতিহ্য অনুযায়ী, প্রতিমাটি পরবর্তী বছরের পূজার জন্য সংরক্ষণ করা হয়। এবার প্রতীকী বিসর্জন হিসেবে সপ্তমীর দিন প্রতিষ্ঠা করা কলাবউ বা কলাগাছটি বিসর্জন দেওয়ার কথা রয়েছে।
এ বছর ঢাকা মহানগরে ২৫৮টি মণ্ডপসহ সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিমা বিসর্জনের জন্য বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদের মোট ১১টি ঘাট নির্ধারণ করা হয়।
বুধবার (২১ অক্টোবর) পলাশী মোড়ে প্রতিমা বিসর্জনের প্রস্তুতি পরিদর্শনকালে ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (অপারেশন) মো. শহীদুল্লাহ বলেন, এবার রাজধানীতে সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, বিসর্জনের বাকি কার্যক্রমও নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হবে। কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হলে তা মোকাবিলায় পুলিশের প্রস্তুতি রয়েছে বলেও জানান তিনি।
কক্সবাজার সৈকতে লাখো মানুষের ঢল, বিসর্জন ৪০০ প্রতিমা
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে প্রতিমা বিসর্জন ঘিরে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। সন্ধ্যা পেরিয়ে গেলেও সৈকতে মানুষের ঢল কমেনি। সড়কের ভিড় ঠেলে শহরের অন্যতম পুরোনো পূজামণ্ডপ ইন্দ্রসেন দুর্গাবাড়ির প্রতিমা যখন সৈকতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখনো হাজারো মানুষ দেবীকে বিদায় জানাতে অপেক্ষা করছিলেন।
ইন্দ্রসেন দুর্গাবাড়ির অন্যতম সংগঠক বিপুল সেন বলেন, প্রতিবছরই প্রতিমা বিসর্জন দেখতে সৈকতে প্রচুর মানুষ আসেন। তবে গত কয়েক বছরের মধ্যে এবার মানুষের সমাগম তাঁর চোখে সবচেয়ে বেশি। তিনি বলেন, এবার এত মানুষ হয়েছে যে, যেদিকে চোখ যায়, তত দূর পর্যন্ত শুধু মানুষ দেখা যায়।
বুধবার বিকেলে কক্সবাজারের টেকনাফে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে শারদীয় দুর্গোৎসবের বিজয়া দশমী শেষে সমুদ্রসৈকতে প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন হয়েছে -ছবি সংগৃহীত
আয়োজকদের হিসাবে, বুধবার দুপুর থেকে শুরু হয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলা বিসর্জন অনুষ্ঠানে কক্সবাজার সৈকতের লাবণী পয়েন্টে অন্তত ৪০০টি প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। এ আয়োজন দেখতে তিন থেকে চার লাখ মানুষের সমাগম হয়েছিল বলে তাঁদের ধারণা।
দিনভর তীব্র গরমও উৎসবের আনন্দে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার কক্সবাজারে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই গরম উপেক্ষা করে লাবণী পয়েন্ট ও আশপাশের সৈকতে ভিড় করেন স্থানীয় বাসিন্দা, বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পর্যটক ও পূজারিরা।
কক্সবাজারের বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও বান্দরবানের লামা ও নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে প্রতিমা নিয়ে আসেন পূজারিরা। তবে চকরিয়া ও পেকুয়ার প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয় মাতামুহুরী নদীতে।
বিসর্জন ঘিরে লাবণী পয়েন্ট থেকে কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। দুর্গাপূজা ও প্রবারণা পূর্ণিমার ছুটি উপলক্ষে কক্সবাজারের লাবণী, সুগন্ধা, হিমছড়ি ও ইনানীসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রেও দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল।
সিঁদুরে বরণ, ঢাক-ঢোল ও উলুধ্বনির মধ্য দিয়ে দেবীকে বিদায় জানান ভক্তরা। তাঁদের প্রার্থনা, অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটিয়ে শান্তি, সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধির বার্তা নিয়ে আগামী বছর আবারো ফিরে আসবেন দেবী দুর্গা।
জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি উদয় শংকর পাল মিঠু বলেন, প্রশাসনের সহযোগিতায় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই বিসর্জন আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে। তিনি জানান, এবার কক্সবাজারে ৩২৪টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৫৫টিতে প্রতিমাপূজা এবং ১৬৯টিতে ঘটপূজা হয়েছে।
সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিতের আশ্বাস
কক্সবাজারে বিসর্জন অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন। বক্তব্যে তিনি ধর্ম, বর্ণ ও গোত্রনির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠাকে সরকারের লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বী, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, মুসলমান ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীসহ সব নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সরকার কাজ করছে।
অনুষ্ঠানে স্থানীয়দের জমি ও জায়গা দখলের অভিযোগের বিষয়টিও উঠে আসে। এ ধরনের অভিযোগের প্রতিকারের আশ্বাস দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, নাগরিকদের ন্যায্য দাবির বিষয়ে প্রশাসনের মাধ্যমে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকারের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কথাও তুলে ধরেন তিনি। প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য, পূজামণ্ডপে সরকারি সহায়তার পরিমাণ বাড়ানো এবং দুর্গাপূজার ছুটি বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন উদ্যোগ সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের উদাহরণ।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, বিসর্জন উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করা এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। পর্যটকদের হয়রানি বন্ধ ও সেবা নিশ্চিত করতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালতও মাঠে ছিল।
পতেঙ্গা সৈকতে হাজারো ভক্তের উপস্থিতি
চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতেও বিজয়া দশমীতে ঢাকের বাদ্য ও আরতির মধ্য দিয়ে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। বুধবার বিকেল ৩টা থেকে সাগরের জলে প্রতিমা বিসর্জন শুরু হয়। এ আয়োজনে হাজারো ভক্ত সমবেত হন।
দুপুর থেকেই প্রতিমাবাহী ট্রাক আসতে শুরু করে পতেঙ্গা সৈকতে। ঢাকের তালে নাচ, আরতি ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় মেতে ওঠেন ভক্তরা। দেবীর চরণে শেষ প্রণাম জানিয়ে সিঁদুর ও ফুলের অর্ঘ্যে তাঁকে বিদায় জানান তাঁরা। ধর্মীয় রীতি মেনেই সম্পন্ন হয় বিসর্জন।
পতেঙ্গা সৈকতের পাশাপাশি কালুরঘাট ও ফিরিঙ্গি বাজার এলাকায় কর্ণফুলী নদীতে এবং কাট্টলী এলাকার সমুদ্রসৈকতেও প্রতিমা বিসর্জনের আয়োজন করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ফায়ার সার্ভিসের সদস্য ও ডুবুরি দল দায়িত্ব পালন করে।
দক্ষিণ আগ্রাবাদ পূজা উদ্যাপন পরিষদের প্রতিমা বিসর্জন দিতে আসা সুমিত দাশ বলেন, এ বছর এক দিন বেশি পূজা হওয়ায় উৎসবের আনন্দও বেশি ছিল। দেবীকে বিদায় জানাতে কষ্ট হচ্ছে, তবে আগামী বছর আবারো তিনি আসবেন- সেই অপেক্ষায় থাকবেন তাঁরা।
পূজা উদ্যাপন পরিষদ চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি অর্পন ব্যানার্জী বলেন, এবার সুন্দরভাবে পূজার আয়োজন হয়েছে এবং বিসর্জনও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। প্রতিবছর এভাবে পূজার সব আয়োজন সম্পন্ন হবে বলে তিনি প্রত্যাশা করেন।
পতেঙ্গা সৈকতে বিসর্জন কার্যক্রম পরিদর্শন করেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, এবার নগরীতে শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিমা বিসর্জনের জন্য নগরীর চারটি স্থানে ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। পাশাপাশি মেডিকেল টিমসহ প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাও রাখা হয়।
এ বছর চট্টগ্রাম নগরীর ২৯৪টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সেখানে ছয় দিনের শারদীয় দুর্গোৎসবের সমাপ্তি ঘটে।
উৎসবের সমাপ্তিতে সম্প্রীতির প্রত্যাশা
রাজধানী থেকে কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম- দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিমা বিসর্জনকে ঘিরে ভক্তদের উপস্থিতি, ধর্মীয় আচার এবং প্রশাসনের নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল এবারের বিজয়া দশমীর উল্লেখযোগ্য দিক। কক্সবাজারে বিপুল জনসমাগমের পাশাপাশি রাজধানীর বিসর্জনস্থলগুলোতেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাড়তি তৎপরতা দেখা গেছে। চট্টগ্রামেও নির্ধারিত স্থানে বিসর্জনের আয়োজন করা হয়।
বিভিন্ন স্থানের আয়োজক ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাঁদের এলাকায় বিসর্জন কার্যক্রম শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। উৎসবের এই সমাপ্তিতে ভক্তদের প্রত্যাশা, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ আরো দৃঢ় হবে এবং আগামী বছর আবারো আনন্দমুখর পরিবেশে শারদীয় দুর্গোৎসব উদ্যাপিত হবে।
