প্রশাসনের সর্বোচ্চ মহলের কোনো প্রকার আনুষ্ঠানিক অনুমতি ব্যতিরেকে কর্মস্থল ত্যাগ করে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার মতো গুরুতর অপরাধের পরও অদৃশ্য আশীর্বাদে দায়মুক্তি পেয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক বিতর্কিত কর্মকর্তা। কোনো প্রকার দৃশ্যমান প্রশাসনিক কিংবা আইনি জবাবদিহিতা ছাড়াই দেশে ফিরে এসে খোদ রাজধানীতে রাজস্ব খাতের অন্যতম শীর্ষ ও সংবেদনশীল পদ বাগিয়ে নেওয়ার নজিরবিহীন ঘটনায় স্থানীয় ব্যবসায়ী সমাজ ও কর প্রশাসনের অভ্যন্তরে চরম তোলপাড় শুরু হয়েছে। অভিযুক্ত কর্মকর্তা এনবিআরের কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট, মতিঝিল ডিভিশনের উপকমিশনার আবু হানিফ মোহাম্মদ আবদুল আহাদ। ক্ষমতার অপব্যবহার, ধারাবাহিক দুর্নীতি, জোরপূর্বক চাঁদা দাবি এবং অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি বহাল তবিয়তে স্বপদে দায়িত্ব পালন করছেন, যা সাধারণ কাস্টমস কর্মকর্তাদের মাঝে ক্ষোভ এবং অনিয়মের শিকার ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রতিশোধের আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
প্রশাসনিক নথি ও অনুসন্ধানে দেখা যায়, আবু হানিফের পুরো কর্মজীবনই বিতর্ক ও ক্ষমতার অপব্যবহারের নানা ঘটনায় চিহ্নিত। ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে সহকারী কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও কর্মীদের সঙ্গে তাঁর তীব্র সংঘাতের সৃষ্টি হয়। হয়রানি ও অনৈতিক সুবিধা দাবির অভিযোগে ক্ষুব্ধ কর্মীরা তাঁকে কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে নামফলক ভাঙচুর পর্যন্ত করেন। পরিস্থিতির ভয়াবহতায় তৎকালীন কর্তৃপক্ষ সুশাসন ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা কাঠামোর ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির আওতায় তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রশিক্ষণ একাডেমিতে বদলি করে। পরবর্তীতে ২০২১ সালের মার্চে কাস্টমস গোয়েন্দার সহকারী পরিচালক থাকাকালে ঢাকার পোস্তগোলার আইরিশ পাব অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে অভিযানে গিয়ে সিসিটিভি ফুটেজে তাঁর দলবলসহ অনৈতিক মদ্যপান, কর্মীদের মারধর ও জব্দকৃত পণ্যের হিসাব না মেলার কেলেঙ্কারি দেশজুড়ে আলোচিত হয়। এরপর আখাউড়া স্থলবন্দরে বদলি হয়ে তিনি ব্যবসায়ীদের নিলামকৃত বৈধ মালামাল বেআইনিভাবে আটক এবং ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সরাসরি ফৌজদারি মামলার আসামিও হন।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রাক্তন এনবিআর চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এই কর্মকর্তা আইনি প্রক্রিয়া এড়াতে অবৈধভাবে দেশত্যাগ করে বিদেশে আত্মগোপন করেন। দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হলেও চলতি বছরের ৫ মার্চ অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি) এক রহস্যজনক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ‘অসদাচরণ ও কর্মস্থল থেকে পলায়ন’-এর সুনির্দিষ্ট মারাত্মক অভিযোগ থেকে তাঁকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দিয়ে মতিঝিল ডিভিশনে পদায়ন করে। এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে উপকমিশনার আবু হানিফ মোহাম্মদ আবদুল আহাদ, ঢাকা ভ্যাট কমিশনার মসিউর রহমান, ভ্যাট ও শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক আব্দুর রউফ এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিবের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সুনির্দিষ্ট উত্তর মেলেনি।
অভিযুক্ত কর্মকর্তার এই রহস্যজনক পুনর্বাসনে সংক্ষুব্ধ ব্যবসায়ী সমাজ ও নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলো রাজপথে নেমে এসেছে। গত ১৩ অক্টোবর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে জাতীয় ক্রাইম রিপোর্টার সোসাইটি ও সাধারণ নাগরিক সমাজের ব্যানারে এক প্রতিবাদী মানববন্ধনে অবিলম্বে এই কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করে তাঁর জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ ও দুর্নীতির নিরপেক্ষ তদন্ত করার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রতি জোর দাবি জানানো হয়। ইতিমধ্যেই ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার, অঢেল সম্পদের মালিকানা লাভ এবং ব্যবসায়ী হয়রানির তথ্যপ্রমাণাদিসহ দুদকে লিখিত অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। সংক্ষুব্ধদের অভিযোগ, দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের এমন অপ্রত্যাশিত পুনর্বাসন সাধারণ করদাতাদের ওপর মানসিকভাবে মারাত্মক নেতিবাচক চাপ তৈরি করছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রশাসন পরিচালনা ও পাবলিক সার্ভিস উইংয়ের সরকারি চাকরির আইনি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মকর্তা অনুমতি ব্যতিরেকে টানা কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে বা দেশত্যাগ করলে ‘সরকারি চাকরি আইন-২০১৮’ এবং ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা-২০১৮’ অনুযায়ী তাৎক্ষণিক বরখাস্ত ও কঠোর বিভাগীয় শাস্তির স্পষ্ট বিধান রয়েছে। তবে আবু হানিফ মোহাম্মদ আবদুল আহাদের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি ও আইআরডির এই শিথিলতা সরকারের সার্বিক সুশাসন এবং দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের সুস্পষ্ট অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। অতীত রেকর্ড ও প্রশাসনিক তদন্তে একের পর এক অনিয়ম প্রমাণিত হওয়ার পরও কীভাবে একজন কর্মকর্তা পদোন্নতি ও রাজধানীকেন্দ্রিক গুরুত্বপূর্ণ পোস্টিং পান—তা নিয়ে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে চরম সংশয় তৈরি হয়েছে।
সুশাসন বিশেষজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ আইনজ্ঞদের মতে, সরকারি চাকরির বিধিমালাকে তোয়াক্কা না করে কোনো ব্যক্তিগত বা অদৃশ্য প্রভাবে পলাতক কর্মকর্তাকে দায়মুক্তি প্রদান করা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানকেই ধ্বংস করে না, বরং সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তাদের মনোবল পুরোপুরি ভেঙে দেয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মতো অতীব সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে হলে এ ধরনের ঘটনার নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করে দ্রুত আইনি নিষ্পত্তি প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা বিধান ও প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম বন্ধে দুদকের হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি, অন্যথায় দেশের পুরো রাজস্ব আদায়ব্যবস্থা এক গভীর আস্থার সংকটের মুখে পড়বে বলে বিজ্ঞ মহল মনে করছেন।
