একদিন বাংলাদেশি এক গ্রোসারি সুপারশপে কিছু কেনাকাটা করতে গিয়ে হঠাৎ চোখ আটকে গেল দোকানের এক কোণে।
সেখানে অযত্নে রাখা বাংলা পত্রিকার বেশ কয়েকটি বান্ডিল। প্রবাসের নানা ব্যস্ততার মধ্যেও দেশে ছাপা বা স্থানীয়ভাবে প্রকাশিত বাংলা পত্রিকাগুলোর পাতা উল্টানোর আগ্রহটা আমার কম নয়। কিন্তু পত্রিকা হাতে নিয়ে পাতা যতই উল্টাতে থাকি, মনে হতে লাগল এ যেন ছোট-বড় নানা বাহারি বিজ্ঞাপনের এক বিশাল মহাসমাবেশ! প্রয়োজনীয় বা চিন্তাজাগানিয়া কোনো গভীর নিবন্ধের বড়ই আকাল সেখানে।
অন্যদিকে, মন্ট্রিয়লের স্থানীয় লাইব্রেরিগুলোতে সময় কাটানোর অভিজ্ঞতা আবার একদম ভিন্ন। এখানে লাইব্রেরি মেম্বার কার্ডের বিশেষত্ব হলো—একই কার্ড দিয়ে নানা ধরনের আধুনিক সুবিধা পাওয়া যায়। কার্ডে সামান্য কিছু টাকা টপআপ করে নিলে লাইব্রেরিতেই মাত্র ১০ সেন্টে প্রতি পাতা প্রিন্ট বা ফটোকপি করে নেওয়া যায়; যেখানে বাইরের দোকানগুলোতে লাগে ২৫ থেকে ৩৫ সেন্ট। তবে বুকের ভেতর একটা নিভৃত হাহাকার সবসময় থেকেই যায়—যদি এই লাইব্রেরির বিশাল সংগ্রহের মধ্যে নিজস্ব মাতৃভাষার ভালো কিছু বই পড়তে পারতাম! একদিন প্রদর্শনীতে মাত্র তিনটি বাংলা বই দেখেছিলাম, তাও সেগুলোর আকার-প্রকার অনেকটা ছোটদের আদর্শলিপির মতো। আর তার পরের সপ্তাহে গিয়ে দেখলাম সেই তিনটা বইও আর নেই! বাংলা বইয়ের এই আক্ষেপ আর স্মৃতিকাতরতার ভেতরেই মন্ট্রিয়লের উইলিয়ামস হিংসটন লাইব্রেরির শান্ত পরিবেশে বসে ইংরেজি ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ভাষার সমৃদ্ধ বই এবং পুরনো ঐতিহাসিক আকর দলিলগুলো পড়ার সুযোগ হয়। বইগুলোর পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে একদিন হঠাৎ নজর কাড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও ৩য় রাষ্ট্রপতি থমাস জেফারসনের একটি কালজয়ী উক্তি(অর্থাৎ, যখন অন্যায় আইনে পরিণত হয়, তখন প্রতিরোধ গড়ে তোলা কর্তব্যে পরিণত হয়)। আইন ও অন্যায়ের এই চিরন্তন অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং মানুষের বিবেকের দায় নিয়ে উক্তিটি আমাকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। আইন এবং নৈতিকতা—মানবসংশ্লিষ্ট সামাজিক কাঠামোর দুই প্রধান স্তম্ভ। স্বাভাবিক নিয়ম ও সামাজিক চুক্তি অনুযায়ী আইন তৈরি হয় মানুষের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে। তবে ইতিহাসের বহু বাঁকে দেখা গেছে, আইন যখন তার মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়, তখন তা সাধারণ মানুষের অধিকার হরণের হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে। ন্যায়বিচার ও নাগরিক দায়িত্বের এই তত্ত্বটি মানব ইতিহাস ও দর্শনে সুপ্রতিষ্ঠিত। সতেরো শতকের ব্রিটিশ দার্শনিক জন লক তার ‘সামাজিক চুক্তি’ ও ‘স্বাভাবিক অধিকার’ ধারণায় উল্লেখ করেছিলেন যে, জনগণ রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থাকে তাদের সার্বিক কল্যাণের জন্যই সমর্থন যোগায়। কিন্তু কোনো নিয়ম বা ব্যবস্থা যদি মানুষের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন করে, তবে তা তার নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা হারায়। এরও আগে মধ্যযুগীয় প্রাতিষ্ঠানিক চিন্তাবিদ সেন্ট অগাস্টিন স্পষ্ট করে বলেছিলেন যে, একটি অন্যায্য নীতি বা আইন প্রকৃতপক্ষে কোনো আইনের মর্যাদায় পড়ে না।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কাঠামোগত নিয়মের ভেতর থেকেও যুগে যুগে বহু সামাজিক অবিচার জারি রাখা হয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘকাল প্রচলিত দাসপ্রথা, ১৮৫০ সালের বৈষম্যমূলক ‘ফিউজিটিভ স্লেভ অ্যাক্ট’, কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার দীর্ঘ বর্ণবৈষম্যমূলক সামাজিক নীতিসমূহ—এর প্রতিটিই ছিল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা দ্বারা সমর্থিত অবিচার। পরবর্তীতে মহাত্মা গান্ধীর ‘সত্যগ্রহ’, মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের মানবাধিকার আন্দোলন এবং চিন্তাবিদ হেনরি ডেভিড থরোর ‘অমান্য তত্ত্ব’ বিশ্ববাসীকে অনুধাবন করিয়েছে যে, মানবতাবিরোধী বিধির সামনে নীরব থাকা কোনো নাগরিক গুণ হতে পারে না; বরং ন্যায়ের পক্ষে কথা বলাই সর্বজনীন কর্তব্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্ববিখ্যাত ‘নুরেমবার্গ ট্রায়াল’-এর সময় আন্তর্জাতিক আইনি বিচারকেরা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিলেন যে, কেবল সামাজিক বিধি বা আদেশের ওপর ভিত্তি করে অনৈতিক কাজকে সমর্থন করা যায় না; নীতি ও বিচারবোধের স্থান সর্বদা আদেশের ওপরে। আধুনিক সমাজেও ন্যায়পরায়ণতা ধরে রাখা এবং মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা করার স্বার্থে থমাস জেফারসনের এই মূলনীতি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, অন্ধ আনুগত্যের চেয়ে বিবেক ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোই একটি দায়িত্বশীল সমাজ গঠনের আসল শর্ত।
নোট: মন্ট্রিয়লের লাইব্রেরিতে সময় কাটানোর সুযোগে থমাস জেফারসনের ১৭৭৬ সালের ‘আমেরিকান ডিক্লারেশন অব ইন্ডিপেন্ডেন্স’, জন লকের ‘টু ট্রিটাইজেস অব গভর্মেন্ট’ (১৬৮৯), হেনরি ডেভিড থরোর ‘অন দ্য ডিউটি অব সিভিল ডিসওবিডিয়েন্স’ (১৮৪৯) এবং মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের ১৯৬৩ সালের ‘লেটার ফ্রম বার্মিংহাম জেল’ পাঠের অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও তথ্য থেকে ফিচারটি রচিত।
মন্ট্রিয়ল, কানাডা।
The post আইনের আয়নায় ন্যায়বিচার: যখন অনাচারেই রচিত হয় শৃঙ্খল appeared first on Dhaka Protidin.
