লর্ডসের গৌরবের ইতিহাসে খানিকটা কালিমা লাগিয়ে দেওয়া সেই পিচ পুরোপুরি তুলে ফেলা হয়েছে। এই পিচের কারণেই ক্রিকেটের তীর্থস্থান বলে খ্যাত মাঠ প্রথমবার ডিমেরিট পয়েন্ট পেয়েছিল আইসিসি থেকে। বর্তমান মৌসুম শেষে এখন সেই পিচ নতুন করে তৈরি করছে মাঠের স্বত্বাধিকারী মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাব (এমসিসি)
ক্রিকেট মাঠের পিচ খুঁড়ে নতুন করে তৈরির প্রক্রিয়া বেশ জটিল ও সময়সাপেক্ষ। এই পিচে যেমন, অন্তত আগামী দুই মৌসুমে খেলা হবে না।
প্রতি মৌসুমে লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ডের সেন্টার উইকেট সাধারণথ তৈরি কর হয় ২০ থেকে ২২টি। এর মধ্যে ৫টি কেবল ব্যবহার করা হয় আন্তর্জাতিক ম্যাচের জন্য। ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক মিলিয়ে ৯টি পিচ থাকে টিভিতে সম্প্রচারিত ম্যাচগুলোর জন্য। আলোচিত পিচটি ঐতিহ্যবাহী এই মাঠের ৯ নম্বর পিচ হিনেবে পরিচিত।
গত জুনের শুরুতে ইংল্যান্ড ও নিউ জিল্যান্ডের সেই টেস্ট ম্যাচটি বৃষ্টির কারণে চতুর্থ গড়ালেও ম্যাচ শেষ হয়েছিল স্রেফ ১৬৬ ওভারে, যা মূলত দুই দিনের চেয়েও বেশ কম। ৪০ উইকেটের ২৪টিই ছিল বোল্ড বা এলবিডব্লিউ। ইংল্যান্ড দ্বিতীয় ইনিংসে করেছিল ২২৬ রান। ম্যাচের বাকি তিন ইনিংসে কোনো দল ১৪০ ছাড়াতে পারেনি।
পরে পিচটিকে ‘অসন্তোষজনক’ হিসেবে রায় দিয়ে ডিমেরিট পয়েন্ট দেন ম্যাচ রেফারি অ্যান্ড পাইক্রফট। ম্যাচ রেফারির প্রতিবেদনে বলা হয়, পিচটিতে মাত্রাতিরিক্ত সিম মুভমেন্ট এবং অসম বাউন্স ছিল।
সেই টেস্টের পরপরই সাত-দফা কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেন এমসিসির চেয়ারম্যান, ধারাভাষ্যকার ও সাবেক পেসার মার্ক নিকোলাস। এরপর থেকে ডেটা অ্যানালাইসিসসহ বিশেষজ্ঞ পরামর্শ চেয়েছেন এমসিসির ক্রিকেট ও অপারেশনস ডিরেক্টর রব লিঞ্চ এবং ক্লাবের গ্রাউন্ডস্টাফরা। সেই প্রক্রিয়াতেই কাজ শুরু হয়েছে, যেটিকে নিকোলাস বর্ণনা করেছেন “এক প্রজন্মের মধ্যে লর্ডসের স্কয়ার ও পিচ প্রস্তুতির সবচেয়ে ব্যাপক পর্যালোচনা” হিসেবে।
এই মাসের শুরুতে ৯ নম্বর পিচের নতুন করে তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। আগামী দুই বা তিন মৌসুমের জন্য এই পিচ ব্যবহার করা যাবে না। নিকোলাস বুধবার একটি ইমেইলে এমসিসি সদস্যদের জানিয়েছেন, “এই প্রকল্পটি নিশ্চিত করবে যে, মাঠের সুনামের সঙ্গে মানানসই পিচ প্রস্তুত করবে ক্লাব।” পাশাপাশি তিনি সতর্ক করে বলেছেন, “আগামী বছরগুলিতে সময়সূচী সংক্রান্ত যে চ্যালেঞ্জ এই পরিকল্পনাগুলো নিয়ে আসবে, সেসবের জন্য আমাদের সকলের প্রস্তুত থাকা উচিত।"
ক্রিকেট ওয়েবসাইট ক্রিকইনফো জানতে পেরেছে যে, একটি সেন্টার উইকেট আপাতত অনুপযোগী থাকার পাশাপাশি, অ্যাশেজ টেস্টের মতো বড় ইভেন্টগুলোর আগে একটি দীর্ঘ ‘প্রস্তুতি পর্ব’ তৈরির পরিকল্পনার কারণে লর্ডসে খেলার পূর্ব নির্ধারিত সূচি প্রভাবিত হতে পারে। এই পরিকল্পনাটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে মাঠকর্মীরা পিচ নিয়ে কাজ করার জন্য সর্বোচ্চ সময় পান।
এই পরিকল্পনার ফলে কিছু ছোটখাটো বিনোদনমূলক ম্যাচ লর্ডস থেকে ওয়ার্মসলির স্যার পল গেটি’স গ্রাউন্ডে সরিয়ে নেওয়া হতে পারে। এই গ্রীষ্মে একটি সফল পাইলট প্রোগ্রামের পর এই ওয়ার্মসলিকে সহযোগী ভেন্যু হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে এমসিসি, যদিও এর বিস্তারিত বিবরণ এখনও নিশ্চিত করা হয়নি।
দীর্ঘমেয়াদী পিচ কৌশলের অংশ হিসেবে হাইব্রিড পিচ এবং ‘স্থায়ী ড্রপ-ইন’, পিচ উভয়ই ব্যবহার করার পরিকল্পনা করছে এমসিসি। সামনের বসন্তে তৃতীয় হাইব্রিড পিচ স্থাপন করা হবে, যা ৯৫ শতাংশ প্রাকৃতিক টার্ফ এবং ৫ শতাংশ সিন্থেটিক দিয়ে তৈরি হবে। নিকোলাস বলেছেন, “এগুলোর কার্যকর ব্যবহার আগামী কয়েক বছরের জন্য ৯ নম্বর পিচ হারানোর কারণে সৃষ্ট চাপ কমাতে সাহায্য করবে।”
টেস্ট ম্যাচে হাইব্রিড পিচের ব্যবহার বর্তমানে অনুমোদিত নয়। তবে উভয় দল এবং আইসিসি সম্মত হলে সীমিত ওভারের আন্তর্জাতিক ম্যাচে এটি ব্যবহার করা যেতে পারে। ইংল্যান্ডের ঘরোয়া ক্রিকেটে এটি প্রচলিত আছে আগে থেকেই। মনে করা হয় যে, এগুলি সাধারণ টার্ফ পিচের চেয়ে বেশি স্থিতিশীল আচরণ করে এবং ব্যবহারের পর দ্রুত পুনরায় ‘সতেজ’ হয়ে ওঠে।
এসবের পাশাপাশি প্রথমবার তিনটি ‘ড্রপ-ইন ট্রে’ তৈরি করছে এমসিসি। এর প্রথমটি নার্সারি গ্রাউন্ডে একটি নির্দিষ্ট সময় ধরে প্রস্তুত করার পর ২০২৮ সালে মূল সেন্টার উইকেটে নিয়ে আসা হবে। এই স্থায়ী ড্রপ-ইন পিচগুলো দীর্ঘমেয়াদী ভিত্তিতে স্থাপন করা হবে। অস্ট্রেলিয়ার যে ভেন্যুগুলোয় ক্রিকেট, রুলস ফুটবলসহ একাথিক খেলা হয়, সেই ভেন্যুগুলোর মতো এগুলোকে মৌসুমিভাবে সরানো ও প্রতিস্থাপন করা হবে না।
ডিমেরিট পয়েন্ট পাওয়া টেস্টের পর এই মৌসুমে আরও দুটি টেস্ট হয়েছে লর্ডসে - ভারতের বিপক্ষে ইংল্যান্ডের নারী টেস্ট এবং পাকিস্তানের বিপক্ষে ইংল্যান্ডের ছেলেদের টেস্ট। দুটি ম্যাচের পিচকেই ‘সন্তোষজনক’ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। এছাড়াও সীমিত ওভারের ক্রিকেটে যে চারটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ হয়েছে, সবকটিতে উইকেটকে বলা হয়েছে ‘খুব ভালো।’
লর্ডসে পরবর্তী টেস্ট বাংলাদেশের বিপক্ষে ইংল্যান্ডের, যেটি শুরু হবে আগামী ২৮ মে। এরপর জুনের শেষে আছে অ্যাশেজের একটি টেস্ট। পিচের সমস্যার কারণেই আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল আয়োজন করা হবে না ঐতিহ্যবাহী এই মাঠের। বর্তমান চক্রের ফাইনালের জন্য এর মধ্যেই বেছে নেওয়া হয়েছে ওভালকে।
