আজ থেকে প্রায় চার শ বছর আগের কথা। সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ, গোলমেলে ও রক্তক্ষয়ী। সহজ কথায় বলতে গেলে, দেশটাতে তখন এক ধরনের চরম বিশৃঙ্খলা কায়েম হয়েছিল। প্রশ্ন উঠেছিল, দেশ কি রাজা চালাবেন, নাকি দেশের সাধারণ মানুষের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা চালাবেন? এই ক্ষমতা দখলকে কেন্দ্র করে রাজা ও পার্লামেন্টের মধ্যে শুরু হয় ভয়াবহ এক গৃহযুদ্ধ। পুরো দেশ দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়, চারদিকে শুরু হয় হানাহানি আর ধ্বংসযজ্ঞ। বিচারব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে, আর আইনশৃঙ্খলা বলতে তখন আর কিছুই ছিল না।
চোখের সামনে দেশকে এভাবে রক্তে ভেসে যেতে দেখা এবং নিজের জীবন ও পরিবার নিয়ে প্রতি মুহূর্তে আতঙ্কে থাকার এই ভয়ংকর রাজনৈতিক পরিস্থিতি ইংরেজ দার্শনিক থমাস হবসের মনকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল। তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন যে, মাথার ওপর কড়া আইন, বিচার কিংবা কোনো শাসক না থাকলে মানুষ সুযোগ পেলেই কতটা হিংস্র ও স্বার্থপর হয়ে উঠতে পারে। এই বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি মানবস্বভাব এবং রাষ্ট্রহীন সমাজ নিয়ে এক গভীর দার্শনিক চিন্তা শুরু করেন।
কেন এবং কীভাবে প্রথম রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়েছিল, এই প্রশ্ন টি তাকে ভাবিয়ে তুলল। তিনি কল্পনা করলেন মানুষের আদিম জীবনে কথা, যাকে তিনি বলেছেন 'প্রাকৃতিক অবস্থা'। তিনি বললেন, সেই আদিম সময়ে কোনো রাষ্ট্র ছিল না, রাজা ছিল না, কিংবা কোনো ধরনের আইনের শাসনও ছিল না। আইনহীন সেই পৃথিবীতে মানুষ পুরোপুরি স্বাধীন ছিল, যা ইচ্ছে তাই করতে পারত, যেমন ইচ্ছে জীবন যাপন করত; যেন গভীর বনে বাস করা কিছু সাধারণ প্রানিদের মত। হবস বললেন, সেই মানুষেরা পরিপূর্ণ ভাবে স্বাধীন ছিল, কিন্তু সেই স্বাধীনতাই তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কারণ, তখন কোনো নৈতিকতা বা ন্যায়ের বালাই ছিল না; জোর যার মুল্লুক তার—এই নীতিতে সবাই সবার বিরুদ্ধে এক অন্তহীন যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। প্রত্যেকে নিজের স্বার্থ রক্ষায় অন্ধ এবং ক্ষমতার মোহে উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল। ফলে মানুষের জীবন হয়ে উঠেছিল চরম ভীতিময়, একাকী, ও ক্ষণস্থায়ী, যেখানে প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর খাঁড়া ঝুলত এবং জীবনের বিন্দুমাত্র নিরাপত্তা ছিল না।
হবস বললেন, এই অসহ্য, ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই মানুষ এক যুগান্তকারী পথ বেছে নেয়, যাকে ইতিহাসে ‘সামাজিক চুক্তি’ বলা হয়। মানুষ বুঝতে পেরেছিল যে, এই পারস্পরিক ধ্বংসাত্মক লড়াই চলতে থাকলে মানবজাতি চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই জীবন ও সম্পত্তির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সবাই মিলে একটি বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত নিল। তারা তাদের কিছু স্বাধীনতা স্বেচ্ছায় এক সর্বোচ্চ সার্বভৌম কর্তৃপক্ষ বা একজন নিরঙ্কুশ শাসকের হাতে সমর্পণ করল—যাকে হবস বললেন ‘লেভিয়াথান’ বা রাষ্ট্র।
থামাস হবসের দর্শনের মূল কথা ছিল এটিই। তিনি বুঝিয়েছিলেন, মানুষ স্বাধীনভাবে প্রাকৃতিক অবস্থায় থাকতে পারে, কিন্তু সেই অবস্থাটি এতটাই বিপদসংকুল, ভয়াবহ ও নৈরাজ্যময় যে সেখানে বেঁচে থাকা অসম্ভব। মানুষ যখন দেখল যে উন্মুক্ত স্বাধীনতার চেয়ে নিয়মের জীবন অনেক বেশি নিরাপদ, তখন তারা স্বেচ্ছায় সেই বিশৃঙ্খলা ছেড়ে একটি রাষ্ট্রের শৃঙ্খলার মাঝে আশ্রয় নিল। এভাবেই ভয়াবহতার আঁধার ভেদ করে জন্ম নিল রাষ্ট্র, যার কঠোর আইন ও শাসনের বেড়াজালে মানুষ খুঁজে পেল শান্তি, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার এক নতুন ঠিকানা।
কিন্তু থমাস হবস কতটা সঠিক ছিলেন আর কোথায় ভুল করেছিলেন?
থমাস হবস ইংল্যান্ডের তৎকালীন গৃহযুদ্ধ ও নৈরাজ্যের নির্মম বাস্তবতাকে সামনে রেখে মানব স্বভাব ও রাষ্ট্রদর্শনের তত্ত্বটি তৈরি করেছিলেন। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট দেশের নির্দিষ্ট সময়ের রাজনৈতিক সংকটকে বুঝতে গিয়ে তিনি সমগ্র মানবজাতির আদিম উৎস ও মনস্তত্ত্বকে যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, সেখানে বেশ কিছু বড় প্রশ্ন দেখা যায়। হবস দাবি করেছিলেন যে, প্রাকৃতিক অবস্থায় আদিম মানুষের জীবন ছিল অত্যন্ত অনিরাপদ, একা এবং ভয়াবহ। কিন্তু এই ধারণার গভীরে প্রবেশ করলে বেশ কিছু যৌক্তিক অসঙ্গতি ধরা পড়ে।
১. আধুনিক সুযোগ-সুবিধার চশমায় আদিম মানুষকে দেখা
আমরা যদি আজকের আধুনিক যুগের বিদ্যুৎ, উন্নত বাড়ি, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পোশাক কিংবা আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যার মাপকাঠিতে সেই সময়ের আদিম মানুষদের বিচার করি, তবে স্বাভাবিকভাবেই মনে হবে যে তাদের বেঁচে থাকার কোনো কথাই ছিল না। প্রাকৃতিক সেই জীবনে মানুষ ছিল বনের খরগোশ, স্লথ কিংবা ধীর গতির কোনো প্রাণীর মতো। মানুষের তো অন্য প্রানিদের মত ধারালো দাঁত নেই, না ছিল বিষাক্ত দংশন, না ছিল বাঘের মতো শক্তি কিংবা হাতিদের মতো মজবুত চামড়া বা সজারুর মত কাঁটা। শারীরিক শক্তির বিচারে মানুষ আসলেই অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় অনেক বেশি দুর্বল। তাহলে প্রশ্ন জাগে, শারীরিকভাবে এত দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও সেই আদিম মানুষগুলো কীভাবে টিকে থাকল, কীভাবে বড় হলো এবং ধীরে ধীরে এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রাণীতে পরিণত হলো? যদি প্রাকৃতিক অবস্থা কেবলই হিংস্রতা আর ‘সবাই সবার বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ হতো, তবে তো মানবজাতি আদিম যুগেই নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল।
২. শক্তির আসল উৎস
হবস মনে করেছিলেন আদিম মানুষ মানেই স্বার্থপর, লোভী এবং একে অপরের রক্তপিপাসু। কিন্তু লজিক বলছে, প্রকৃত সত্য এর সম্পূর্ণ উল্টো ছিল। প্রাকৃতিক অবস্থায় মানুষের টিকে থাকার মূল শক্তি ছিল তাদের একতাবদ্ধতা, ভালোবাসা এবং গভীর মমতা। আজকের যুগে একজন মা তাঁর সন্তানকে যেমন গভীর মমতায় আগলে রাখেন, বাবা তাঁর সন্তানকে রক্ষা করেন; আদিম যুগের মানুষেরা দলের সকলকেই সেই গভীর মমতায় ভালবাসতেন ও রক্ষা করতেন। জীবনের প্রয়োজনেই আদিম সমাজে মানুষ দলবদ্ধভাবে বসবাস করত। সেই সমাজে আজকের মতো ব্যক্তিগত অহংকার বা লোভ ছিল না; মর্যাদা কিংবা আভিজাত্যের কোন কনসেপ্ট ছিল না, কিন্তু ছিল একে অপরের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা, পারস্পরিক সাহায্য এবং গভীর সহমর্মিতার মানসিক অভ্যাস। এই মেলবন্ধন ও সহযোগিতা দ্বারাই তারা প্রতিকূল প্রকৃতি এবং হিংস্র বন্য প্রাণীদের বিরুদ্ধে লড়াই করে টিকে ছিল। এই সহযোগিতা আর ভালোবাসার অভ্যাস দিয়েই তারা রোগ, ব্যাধি, শীত, গ্রীষ্ম, ক্ষরা আর দুর্ভিক্ষ জয় করে বেঁচে ছিল। সুতরাং, প্রাকৃতিক অবস্থা মানেই কেবল ‘অনিরাপত্তা ও ভয়ংকর যুদ্ধ’ ছিল না; বরং তা ছিল এক আদিম ঐক্য, যেখানে ভালোবাসার উষ্ণতাই ছিল মানুষের সবচেয়ে বড় বর্ম।
৩. সভ্যতার ছদ্মবেশ
তাহলে পরিবর্তনটা কোথায় শুরু হলো? ভালোবাসার অভ্যাসে অভ্যস্ত মানুষ কীভাবে নৃশংস হতে শিখল, সহযোগিতার অভ্যাসে অভ্যস্ত মানুষ কীভাবে প্রতারণা করতে শিখল?
মানুষ যখন ধীরে ধীরে গুহা থেকে বেরিয়ে ‘সভ্য’ হতে শিখল, ঠিক তখনই তাদের আদিম সহজ-সরল মনস্তত্ত্বে ফাটল ধরতে শুরু করল। কেউ একজন ঝরনা থেকে এক টুকরো চকচকে পাথর কুড়িয়ে এনে সেটা গলায় ঝুলিয়ে অন্যদের দেখাল, কেউ সেটাকে সুন্দর বলল, আর অন্যরাও সেই রকম সুন্দর হওয়ার জন্য সেই পাথরের সন্ধান শুরু করল। পাথরটি ধীরে ধীরে সম্মান আর গৌরবের প্রতীক হয়ে উঠল। কেউ একটা বাড়ি বানাল আর সেটা অন্যদের দেখাল; যারা দেখল, তারাও সেই রকম বা তার চেয়েও সুন্দর বাড়ি বানাতে চাইল। কেউ একজন একখণ্ড জমির চারদিকে লাঠি পুঁতে দিয়ে বলল, "এটা আমার।" অন্যরাও কিছু জমি, কোনো গাছ, কোনো জলাশয় নিজের বলে দাবি করে বসল। কিছুদিন হয়তো এভাবেই চলেছিল, তারপর কারও মাথায় বুদ্ধি এল—কীভাবে অন্যের টা কেড়ে নিজের করে নেওয়া যায়; সেই কৌশল থেকেই মানুষ ক্রমশ আত্মকেন্দ্রিক, লোভী ও ক্ষমতালোভী হয়ে উঠতে থাকল। প্রত্যেকে নিজের আখের গোছানোর অভ্যাসে ব্যস্ত হয়ে পড়ল, আর পারস্পরিক বিশ্বাসের জায়গা দখল করল স্বার্থপরতা।
আজ আমরা যাকে সভ্যতা বলি, সেটা কি সত্যিই সভ্যতা, নাকি ‘সভ্যতা’ শব্দটাকেই হাইজ্যাক করা হয়েছে?
আদিম মানুষ ছিল ভালোবাসাপূর্ণ ও সহযোগিতাপ্রবণ ভালো মানুষ। শুধু খাবার পেলে এবং শীত কিংবা অন্য প্রাণীদের আক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকলেই তারা সুখী ছিল; কিন্তু আজ মানুষেরা জগতের সব সম্পদ একত্রিত করে অবিশ্বাস্য জৌলুসের মাঝে বাস করেও সুখী নয়। আজ আমরা চরম অহংকার নিয়ে যাকে ‘আধুনিক ও উন্নত সভ্যতা’ বলে দাবি করি, তার গভীরে রয়েছে মানুষের সহজাত ভালোবাসার মৃত্যু এবং স্বার্থপরতার এক নিষ্ঠুর রাজত্ব। হবস যে ভয়াবহতার কথা বলেছেন, তা আসলে আদিম মানুষের কোনো দোষ ছিল না; বরং তা হলো তথাকথিত সভ্যতার বুকেই জন্ম নেওয়া মেকি মর্যাদাবোধের মানসিক অভ্যাস ও স্বার্থপরতার অভ্যাস, যাকে হবস আদিম মানুষের জন্মগত স্বভাব বলেছিলেন।
লেখক পরিচিতি :
এ ইউ দৌলা
মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক
