পর্তুগালের গর্ব ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। তাঁকে দেশের প্রতীক বললেও ভুল হবে না। তাঁর নেওয়া যেকোনো পদক্ষেপেই নড়েচড়ে বসে ফুটবল বিশ্ব। শুধু ফুটবল অঙ্গন নয়, রাজনীতির মাঠেও পড়ে এর প্রভাব। যেমন জাতীয় দলের কোচ জর্জ জেসুসের সঙ্গে মনোমালিন্যের পর ক্যাম্প ছাড়ার ঘটনার রেশ পৌঁছেছিল দেশটির পার্লামেন্টেও।
পেশাদার ফুটবলে এক হাজার গোলের মাইলফলক ছোঁয়ার লক্ষ্যে এগিয়ে চলা রোনালদো যখনই জালে বল জড়ান, তখনই হিসাব-নিকাশ শুরু হয়—মাইলফলক থেকে আর কত দূরে তিনি। পাঁচবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী এই তারকা ইতোমধ্যে ৯৮১ গোল করেছেন। তবে সর্বশেষ তিনি আলোচনায় আসেন সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের আন্তর্জাতিক বিরতিতে। ১৮ বছর পর প্রথমবারের মতো নরওয়ের বিপক্ষে পুরো ম্যাচ বেঞ্চে বসে থাকতে হয়েছিল তাঁকে।
এর আগে ওয়েলসের বিপক্ষে বদলি হিসেবে মাঠ থেকে তুলে নেওয়া হয় রোনালদোকে। নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে দ্বিতীয়ার্ধে আধঘণ্টা খেলার প্রতিশ্রুতি পেয়ে গা গরমও করতে থাকেন তিনি। কিন্তু কোচ কথা রাখেননি। পুরো সময়ই তাঁকে বেঞ্চে বসে কাটাতে হয়। ডেনমার্কের বিপক্ষে ম্যাচেও শুরুর একাদশে থাকার নিশ্চয়তা না পেয়ে জাতীয় দলের ক্যাম্প ছাড়েন তিনি।
তাঁর এই আচরণকে কেউ কেউ দাম্ভিকতা হিসেবে দেখলেও তাঁকে যারা চেনেন-জানেন, তাঁরা বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছেন। অনেকেই তখন রোনালদোর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ দেখে ফেলেছিলেন। কিন্তু পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন তাঁর গুরুত্ব বুঝে তাঁর সঙ্গে বিরোধ মিটিয়ে ফেলার উদ্যোগ নেয়। পরে এক দীর্ঘ বিবৃতিতে নিজের কৃতকর্মের জন্য সতীর্থ ও ভক্তদের কাছে ক্ষমা চান সিআর সেভেন। একই সঙ্গে আবারও পর্তুগালের জার্সি পরার ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং ফেডারেশনের কাছে নিজের শাস্তিও দাবি করেন।
এর কিছুদিন পর পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন (এফপিএফ) তাঁকে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করে। তখন থেকে শোনা যাচ্ছিল, সর্বনিম্ন এক মাস থেকে সর্বোচ্চ ছয় মাসের নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে। ধারণা করা হচ্ছিল, দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়ায় সর্বোচ্চ শাস্তি না হলেও তিন মাস নিষিদ্ধ হতে পারেন ৪১ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড।
সোমবার এলো আনুষ্ঠানিক রায়। এফপিএফ রোনালদোকে ৩০ দিনের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, যা ৩০ সেপ্টেম্বর ডেনমার্কের বিপক্ষে ম্যাচের দিন থেকে কার্যকর বলে ধরা হয়েছে। ফলে নিষেধাজ্ঞার ১৯ দিন ইতোমধ্যে কাটিয়ে ফেলেছেন তিনি। আগামী ১৪ নভেম্বর ডেনমার্কের বিপক্ষে পর্তুগালের পরবর্তী ম্যাচের দুই সপ্তাহ আগেই শেষ হবে শাস্তির মেয়াদ।
এ ছাড়া তাঁকে জরিমানা করা হয়েছে মাত্র ২৫৫ ইউরো, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। এই অর্থ দিয়ে পর্তুগালের পরবর্তী ম্যাচের দুটি টিকিটও কেনা যাবে না। আর আল নাসরে দৈনিক আট কোটি টাকা আয় করা এই ফরোয়ার্ডের জরিমানার অর্থ জোগাতে লাগবে মাত্র ৩৮ সেকেন্ড। এমন নামমাত্র জরিমানা নিয়ে পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশনকে উপহাস করেছেন অনেকে। কেউ কেউ এই শাস্তিকে ‘লোক দেখানো’ ও ‘নামমাত্র’ বলে মন্তব্য করেছেন।
তবে ফেডারেশন এই শাস্তিকে ‘যথেষ্ট ও পর্যাপ্ত’ বলে অভিহিত করেছে। রোনালদোকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে কী কী বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, তা-ও বিবৃতিতে জানিয়েছে তারা।
এফপিএফের শৃঙ্খলা কমিটি বলেছে, রোনালদোর বিবৃতিতে প্রকাশিত ‘অনুশোচনা’ এবং ‘ফুটবলে তাঁর অবদান ও ক্রীড়ানৈপুণ্যের স্বীকৃতি’ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। তারা আরও জানিয়েছে, আত্মপক্ষ সমর্থনে রোনালদো তাঁর পুরস্কার ও অর্জনের বিবরণসহ একটি জীবনবৃত্তান্ত জমা দিয়েছিলেন। এ ছাড়া তিনি আগের বিবৃতির কথা উল্লেখ করেন, যেখানে নিজের কৃতকর্মের দায় স্বীকার করে সতীর্থ ও ভক্তদের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন। একই সঙ্গে নিজের শাস্তিও দাবি করেছিলেন। এসব কারণেই রোনালদো বড় ধরনের শাস্তি থেকে রেহাই পেয়েছেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছে এফপিএফ।
