বন্ধ শিল্পকারখানা চালু করা, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ নেওয়া হলেও ঋণ বিতরণে গতি নেই। ১৫টি স্কিমে বরাদ্দের বিপরীতে এখন পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে ১২ হাজার কোটি টাকারও কম, যা মোট বরাদ্দের ১৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ। এর বাইরে আরও আড়াই হাজার কোটি টাকার ঋণ প্রক্রিয়াধীন আছে। অর্থাৎ মোট বরাদ্দের প্রায় ৭৬ শতাংশের বেশি অর্থ এখনও বিতরণ বা প্রক্রিয়াধীন পর্যায়ে আসেনি। তিনটি কর্মসূচিতে এখন পর্যন্ত কোনো ঋণ বিতরণ হয়নি, এমনকি কোনো অর্থ প্রক্রিয়াধীনও নেই। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, প্রণোদনা ঋণ পেতে ব্যাংক পর্যায়ে নানা জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার মুখে পড়ছেন। কোথাও অতিরিক্ত কাগজপত্র চাওয়া হচ্ছে, কোথাও আবেদন গ্রহণে অনীহা দেখানো হচ্ছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে ঋণের আবেদন নিষ্পত্তিতেও দীর্ঘ সময় লাগছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফেরানোর উদ্যোগ বাস্তবায়নে বাধা তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, নতুন এই উদ্যোগ চালু করতে তহবিল সংগ্রহ, ব্যাংকগুলোর সঙ্গে চুক্তি, ঋণ যাচাই এবং পরিচালনাপদ্ধতি নির্ধারণসহ বেশকিছু প্রাথমিক কাজ করতে হয়েছে। এ কারণে প্রথমদিকে ঋণ বিতরণের দৃশ্যমান অগ্রগতি কম। পরবর্তী মাসগুলোতে ঋণ বিতরণ দ্রুত বাড়বে। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগও খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু প্রণোদনা ঘোষণা বা দ্রুত ঋণ বিতরণ করলেই অর্থনীতিতে গতি ফিরবে না। অর্থ পৌঁছাতে হবে প্রকৃত প্রয়োজন রয়েছে এমন উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠানের কাছে। ব্যাংকের পরিচিত গ্রাহকনির্ভরতা, নতুন উদ্যোক্তাদের ঋণ পেতে জটিলতা এবং অতিরিক্ত কাগজপত্রের কারণে অর্থায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই নিয়মকানুন ও জবাবদিহি বজায় রেখেই ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ সহজ এবং দ্রুত করা জরুরি।
পলিসি থিঙ্ক অ্যান্ড রিসার্চের (পিটিআর) চেয়ারম্যান ও অর্থনীতি বিশ্লেষক মাজেদুল হক আমাদের সময়কে বলেন, অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে শুধু প্রণোদনা ঘোষণা বা দ্রুত ঋণ বিতরণ যথেষ্ট নয়; অর্থায়ন করতে হবে প্রকৃত প্রয়োজন রয়েছে এমন উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠানে। অতীতেও দ্রুত ঋণ বিতরণ করা হলেও সঠিক খাতে অর্থায়ন না হওয়ায় প্রত্যাশিত সুফল মেলেনি। তিনি বলেন, প্রণোদনা ঋণ দিতে গিয়ে অনেক ব্যাংক পরিচিত গ্রাহকদের অগ্রাধিকার দেয়, নতুন উদ্যোক্তারা পিছিয়ে পড়েন। অতিরিক্ত কাগজপত্র ও জটিল দাপ্তরিক প্রক্রিয়াও ঋণ বিতরণে বিলম্ব ঘটায়। তাই নিয়মকানুন ও জবাবদিহি বজায়
রেখে ব্যাংকগুলোকে উদ্যোক্তাবান্ধব হতে হবে এবং ঋণ অনুমোদন ও অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া দ্রুত করতে হবে। বন্ধ কারখানা চালুর ক্ষেত্রেও প্রকৃত প্রয়োজন যাচাইয়ের পাশাপাশি দাপ্তরিক দীর্ঘসূত্রতা কমানো জরুরি বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, সরকার বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করে প্রণোদনা দিচ্ছে। তাই অর্থের অপব্যবহার রোধ করে তা সঠিক খাতে ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে উদ্যোক্তারা উপকৃত হন এবং অর্থনীতিতে বাস্তব গতি আসে।
বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে স্থবির অর্থনীতি চাঙা করতে গত মে মাসে বিভিন্ন খাতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব প্যাকেজের মূল লক্ষ্য বন্ধ শিল্পকারখানায় অর্থের জোগান, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার ব্যবসায় গতি ফেরানো, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙা করা, উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতির পুনরুদ্ধার করা। কিন্তু এত বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দের বিপরীতে প্রথম ছয় মাসের ঋণ বিতরণের চিত্র বলছে, উদ্যোগের পরিধির সঙ্গে বাস্তব অগ্রগতির ব্যবধান এখনও বড়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৫ অক্টোবরে হিসাব অনুযায়ী, ১৫টি স্কিমে ৬০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে এখন পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে ১১ হাজার ৯৫৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা। আরও ২ হাজার ৫৫৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকা রয়েছে প্রক্রিয়াধীন। বিতরণ ও প্রক্রিয়াধীন অর্থ একসঙ্গে ধরলেও অঙ্কটি দাঁড়ায় ১৪ হাজার ৫১৯ কোটি ৭৯ লাখ টাকা, যা মোট বরাদ্দের প্রায় ২৪ দশমিক ২০ শতাংশ। অর্থাৎ বরাদ্দের প্রায় ৭৬ শতাংশ অর্থ এখনও বিতরণ বা প্রক্রিয়াধীন—কোনো হিসাবেই নেই।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মো. আরিফ হোসেন খান আমাদের সময়কে বলেন, প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ঋণ বিতরণে শুরুতে কিছুটা সময় লেগেছে। এটি নতুন ধরনের উদ্যোগ হওয়ায় প্রথমে সবল ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহ, অংশগ্রহণে আগ্রহী ব্যাংকগুলোর সম্মতি নেওয়া এবং তাদের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করতে হয়েছে। এরপর ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের কাছ থেকে আবেদন নিয়ে যাচাই-বাছাই করেছে। যেসব গ্রাহককে ঋণ পাওয়ার যোগ্য মনে হয়েছে, তাদের আবেদন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে অনুমোদনের পর বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হয়েছে। এ প্রক্রিয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংককে পুরো স্কিম পরিচালনার পদ্ধতিও নির্ধারণ করতে হয়েছে। এসব প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন করতে সময় লাগায় প্রথম দুই-তিন মাসে ঋণ বিতরণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি। তবে পরবর্তী মাসগুলোতে একই প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি কমে আসবে এবং দ্রুত ঋণ বিতরণ বাড়বে বলে আশা করছেন তারা।
সবচেয়ে বড় বরাদ্দের স্কিমেই বিতরণ সামান্য: ১৫টি স্কিমের মধ্যে বন্ধ শিল্পকারখানা ও সেবা খাতের জন্য সহায়তা প্রাক্?-অর্থায়ন স্কিমে বরাদ্দ রাখা হয়েছে সর্বোচ্চ ২০ হাজার কোটি টাকা। অথচ এ পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে মাত্র ৫৬০ কোটি ৯৩ লাখ টাকা, যা বরাদ্দের প্রায় ২ দশমিক ৮ শতাংশ। আরও ৯২৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বিতরণ ও প্রক্রিয়াধীন অর্থ মিলিয়েও অঙ্কটি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৯০ কোটি ৪৩ লাখ টাকা, যা বরাদ্দের ৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ। অর্থাৎ বন্ধ শিল্পকারখানা ও সেবা খাতকে সচল করতে রাখা ২০ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে এখন পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে ৬০০ কোটি টাকারও কম। এ স্কিমের আওতায় ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ীারা। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিদের এক বৈঠকে ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল থেকে ঋণ নিতে গিয়ে ব্যাংক পর্যায়ে নানা ধরনের জটিলতা ও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার সৃষ্টি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কাগজপত্র চাওয়া হচ্ছে, আবার ঋণের আবেদন নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতেও দীর্ঘ সময় লাগছে। এ বিষয়ে বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে সুবিধা নিতে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ রয়েছে; কিন্তু বিভিন্ন ব্যাংকের অসহযোগিতার কারণে অনেকেই আবেদন করতে পারছেন না। কোনো কোনো ব্যাংক আবেদন গ্রহণে অনীহা দেখাচ্ছে, আবার কিছু ব্যাংক নানা অজুহাতে উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা পরিপত্রে কিছু জটিলতা রয়েছে। এসব জটিলতা দ্রুত দূর করে ইতোমধ্যে জমা পড়া আবেদনগুলো নিষ্পত্তির দাবি জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকেও বিষয়টি দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পের (সিএমএসএমই) চলতি মূলধন পুনঃঅর্থায়ন তহবিলে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে বিতরণ হয়েছে ৯০৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। বরাদ্দের হিসাবে বিতরণের হার প্রায় ১৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। কুটির ও অতি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টির বিশেষ স্কিমে অবশ্য ৫ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বিতরণ হয়েছে। অর্থাৎ এ স্কিমে বরাদ্দের অর্ধেক অর্থ বিতরণ করা সম্ভব হয়েছে। তবে সামগ্রিক চিত্রে বেশিরভাগ স্কিমেই বরাদ্দের তুলনায় ঋণ বিতরণের হার কম।
কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থায়ন সীমিত: কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গ্রামীণ এলাকায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কিন্তু এ স্কিমে বিতরণ হয়েছে মাত্র ২৯২ কোটি ৯০ লাখ টাকা, যা বরাদ্দের ৩ শতাংশেরও কম। উত্তরাঞ্চলে কৃষিভিত্তিক বিশেষ অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য ৩ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন স্কিম রয়েছে। এ স্কিমে বিতরণ হয়েছে মাত্র ৪৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ বরাদ্দের প্রায় ১ দশমিক ৬২ শতাংশ। গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনতে রাখা ১ হাজার কোটি টাকার স্কিমে এখন পর্যন্ত কোনো অর্থ বিতরণ হয়নি। তালিকায় এ স্কিমের বিপরীতে কোনো অর্থ প্রক্রিয়াধীন থাকার তথ্যও নেই। কৃষি, গ্রামীণ অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দের তুলনায় বিতরণের এমন চিত্র প্রণোদনা প্যাকেজের বাস্তব অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।
তিন স্কিমে বিতরণ ও প্রক্রিয়াধীন অর্থ শূন্য: রপ্তানি বহুমুখীকরণ, গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং হিমায়িত চিংড়ি ও অন্যান্য মৎস্য রপ্তানিমুখী খাতের জন্য রাখা তিনটি স্কিমে এখন পর্যন্ত কোনো অর্থ বিতরণ হয়নি। এসব স্কিমে অর্থ প্রক্রিয়াধীন থাকার তথ্যও নেই। রপ্তানি বহুমুখীকরণ খাতে বরাদ্দ ৩ হাজার কোটি টাকা, হিমায়িত চিংড়ি ও অন্যান্য মৎস্য রপ্তানিমুখী খাতে ২ হাজার কোটি টাকা এবং গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনতে ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। সব মিলিয়ে ৬ হাজার কোটি টাকার এই তিন স্কিমে বিতরণ ও প্রক্রিয়াধীন—দুই হিসাবই শূন্য। তবে চামড়াজাত পণ্য ও জুতা রপ্তানিমুখী খাতের চিত্রও উদ্বেগজনক। এ খাতে ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও কোনো অর্থ বিতরণ হয়নি। যদিও ৯৮ কোটি টাকা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সবুজ কারখানা ভবন ও পরিবেশবান্ধব শিল্প খাতের জন্য বরাদ্দ ১ হাজার কোটি টাকা। এ স্কিমে কোনো অর্থ বিতরণ না হলেও ৫২৭ কোটি ৪৭ লাখ টাকা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য রাখা ১ হাজার কোটি টাকার স্কিমেও বিতরণ শূন্য; তবে পুরো অর্থ প্রক্রিয়াধীন হিসেবে দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ কয়েকটি স্কিমে আবেদন বা অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া এগোলেও গ্রাহকের হাতে ঋণ পৌঁছানোর ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়নি।
