ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, বাংলাদেশে নারীদের মধ্যে স্তন ক্যানসারের প্রকোপ বাড়ছে। এটি শুধু নারীদের স্বাস্থ্য ও জীবনের জন্য হুমকি নয়, পরিবার, সমাজ ও জাতীয় অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে
দেশে স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যান্সার প্রতিরোধ এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করছে সরকার। এ লক্ষ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ, রোগনির্ণয়ের সক্ষমতা বাড়ানো এবং সময়মতো চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার।
বিশ্ব স্তন ক্যানসার সচেতনতা মাস-২০২৬ উপলক্ষে ঢাকার বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি হাসপাতালে আয়োজিত এক সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আজ তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার শাখাওয়াত হোসেন বকুল। হাসপাতাল পরিচালকের সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) মহাসচিব, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক, চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, বাংলাদেশে নারীদের মধ্যে স্তন ক্যানসারের প্রকোপ বাড়ছে। এটি শুধু নারীদের স্বাস্থ্য ও জীবনের জন্য হুমকি নয়, পরিবার, সমাজ ও জাতীয় অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
তিনি বলেন, স্তন ক্যানসারের বড় চ্যালেঞ্জ হলো রোগটি দেরিতে শনাক্ত হওয়া। সচেতনতার অভাব, সামাজিক সংকোচ, সময়মতো স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করানো এবং সহজলভ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক নারী রোগের অগ্রসর পর্যায়ে চিকিৎসা নিতে আসেন। এতে চিকিৎসা জটিল ও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে রোগীর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনাও কমে যায়।
ড. হায়দার জানান, সরকারের লক্ষ্য শুধু ক্যানসার আক্রান্ত নারীদের চিকিৎসা দেয়া নয়। এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে নারীরা ক্যানসার সম্পর্কে সচেতন হবেন, প্রাথমিক লক্ষণ চিনতে পারবেন এবং রোগের শুরুতেই প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা পাবেন।
তিনি আরো বলেন, সরকার দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে চিকিৎসানির্ভর কাঠামো থেকে প্রতিরোধ, স্বাস্থ্যসুরক্ষা, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ ও সময়মতো চিকিৎসানির্ভর আধুনিক জনমুখী ব্যবস্থায় রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা অন্যতম অগ্রাধিকার।
ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার জানান, সরকারের পরিকল্পনায় কমিউনিটি পর্যায় থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা হাসপাতাল পর্যন্ত স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রতিরোধ এবং প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণের সক্ষমতা ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে।
এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে নারীদের মধ্যে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি ও সতর্কসংকেত সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো হবে। নিজের স্তনের স্বাভাবিক অবস্থা ও পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন থাকার বিষয়েও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর মাধ্যমে স্তন পরীক্ষা এবং বয়স ও ঝুঁকি বিবেচনায় উপযুক্ত স্ক্রিনিং ও রোগনির্ণয় সেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
নিয়মিত মাতৃস্বাস্থ্যসেবা ও গর্ভকালীন সেবার সঙ্গে স্তনস্বাস্থ্য মূল্যায়ন, স্তন ক্যানসারের সতর্কসংকেত শনাক্তকরণ এবং উপযুক্ত ক্ষেত্রে জরায়ুমুখের ক্যানসার স্ক্রিনিং ও রেফারেল সেবা যুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
এর ফলে নারীরা নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা নেয়ার সময়ই ক্যানসার প্রতিরোধ ও প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ বিষয়ে পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় সেবা পাবেন। পাশাপাশি কমিউনিটি হেলথ অ্যান্ড ওয়েলবিয়িং ওয়ার্কারসহ মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যানসারের ঝুঁকি, সতর্কসংকেত, প্রাথমিক মূল্যায়ন, সচেতনতা সৃষ্টি এবং যথাযথ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রেফারেলের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে।
ড. হায়দার বলেন, ক্যানসার শনাক্তের প্রথম সুযোগ রাজধানীর কোনো বিশেষায়িত হাসপাতালে সীমাবদ্ধ না রেখে নারীর নিজস্ব এলাকা ও কাছের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রেই তৈরি করতে চায় সরকার।
অনুষ্ঠানে তিনি সম্প্রতি ঘোষিত ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের (ইআইবি) ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বা ২৫০ মিলিয়ন ইউরোর নতুন বিনিয়োগ উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি জানান, এ বিনিয়োগের লক্ষ্য বাংলাদেশের বিদ্যমান স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রতিরোধ, প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ, রোগনির্ণয় এবং প্রাথমিক চিকিৎসাসেবাকে সমন্বিতভাবে শক্তিশালী করা।
বিশেষ করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা হাসপাতালে দক্ষ জনবল, প্রশিক্ষণ, রোগনির্ণয়ের সক্ষমতা, চিকিৎসাসেবা এবং রেফারেল ব্যবস্থার উন্নয়নে এ বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রধান অতিথি স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার শাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, স্তন ক্যানসার মোকাবেলায় জনসচেতনতা অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। শুধু হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবা বাড়িয়ে এ রোগের বোঝা কমানো সম্ভব নয়। এ জন্য নারীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাধা দূর করা জরুরি।
তিনি দেশব্যাপী টেলিভিশন, বেতার, সংবাদপত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল মাধ্যমে সমন্বিত সচেতনতামূলক প্রচার চালানোর ওপর গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী, শিক্ষক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, নারী সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবক ও সামাজিক নেতৃত্বের মাধ্যমে সরাসরি সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানোর আহ্বান জানান।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, প্রত্যেক নারীকে নিজের স্তনের স্বাভাবিক গঠন ও পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। স্তনে অস্বাভাবিক চাকা বা গিঁট, আকৃতির পরিবর্তন, ত্বকে অস্বাভাবিক পরিবর্তন কিংবা স্তনবৃন্ত থেকে অস্বাভাবিক নিঃসরণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। তবে নিজে স্তন পরীক্ষা করা নিয়মিত চিকিৎসাভিত্তিক স্ক্রিনিংয়ের বিকল্প নয়।
তিনি আরো বলেন, নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা শুধু স্বাস্থ্য খাতের কোনো বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি নয়। এটি জাতীয় উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মৌলিক অগ্রাধিকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার এমন স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যেখানে আর্থিক সামর্থ্য, সামাজিক অবস্থান কিংবা ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কোনো নারী প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ও চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হবেন না।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বিশ্ব স্তন ক্যানসার সচেতনতা মাস উপলক্ষে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ এবং সময়মতো চিকিৎসা নেয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
