আজকাল ওয়েবডেস্ক: নদিয়ার নবদ্বীপের বাগানিয়াপাড়ার ৩০ জন গৃহিণীর কাছে, সংসার চালানোর জন্য পাওয়া মাসিক সরকারি আর্থিক সহায়তা এখন তাঁদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণের মূলধন হয়ে উঠেছে। রাজ্য সরকারের অন্যতম প্রধান আর্থিক সহায়তা প্রকল্প ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’-র এক মাসের অনুদানের টাকা জমিয়ে, এই গৃহিণীরা নিজেদের এলাকায় প্রথমবার দুর্গাপুজোর আয়োজন করেন। সামান্য এই অবদান এখন এক অনন্য সামাজিক উৎসব ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার রূপ নিয়েছে।
বাংলার সবচেয়ে বড় উৎসব নিজেদের বাড়ির আরও কাছে নিয়ে আসা। এই ভাবনা থেকেই জন্ম হয়েছিল এই সহজ অথচ গভীর প্রয়োজন। বাগানিয়াপাড়য় কোনও দুর্গাপুজো হত না। দুর্গাপূজার মণ্ডপ হয় পাশের এলাকা ‘ছোট আঙিনা’-য়, যা প্রায় ১ কিলোমিটার দূরে। ভৌগোলিক দূরত্ব খুব বেশি না হলেও, ওই মণ্ডপে নিজেদের আপন বলে মনে হত না বলে জানিয়েছেন বাগানিয়াপাড়ার গৃহিণীরা। অনেকে আবার নবদ্বীপের পাঁচমাথা মোড়ে অবস্থিত ‘অভয়া মা’ মন্দিরে পিজো দিতে প্রায় ২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতেন।
এ বছর বাগানিয়াপাড়ার গৃহিণীরা সিদ্ধান্ত নেন, উৎসবের আমেজে শামিল হতে আর অন্য কোথাও যেতে হবে না। মহাসপ্তমী থেকেই বাগানিয়াপাড়ায় এক নতুন মেলবন্ধনের আবহে দুর্গাপুজো উদযাপিত হয়। যে মহিলারা আগে অন্য মণ্ডপে দূর থেকে উৎসব দেখতেন, আজ তাঁরাই আয়োজক হিসেবে মূল ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।
‘বাগানিয়াপাড়া মহিলা পুজো কমিটি’-র সভানেত্রী শম্পা দাসের মাথায় প্রথম এই ভাবনা এসেছিল। সেই ভাবনাই তিনি পাড়ার অন্যান্য গৃহিণীদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছিলেন। সেই শম্পা বলেন, “আগে আমরা কখনওই এভাবে দুর্গাপুজো উদযাপন বা উপভোগ করতে পারিনি। অন্য মণ্ডপগুলো আমাদের বাড়ি থেকে ১ বা ২ কিলোমিটার দূরে ছিল, সেখানে আমরা কেবল দর্শক হিসেবেই থাকতাম। এবার আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, অন্নপূর্ণা যোজনার এক মাসের অনুদান কাজে লাগিয়ে নিজেদের গ্রানেই পুজোর আয়োজন করব।”
শম্পার এই প্রস্তাবে অন্য মহিলারাও সাড়া দেন। আগস্ট মাস থেকেই শুরু হয় প্রস্তুতি। একটি আনুষ্ঠানিক পুজো কমিটি গঠন করা হয় এবং একটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টও খোলা হয়। ত্রিশজন গৃহিণী তাঁদের প্রত্যেকের মাসিক ৩,০০০ টাকার অনুদান দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হন, যার ফলে মোট ৯০,০০০ টাকার একটি তহবিল গড়ে ওঠে। রাজ্য সরকার ১ লক্ষ টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছে, যা এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে সাহায্য করেছে।
কমিটির সদস্য সুনন্দা ঘোষ বলেন, “আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, যতদিন আমরা এই প্রকল্পের (অন্নপূর্ণা যোজনা) আওতায় আর্থিক সহায়তা পাব, ততদিন প্রতি বছর আমরা এক মাসের প্রাপ্ত অর্থ দুর্গাপুজোর জন্য দেব। এছাড়া, আরও সহায়তার জন্য আমরা রাজ্য সরকারের কাছে আবেদন জানাব।”
শম্পা বলেন, “এর আগে আমরা ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্পের আওতায় ১,৫০০ টাকা পেতাম। শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের দেওয়া ৩,০০০ টাকার বর্ধিত সহায়তা আমাদের দুর্গাপুজো আয়োজনের স্বপ্ন পূরণে উৎসাহিত করেছে।”
পুজোয় অর্থ প্রদানের সিদ্ধান্তটি ছিল সম্পূর্ণ স্বেচ্ছামূলক। যদিও এলাকার আরও অনেক মহিলা ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’-র সুবিধা পান, তবুও কমিটি তাঁদের কাউকে চাঁদা দেওয়ার জন্য বাধ্য করেনি।
কমিটির সদস্যারা দুর্গাপুজোয় বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান, বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান এবং ‘ভোগ’-এর আয়োজন করেছিলেন। কমিটির সদস্য পামেলা সাহা বলেন, “দুর্গাপুজো আয়োজন করাটা এক দারুণ অনুভূতি। আমরা আশা করি, আরও বেশি মহিলা ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’-র এক মাসের অর্থ এই পুজোয় দান করবেন কারণ এই পুজো আমাদের এলাকার গর্ব।”
