একসময় রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রাম, শ্রমিক-কৃষকের অধিকার আদায় এবং স্বৈরাচারবিরোধী লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি ছিল বাম দলগুলো। ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান থেকে শুরু করে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন— দেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের নানা পর্যায়ে ছিল তাদের সক্রিয় উপস্থিতি। গান, নাটক, কবিতা ও সাংস্কৃতিক প্রতিবাদের মধ্য দিয়েও সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন ছড়িয়ে দিয়েছেন বামপন্থি রাজনীতিকরা। তবে সময়ের পরিবর্তনে সেই অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি বাম রাজনীতি। আদর্শিক বিভক্তি, সাংগঠনিক দুর্বলতা, নেতৃত্বের সংকট এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান দূরত্বে সংকুচিত হয়েছে তাদের রাজনৈতিক পরিসর। সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শোচনীয় ফল সেই সংকটকে আরও স্পষ্ট করেছে। এ অবস্থায় জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো, সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা এবং স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ঘুরে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার করছেন বাম দলগুলোর নেতারা।
সূত্রমতে, বর্তমানে দেশে অন্তত ২৩টি বাম রাজনৈতিক
দলের অস্তিত্ব রয়েছে। এর মধ্যে কোনো কোনো দল ভেঙে দুই থেকে তিন ভাগ হয়েছে। নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বাংলাদেশের কমিউনিস্ট রাজনীতিতেও বড় ধরনের ভাঙাগড়া শুরু হয়। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলটির বিরোধী শিবিরে থাকা বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাংলাদেশ জাসদ, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি এবং বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলসহ (মার্কসবাদী) কয়েকটি দল এখনও সক্রিয়। তবে এসব দলের কোনো কোনোটি সীমিত পরিসরে কর্মসূচি পালন করছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বামপন্থি দলগুলোর বিপর্যয় এই সংকটকে আরও স্পষ্ট করেছে। গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের ব্যানারে ১৪৯টি আসনে প্রার্থী দেওয়া হলেও কোনো প্রার্থীই জয়ী হতে পারেননি। প্রার্থীদের সবাই জামানত হারিয়েছেন। নির্বাচনের এই ফল বাম দলগুলোর সাংগঠনিক শক্তি ও জনসমর্থনের দুর্বলতা সামনে এনেছে। একসময় রাজপথের আন্দোলনে প্রভাব রাখা দলগুলো কেন ভোটের মাঠে কার্যকর শক্তি হয়ে উঠতে পারছে না, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
অথচ স্বাধীনতার আগে থেকেই দেশের রাজনীতিতে কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের নির্বাচনী উপস্থিতি ছিল। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের অধীনে এবং স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে কমিউনিস্ট নেতারা কিছুটা সাফল্য দেখান। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকার ধারাবাহিকতায় ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন দলের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বাম ধারার দলগুলো নয়টি আসন পায়। তবে পরবর্তী সময়ে বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী দেশের রাজনীতিতে প্রধান শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করে। বামপন্থিরা আর নিজেদের শক্তিতে সেই অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি; বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের সাংগঠনিক ও নির্বাচনী শক্তি ক্ষয় হয়েছে।
সর্বশেষ নির্বাচনের ফলে দেশের রাজনীতিতে দুই ধারার বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। একদিকে বামপন্থি দলগুলোর নির্বাচনী বিপর্যয়, অন্যদিকে ইসলামপন্থি দলগুলোর সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি। জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসন পেয়ে সংসদে প্রধান বিরোধী দল হয়েছে। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুটি এবং খেলাফত মজলিস একটি আসন পেয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও একটি আসন পেয়েছে। এই ফল ইসলামপন্থি দলগুলোর নির্বাচনী উপস্থিতি বিস্তারের চিত্র তুলে ধরেছে। তবে ইসলামপন্থিদের অগ্রগতিকে বাম রাজনীতির সংকোচনের সরাসরি কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করেন বাম নেতারা। তাদের মতে, দুই ধারার সাংগঠনিক সক্ষমতা, জনসম্পৃক্ততা এবং রাজনৈতিক কৌশলের পার্থক্য বিশ্লেষণ করা জরুরি।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টদের মতে, বামপন্থিদের সামনে এখন অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তোলা। বড় দলের ছায়ায় থাকলে স্বল্পমেয়াদে কিছু সুবিধা মিললেও দীর্ঘমেয়াদে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। মানুষ বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি দেখতে চায়, সহযোগী শক্তি নয়। তাই নীতিগত বিষয়ে আপস না করে স্বাধীন অবস্থান নেওয়ার সাহস দেখাতে হবে। একসময় রাজনৈতিক আলোচনায় প্রশ্ন ছিল, মধ্যপন্থি দলগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি কিংবা রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখবে কোন শক্তি— বামপন্থি, নাকি ডানপন্থি দল। কিন্তু ভোটের রাজনীতিতে বামপন্থিরা ক্রমেই পিছিয়ে পড়েছে। বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ঐক্যজোট, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, জমিয়তসহ বিভিন্ন ইসলামপন্থি দল নিজেদের রাজনৈতিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) প্রধান উপদেষ্টা খালেকুজ্জামান আমাদের সময়কে বলেন, বামপন্থি রাজনীতির দুর্বলতা বা ঘাটতি নেই, তা বলব না। তবে বর্তমানে দেশে যে রাজনীতি চলছে, তা বামপন্থিদের অনুকূলে নয়। এই রাজনীতির সঙ্গে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার সম্পর্ক নেই। বেসামরিক সরকার প্রতিষ্ঠার পর বড় রাজনৈতিক দলগুলোর আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার মতো প্রস্তুতি ও নেতৃত্ব বাম দলগুলো গড়ে তুলতে পারেনি। বামপন্থিদের একটি অংশ আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছে। জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের সময়ও তাদের একটি অংশের অবস্থান ছিল দ্বিধাগ্রস্ত। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটছে বিশ্বজুড়ে। এটা বেশি দিন চলবে না। তখনই বামপন্থি শক্তি ঘুরে দাঁড়াবে।
বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক মনে করেন, দেশের মানুষ এখনও বাম নেতৃত্বের প্রতিই আস্থাশীল। তার ভাষ্য, মানুষ বিশ্বাস করে, বাম নেতারাই সবসময় দেশের মানুষের পক্ষে থাকেন। তবে বাম রাজনীতির শীর্ষ নেতৃত্বের একটি অংশের ক্ষমতার প্রতি আকর্ষণ, মন্ত্রিত্বের প্রত্যাশা এবং বড় দলের সঙ্গে আপসের প্রবণতা বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার পথে বাধা সৃষ্টি করেছে। তার মতে, ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির সঙ্গে আপস করতে গিয়ে বামপন্থিদের একটি অংশ নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় ধরে রাখতে পারেনি। ফলে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়েছে। তবে বাম দলগুলো ঘুরে দাঁড়াতে পারলে মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার পথ সুগম হবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ আমাদের সময়কে বলেন, বাম রাজনীতির সঙ্গে প্রচলিত ডানপন্থি রাজনীতি মিলবে না। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে বর্তমানে যারা ক্ষমতায় আছেন, তারা সবাই ডানপন্থি ধারার। বাম রাজনীতি মেহনতি, শ্রমজীবী ও খেটে খাওয়া মানুষের অধিকারের কথা বলে। ধনিক শ্রেণির বুর্জোয়া রাজনীতির জন্য এটি বাধা। এ কারণে তারা আমাদের বিষয়ে বিরাগভাজন। সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে আমরা জনগণের কাছে পুরোপুরিভাবে পৌঁছতে পারি না, এটা সত্য। তবে আমরা যখন তাদের কাছে পৌঁছে অধিকার নিয়ে কথা বলি, তখন তারা আমাদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা প্রকাশ করেন। আমরা জনগণের সঙ্গে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে যেভাবে যোগাযোগ রাখি, তা অন্য দলগুলোকে কখনও দেখেছেন? চট্টগ্রামের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল এবং মোংলা বন্দর কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানির কাছে ইজারা দেওয়ার প্রতিবাদ বাম দলগুলোই করছে। অন্যায্য চুক্তির বিরোধিতায় সব সময় বাম দলগুলোকে পাবেন। ভোটের মানদণ্ডে সবকিছু বিচার করলে হবে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাম রাজনীতির সংকট শুধু জোটের রাজনীতি কিংবা নেতৃত্বের সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ নয়। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা নিয়ে দলগুলোর বক্তব্য ও কর্মসূচি কতটা কার্যকর, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদের মতে, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও প্রণোদনা অনেক সময় মানুষের রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করে। বামপন্থিরা নিজেদের আদর্শ সাধারণ মানুষের কাছে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তবে আদর্শের প্রতি বিশ্বাসী মানুষের উপস্থিতি এখনও তাদের সম্ভাবনার জায়গা।
এই বাস্তবতায় বাম দলগুলোর সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো আদর্শিক অবস্থানকে মানুষের জীবন ও জীবিকার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করা। দ্রব্যমূল্য, বেকারত্ব, দুর্নীতি, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং কৃষক-শ্রমিকের অধিকার নিয়ে কার্যকর কর্মসূচি গড়ে তুলতে না পারলে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো কঠিন হবে। শুধু সভা-সমাবেশ ও বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে হারানো রাজনৈতিক প্রভাব ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। সাধারণ মানুষের সংকটের সময়ে পাশে দাঁড়ানো, স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠন শক্তিশালী করা এবং তরুণদের রাজনীতিতে যুক্ত করার উদ্যোগও জরুরি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. সালেহ শাহরিয়ারের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাম রাজনীতির ভবিষ্যৎ খুব উজ্জ্বল নয়। তবে মানুষের বাস্তব সমস্যা সামনে রেখে কার্যকর কর্মসূচি দিতে পারলে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। সে জন্য দলগুলোর অভ্যন্তরীণ বিভক্তি কমানো, নেতৃত্বের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি। এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জন করতে পারলেই বাম দলগুলোর ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক সারোয়ার জাহান আমাদের সময়কে বলেন, বাম রাজনীতির সামনে এখন শুধু নির্বাচনে ঘুরে দাঁড়ানোর চ্যালেঞ্জ নয়, অস্তিত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখার প্রশ্নও বড় হয়ে উঠেছে। বাম দলগুলো শ্রমিক-কৃষকের অধিকার ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ভূমিকা রাখত, তাদেরই আজ জনসমর্থনের সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বিপরীতে সংসদে বেড়েছে ইসলামপন্থি দলগুলোর উপস্থিতি। এই পরিবর্তন বাম দলগুলোর জন্য সতর্কবার্তা— অতীতের গৌরব বর্তমানের রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণ করতে পারে না। বিভক্তি কাটিয়ে মানুষের বাস্তব সংকটে পাশে দাঁড়ানো এবং বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প হয়ে ওঠাই তাদের সামনে প্রধান পরীক্ষা।
